বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২. উপন্যাসের দ্রষ্টা-চরিত্র ত্রিকালদর্শী ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী। তারা বৃক্ষে বসে দেখে মানুষের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের নারকীয় দৃশ্যাবলি:

‘চারদিকে আগুন, চারদিকে গুলির শব্দ, চারদিকে মানুষের আর্তনাদ, মানুষের পালানোর পায়ের শব্দ। ট্যাংকের ঘর্ঘর আওয়াজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবাস লক্ষ্য করে কামান দাগা হচ্ছে। শিক্ষকদের কোয়ার্টারে গিয়ে নাম ধরে ধরে শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে ব্রাশফায়ার করা হচ্ছে। জগন্নাথ হল থেকে ছাত্রদের ধরে এনে মাঠে লাইন করে দাঁড় করিয়ে চালানো হচ্ছে গুলি। জ্বলছে বস্তিগুলো। জ্বলছে ঘরবাড়ি।’

আগুন জ্বলছিল বাংলার জলে-স্থলে-দিগন্তে আর মানুষের অন্তরে। রক্ত ঝরছিল পথে-প্রান্তরে। কারণ, স্বাধীনতা-সূর্যের স্বপ্ন স্থির ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের কথা এলে আসবে ভাষা আন্দোলনের কথা। বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই বীর সেনানী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তও এই উপন্যাসে উপস্থিত অনিবার্য চরিত্র-রূপে। একাত্তরে কুমিল্লা সেনানিবাসে এই ৮৫ বছরের মহান প্রবীণের নির্মম হত্যাদৃশ্যকে অশ্রুর অক্ষরে ভাস্বর করেন লেখক:

default-image

‘তিনি বিড়বিড় করলেন। বললেন, “এই মাটিই আমার মা। এই মাটিই আমার দেশ। এই মাটি আমার মা-টি। তাঁর ভাষাই আমার মায়ের ভাষা। মাটি, আমি তোমাকে নিলাম। মা-টি, তুমি আমাকে নাও।” তিনি মাটিতে দেহ রাখলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা আরও আরও বাঙালি সৈন্য আর বেসামরিক মানুষের সঙ্গে তাঁকে পুঁতে ফেলল মাটিতেই।’

রক্তঝরা একাত্তর আবার প্রতিরোধেরও একাত্তর। এই প্রতিরোধ কেবল অস্ত্রের নয়, উপন্যাসটির পাতায় পাতায় পাওয়া যাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের কথাও।

একাত্তরের এপ্রিলে মেহেরপুরের মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সঙ্গে সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দীন থেকে শুরু করে মুক্তিপাগল সবার সমবেত কান্নার শব্দচিত্র এভাবে অঙ্কন করেন আনিসুল হক:

‘ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে...গাইতে গাইতে সবাই কাঁদছেন, সৈয়দ নজরুল কাঁদছেন, তাজউদ্দীন কাঁদছেন...সবাই দরদর করে কাঁদছেন। কাঁদছে সমবেত হাজার হাজার লুঙ্গি পরা, গেঞ্জি পরা, পাঞ্জাবি পরা, শার্ট পরা, খালি গা, স্যান্ডেল পা গ্রামবাসী। এমনকি সেই আমের বাগানে গাছে গাছে পাখিরাও যেন নিজেদের গান ভুলে কণ্ঠ মেলাতে লাগল ওই আমার সোনার বাংলার সঙ্গে। সাদা বিদেশি সাংবাদিকেরা কলকাতার বাঙালি সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কাঁদছে কেন? কলকাতার বাঙালি সাংবাদিক বললেন, ওরা ওদের জাতীয় সংগীত গাইছে। জাতীয় সংগীত গাইবার সময় কাঁদতে হবে কেন? এটা তুমি বুঝবে না, এটা কেবল বাঙালিরাই বুঝতে পারে। বলে কলকাতার বাঙালি সাংবাদিক নিজেই চোখ মুছতে লাগলেন।’

পাকিস্তানি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর বন্দিদশা আর ঢাকায় তাঁর পরিবারের আতঙ্কগ্রস্ত, উদ্বেগাকুল, অবরুদ্ধ দিনযাপনকে সমান্তরালভাবে চিত্রিত করা হয়েছে রক্তে আঁকা ভোর-এর নানা অংশে। কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়াইরত শিক্ষকনেতা আনিসুজ্জামান কিংবা পাহাড়ের ঢালে মরণপণ লড়াই করে শহীদ হওয়া সিপাহি হামিদুর রহমান...কার কথা নেই এখানে!

রক্তে আঁকা ভোর-উপন্যাস যেন মুক্তিযুদ্ধের মিত্র সোভিয়েত সরকার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ আর ‘বাংলদেশ’...গানের জোয়ান বায়েজের প্রতি আমাদের সামষ্টিক কৃতজ্ঞতাপত্র।

এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের মিত্রদের পাশাপাশি স্বাধীনতার শত্রুদের স্বরূপও উন্মোচন করা হয়েছে। স্বাধীনতার ভোর যেসব শহীদ বুদ্ধিজীবীর রক্তে আরও বিধুর হয়েছে, তাঁদের কথা স্মরণ করা হয়েছে লক্ষ আঁখিজলে:

‘উন্মাদের মতো কাঁদছেন কবীর চৌধুরী, ভাই মুনীর চৌধুরীকে হারিয়ে, পাগলিনীর মতো ছুটছেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, স্বামী ডাক্তার আলীম চৌধুরীকে হারিয়ে, এক বছরের শিশু কোলে মাথা চাপড়াচ্ছেন পান্না কায়সার, শহীদুল্লা কায়সারের খবর নাই; শাহীন, জাহীদ, ফাহিম, ছোট ছোট ছেলেগুলো কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে ফেলল, আব্বা যে আসেন না...’

আনিসুল হকের রক্তে আঁকা ভোর যেন বীরের রক্তস্রোত আর মাতার অশ্রুধারাসিক্ত অপরাজেয় বাংলার ঔপন্যাসিক দলিল। এই উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে মুক্তিসংগ্রামে আত্মদানকারী শহীদের পুণ্যস্মৃতিতে নিবেদিত এক অনুপম অর্ঘ্য।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন