কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি ও চিত্রনাট্যকার রোয়াল্ড ডালের জন্মদিন আজ। তাঁর বইগুলো দারুণ জনপ্রিয়, প্রায় ২৫০ মিলিয়নের বেশি বিক্রি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি কাজ করেছেন রয়্যাল এয়ারফোর্সে। মূলত ১৯৪০ সালের পর থেকেই লেখালেখির জগতে বিখ্যাত হয়েছেন তিনি। এ সময় থেকে তাঁর বইগুলোও পেতে শুরু করে ‘বেস্টসেলার’–এর মর্যাদা। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই ‘দ্য নিউইয়র্কার’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন ফাতেমা রিয়া

তৃতীয় শ্রেণিতে থাকতে রোয়াল্ড ডালের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। স্কুলে থাকতে ‘চার্লি অ্যান্ড চকলেট ফ্যাক্টরি’ নামক একটা মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছিলাম। তার অল্প কিছুদিন পর পড়েছিলাম ‘জেমস অ্যান্ড জায়ান্ট পিচ’। আমি শিশুসাহিত্যে খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু আট–নয় বছর বয়সেই ডালের কল্পকাহিনি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর গল্পের নিজস্ব যুক্তি, ভরবেগ, কাহিনির অর্থহীনতার সঙ্গে ভাষার গতিশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। অন্যদিক থেকে ভাবলে ডালকে পড়েই বুঝেছি গল্পকথকের গুরুত্ব কতখানি। সফল গল্পের থেকে গল্পকথকের ভাষ্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসলে ডালের লেখা তাঁর অঙ্কনশৈলী ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তিনি আমাকে এই ব্যাপারে সচেতন করেছিলেন যে গল্পকথক কোনো নিষ্ক্রিয় সত্তা নন, তিনি সক্রিয়। গল্পের চালিকা শক্তি হিসেবে তিনি কাজ করেন।

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ১৯৯০ সালে ডাল মারা যান। তাঁর জন্ম ওয়েলসের কার্ডিফে। এই সেপ্টেম্বরে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পূর্ণ হবে। তাঁর বই প্রায় ২০০ মিলিয়ন কপি মুদ্রিত হয়েছে। সেসবের ওপর ভিত্তি করে বহু নাটক, সিনেমা, মঞ্চনাটক তৈরি হয়েছে। অতি সম্প্রতি স্টিভেন স্পিলবার্গ নির্মাণ করেছেন ‘দ্য বিএফজি’ নামের সিনেমাটি। এটার ভিত্তি ১৯৮২ সালে লেখা ডালের একই নামে প্রকাশিত একটি বই। এখানে বলা হয়েছে, সোফি নামের এক অনাথ মেয়ের কাহিনি। সোফি এক রাতে বন্ধুসুলভ দৈত্যের দেখা পায়। এটা যেন ঘুমন্ত শিশুদের জানালায় উঁকি দিয়ে যাওয়া স্বপ্নের মতো। এটা আমার প্রিয় বইগুলোর মধ্যে একটি। প্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ দৈত্যের স্বকীয় ভাষাশৈলী। দৈত্যটি ‘ফ্রবস্কোটল’ নামের একটা পানীয় পান করে আনন্দ পাওয়ার জন্য। আরেকটি কারণ, বইটি আমি আমার মেয়েকে পড়ে শোনাতাম, যখন সে ছোট ছিল। তার নামও সোফি। ডালের শিশুসাহিত্য অনেক সময় ধরে আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। আমি মনে করি, তাঁর লেখায় স্মৃতিকাতরতার মৃদু গুঞ্জন, নিজ বা অপরের ঐতিহাসিক ছায়া আমাদের স্পর্শ করে—তাই আমরা তাঁর লেখা মনে রাখি বা রাখতে পারি। হয়তো ডালও বুঝেছেন, স্মৃতিকাতরতার ব্যাপ্তি অনেকখানি। শৈশব তো একটা অধ্যায়মাত্র।
যেমন তাঁর অন্য একটি জনপ্রিয় চরিত্র মাতিলদা বলে, ‘আমি ভাবছি এরপর কী পড়ব। ছোটদের সব বই–ই তো পড়ে ফেলেছি।’

বিজ্ঞাপন

‘মাতিলদা’ স্মৃতিকাতরতার ধারণাটা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে।
ডাল তাঁর মৃত্যুর দুই বছর আগে নিজের সম্পর্কে লেখায় একবার বলেছিলেন, তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত ছোটদের বই হলো ‘মাতিলদা’।

আমি এটা ভিন্নভাবে পড়েছি। বড়দের জন্য লেখা ডালের চারটি ছোটগল্পের বইয়ের সঙ্গে যেন এটা রূপকার্থে যুক্ত আছে। বড়দের জন্য লেখা প্রথম বই ‘ওভার টু ইউ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে। বইটিতে ভিন্নমুখী ১০টি অপ্রচলিত ছোটগল্প ছিল। ডাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রয়্যাল এয়ারফোর্সের পাইলটের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই সময়কার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে বইয়ের গল্পগুলো। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কিস কিস’ বইটি। ১৯৬০–এ আসে ছোটগল্পের বই ‘সামওয়ান লাইক ইউ’। এই সব কটি বই থেকে বাছাই করা ১০টি গল্প পরে দ্য নিউইয়র্কারে প্রকাশিত হয়। এই লেখাগুলো দারুণভাবে বাঁক নেয়। যেমন একটি অসুস্থ বাচ্চা বিপদ থেকে উদ্ধার পায়। বড় হয়ে সে হয় এডলফ হিটলার। তিনি চর্মপ্রসাধকদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত দর্শক ছিল। একদিন সে নিজের চায়ের কাপের মধ্যে তিক্ত বাদামের টুকরা আবিষ্কার করে।

default-image

একই পরিপ্রেক্ষিতে ডালের গল্পগুলোর সর্বশেষ সংস্করণ আসে ‘সুইচ বিচ’ নামের বইতে। বেপরোয়া যৌন আচরণ নিয়ে চারটি দীর্ঘ গল্প বইটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই গল্পগুলো প্রথমে প্লেবয় ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল।
এসব ডালের শিশুসাহিত্য নয়, আবার বলাও যায় শিশুসাহিত্য। এসব লেখায় নৈতিকতার তীব্র বয়ান আমাদের আমোদিত করে। তবু গল্পগুলো উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছে।

বড়দের জন্য লেখার ব্যাপারে আমরা যা ভাবি, তা ডালের প্রতি আমাদের ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না। তাঁর যে ব্যঙ্গচিত্র আমাদের মধ্যে গ্রথিত আছে, তার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখার ব্যাপারটা ঠিক যায় না। তাঁর সমস্ত জটিলতা আমরা স্বীকার করে নিই।
২০১০ সালে দ্য নিউইয়র্কারে তাঁর সম্পর্কে স্যাম এন্ডারসন লিখেছিলেন, এই লোক সাম্রাজ্যবাদী ধনী ব্রিটিশ, এর হঠকারিতার কোনো আগামাথা নেই।

বিজ্ঞাপন

আমরা তাঁর জন্য আরেকটু নমনীয়, ভদ্র বিশেষণ আশা করি। এন্ডারসন অবশ্য তাঁর গল্পগুলোকে মামুলি পরিচ্ছেদ ছাড়া কিছু ভাবতেন না।

এ রকম ৫১টি ছোটগল্প আছে, যা পাওয়া যাবে তাঁর ‘কালেক্টেড স্টোরিজ’ বইতে। এই বই বিচ্ছিন্ন কিছু লেখার সঙ্গে তাঁর অন্য চারটি সংকলনের সমন্বয়ে করা হয়েছে। এই লেখাগুলোয় আমরা খুঁজে পাই চেনা স্বর। তথাকথিত স্বাভাবিকত্বের সীমানা থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা ফুটে ওঠে লেখাগুলোতে। গল্পগুলো কোনো হোটেল অথবা ইংরেজ ডাইনিং রুমে শুরু হয়, আর শেষ হয় অপ্রত্যাশিতভাবে।

যেমন তাঁর ‘রয়েল জেলি’ গল্পে একজন মৌমাছিপালক তার রুগ্‌ণ, অপুষ্ট বাচ্চাকে চাকভাঙা রাজকীয় মধু খাওয়ায়। তার আশা বাচ্চাটা স্বাস্থ্যবান ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। কিন্তু দেখা গেল, বাচ্চাটি অজ্ঞান হয়ে গেছে। এরপর সে সদ্য লাভা থেকে বের হওয়া এক বৃহৎ কীটে রূপান্তরিত হয়। তারপর সে পাখির মতো ঠোঁট ও ডানা নিয়ে আবার জেগে ওঠে।

একইভাবে তাঁর ‘ম্যান ফ্রম দ্য সাউথ’ গল্পটি একটা সাধারণ বাজির মাধ্যমে শুরু হয়। এক বুড়ো এক আমেরিকানকে চ্যালেঞ্জ দেয় যে সে তার লাইটার পরপর ১০ বার জ্বালাতে পারবে না। যদি আমেরিকানটি জিতে যায়, তাহলে ক্যাডিল্যাক গাড়ি পাবে, আর যদি না জেতে, তবে তাকে হাতের কনে আঙুলটি কাটতে হবে।

খেলা শুরু হওয়ার আগে বুড়োর সঙ্গিনী এসে বাধা দেয়। সে বলে, এই বুড়ো আগেই সব খুইয়েছে। জোর করে বুড়োর হাত টেবিলে রেখে মহিলাটি দেখায়, হাতে মাত্র একটা আঙুলই অবশিষ্ট আছে, সেটা বৃদ্ধাঙ্গুলি।

বিজ্ঞাপন

আমরা বলতেই পারি, ডালের কাহিনিতে বাঁকের পর বাঁক—অনেকটা ও’হেনরির গল্পের মতো। সাকির থেকেও বেশ ভালো তাঁর গল্প। সাকির লেখার সঙ্গে ডালের লেখা মিলে যায় মাঝেমধ্যে। ডাল আরও বিজ্ঞ ও জাদুকরি হয়ে আমাদের কাছে হাজির হন। মনে হয় লেখক ও পাঠক যেন কোনো চক্রান্তের মধ্যে আছে। তাঁর কাছে গল্প বলাটা একটা যৌথ ক্রিয়া। এই আলাপী ঢং পাঠকদের মনে ছাপ ফেলে যায়, তা বড় বা ছোট—যাদের জন্য লেখা গল্পই হোক না কেন।

তাঁকে পড়া আনন্দদায়ক। তাঁর চরিত্রগুলোর অপরিপক্বতা, নিষ্ঠুরতার বিচারের দায়ভার তিনি পাঠকদের ওপর দেন না।

default-image

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘জেমস অ্যান্ড জায়ান্ট পিচ’ উপন্যাসের আন্ট স্পঞ্জ ও স্পাইকারের চরিত্রের কথা, ‘মাতিলদা’র মিস ট্রাঙ্কবুল চরিত্রের কথা অথবা ‘চার্লি অ্যান্ড চকলেট ফ্যাক্টরি’র অগাস্টাস ক্লুপ বা ভেরুকা সল্ট চরিত্রগুলোর কথা। যদিও এই খলচরিত্রগুলো ভয়ংকর মজার উপায়ে নিজেদের কর্মফল বুঝে নেয়, তবু ডালের বুদ্ধিদীপ্ত জাদুকরি বর্ণনাই আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকে। গল্পকথকের জাদুকরি বর্ণনাই প্রধান হয়ে ওঠে।

একই ব্যাপার খাটে ‘দ্য ওয়ে আপ টু হেভেন’ গল্পটিতে। এখানে স্ত্রী তার স্বামীকে তাদের ম্যানহাটানের বাসার লিফটে বন্দী রেখে চলে যায়। সে ছয় সপ্তাহের জন্য প্যারিসে ঘুরতে গিয়েছিল।

বড়দের জন্য লেখা ডালের লেখা আরেকটি বই খুব বিখ্যাত হয়েছিল—‘দ্য ল্যাম্ব টু দ্য স্লটার’। এই কাহিনিতে স্ত্রী তার বিশ্বাসঘাতক স্বামীকে খুন করে। বরফে জমে যাওয়া ভেড়ার রান দিয়ে স্বামীর মাথায় আঘাত করে তাকে খুন করা হয়। তারপর গোয়েন্দারা এলে স্ত্রী তাদের ওই রানটা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।

স্ত্রী বলে, ‘আপনারা নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত। রাতের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। প্যাট্রিক (তার স্বামী) আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না, যদি তার বাসায় আপনাদের আপ্যায়ন না করি। ঈশ্বর তাকে শান্তি দিন।’
চমৎকার লেখায় বাঁক নেওয়ার এমন কারুকার্য দেখে মনে হয়, এই লেখক হৃদয়হীনভাবে লেখেন, এটা তাঁর প্রতি একধরনের অপবাদ।

বিজ্ঞাপন

শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি তাঁর বড়দের বইগুলোও বিবেকবোধের শিক্ষা দেয়। নৈতিকতা প্রতিশোধের থেকেও গুরুত্বপূর্ণরূপে হাজির হয় তাঁর লেখায়। অপ্রত্যাশিত গভীরতায় পাঠককুলকে নিমজ্জিত করে অবশেষে।

এ ক্ষেত্রে তাঁর ‘পয়জন’ গল্পটার উদাহরণ দেওয়া যায়। এখানে এক বিমূর্ত বিষবৃক্ষ আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। সেই বিষবৃক্ষের ফল হলো ‘বর্ণবাদ ও ঘৃণা’।
গল্পের কাহিনিটা খুব অকপটভাবে বর্ণিত হয়েছে। ভারতে বসবাসকারী এক ইংরেজ বাসায় ফিরে দেখল তার সঙ্গী ভয়ে জমে আছে। সে দাবি করল, বিছানার চাদরের নিচে একটা ভয়ংকর সাপ আছে। লোকটা স্থানীয় এক ডাক্তারকে ডেকে আনল। ডাক্তার বিছানায় ক্লোরোফর্ম পাম্প করলেন এবং চাদর সরিয়ে ফেললেন। দেখা গেল কোনো সাপ সেখানে নেই। এখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচার বদলে সেখানে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়।
লোকটির সঙ্গী ডাক্তারকে বলে, ‘আপনি আমাকে মিথ্যাবাদী বলছেন নাকি?’ এরপর নোংরা আক্রমণ শুরু হয়, ‘তুই কে রে আমাকে অপমান করার? নর্দমায় বাস করা ইঁদুরের বাচ্চা।’

এখানে কোনো বাঁক নেই, কোনো বিস্ময়কর সমাপ্তিও নেই, নেই কোনো প্রতিশোধ। শুধু ডাক্তার ও গল্পকথকের অস্বস্তি ফুটে ওঠে। লোকটি বলে, ‘তুমি হ্যারির কথায় কান দিয়ো না তো’, কিন্তু ডাক্তার লজ্জায় আর চোখ তুলতে পারে না। গল্পটি শেষ হয়। এখানে একটা বার্তা দিয়ে যায় যে কিছুই সমাধান হয়নি বা সমাধান হয়তো অসম্ভব।
হারানো ও ফিরে পাওয়ার আকুলতা নিয়ে আরেকটি গল্প হলো ‘দ্য উইশ’। পরীক্ষায় খারাপ ফল করে সেই দুঃখে এক ছেলে তার মায়ের সুসজ্জিত কার্পেটকে ভাবে সাপের গুহা। ‘অনলি দিজ’ গল্পে দেখা যায়, মা স্বপ্ন দেখছে ছেলে বোমারু বিমানে উঠেছে মরার জন্য। কিন্তু সে মরল, যখন বিমানে গুলি চালানো হলো।

সবচেয়ে মর্মস্পর্শী গল্পটি হলো ‘মিস্টার বটিবল’। এখানে এক আজীবন ব্যর্থ মানুষের কাহিনি বলা হয়েছে, যে অপ্রত্যাশিতভাবে পূর্ণতা ও সংযোগ খুঁজে পায় এই ভেবে যে সে বেটোফেন ও চপিনের কনসার্টে মহৎ সংগীত সৃষ্টি করছে।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য ডালের সব গল্প মর্মস্পর্শী নয়। কিছু গল্পে—‘দ্য সাউন্ড মেশিন’, ‘এডওয়ার্ড দ্য কনকুয়েরর’, ‘ভেঞ্জেন্স ইজ মাইন’—অহেতুক দেমাগ ফুটে উঠেছে। তবু সবশেষে এটাই বলা যায় যে তাঁর লেখা কিছু প্রশ্ন তোলে। আমাদের ভাবতে বাধ্য করে গল্প থেকে আমরা কী চাই, গল্প কেমন হওয়া উচিত।

নিউ ইয়র্কারে প্রকাশিত ডালের ‘দ্য স্কিন’ গল্পে দেখা যায় এক বুড়ো বলছে, সে সুটিন নামের এক বিখ্যাত শিল্পীকে দিয়ে ট্যাটু করিয়েছিল। অনেক আগেই সেই শিল্পী মারা গেছেন, আক্ষরিকভাবে তার চামড়াই হারাচ্ছে আসলে। তার থেকেও মজার হলো গল্পকথকের বর্ণনাটা।

‘কয়েক সপ্তাহের বেশি হয়নি সুটিনের আঁকা “নারীর মাথা”র চিত্রকর্মটা বুয়েনস এইরেসে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। ছবিটা খুবই সুন্দরভাবে আঁকা, সুন্দর করে ফ্রেমিং করা এবং ভারী করে বার্নিশ করা।’

default-image

ডাল সমাপ্তি টানলেন এভাবে, ‘এই ছবিটার সৌন্দর্য হয়তো কাউকে কিছুটা হলেও বুড়োর স্বাস্থ্যের জন্য প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। হয়তো কেউ আকুলভাবে প্রার্থনা করবে, যাতে বুড়ো যেখানেই থাকুক, কোনো আকর্ষণীয় তরুণী তার হাত–পায়ের সেবাযত্ন করুক এবং গৃহপরিচারক প্রতিদিন সকালে বিছানায় নাশতা পৌঁছে দিক।’
ডালের গল্পে আমরা শৈলী দেখি। সহসা বাস্তব এক কণ্ঠস্বরের গল্প শোনানো ও পুনরাবৃত্তি করার একটা ঘোর তৈরি করে। মনে হয়, গল্প বলা হচ্ছে আলাপী ঢঙে। টেলিফোনে কথার খেলার মতো সহজ–স্বাভাবিক তাঁর কথনশৈলী।

এটা আমাদের শেরউড এন্ডারসনের কথা মনে করিয়ে দেয়। যিনি গল্পের মধ্যে গল্প বলতে পটু ছিলেন। এর থেকেও বেশি মনে পড়ে অবশ্য কার্ট ভনেগাটের কথা, যিনি ডালের সমসাময়িক সময়ে ছোটগল্প লিখছিলেন। ছোটগল্পগুলোর উদ্দেশ্য অনুধাবন করে ভনেগাট লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
১৯৯৭ সালে ভনেগাট আমাকে বলেন, ছোটগল্পগুলো কৃত্রিম। এগুলো জীবনের কুটিল মিথ্যার বর্ণনা।

বিজ্ঞাপন

ভনেগাট আরও বলেন, ‘যদি জীবনটাকে গল্পের মধ্যে সঠিকভাবে তুলে আনতেই হয়, তাহলে লেখা আরও বড় হওয়া উচিত। কিন্তু ছোটগল্পগুলো হতে হয় আকর্ষণীয়। চাতুর্যের সঙ্গে পাঠককে টানতে হয় ছোটগল্পের দিকে।’
হয়তো ভনেগাট ঠিক বলেছেন। কিন্তু আমি দ্বিমত করব। এটা আমার কাছে শিল্পের মতো। সব লেখার ক্ষেত্রেই এই শিল্প প্রযোজ্য। পাঠকেরা লেখা দ্বারা সুকৌশলে পরিচালিত হবেন, এটাই তো চাই।

ডালের আরেকটি গল্প আমার খুব পছন্দ—‘দ্য গ্রেট অটোমেটিক গ্রামাটাইজার’। সেখানে একটা যন্ত্রের বর্ণনা আছে। যন্ত্রটি যেকোনো মানুষের চেয়ে ভালোভাবে ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখতে পারে। ভনেগাটের সেই আকর্ষণীয় জাদু যেন গল্পে চিত্রায়িত হলো। যন্ত্রের মধ্যে গল্প লেখার উপাদান (বিষয়বস্তু, লেখনশৈলী, চরিত্র) দিয়ে কার্যক্রম ঠিক করে দিলেই হলো।

ব্যস, হয়ে গেল ঝটপট সাহিত্য।
গল্পের বাঁক বদল হলো, অনেক লেখক এই যন্ত্র ব্যবহার করে বই লেখানোর জন্য সাইন করলেন। ডাল লিখলেন, সবচেয়ে সহজ হলো বুড়োদের হাত করা। তাদের মাথায় গল্প লেখার নতুন কোনো আইডিয়া নেই, তারা শুধু পানীয় খায়। তবে তরুণদের হাত করা সহজ হলো না।

ডাল অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন, কোনো সন্দেহ নেই। তবু তাঁর লেখায় কোনো কাতরতা নেই; বরং কঠিন বাস্তবতার বর্ণনা আছে। তাঁর কোনো গল্পের এক লেখক চরিত্রের মধ্যে থেকে তিনি বলে ওঠেন, ‘আমাদের বাচ্চাদের উপোস রাখার শক্তি দাও হে ঈশ্বর।’
সেই লেখক আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবেই আমরা বুঝতে পারি ডালের প্রহসনমূলক লেখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0