বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি রংপুরে যখন উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি, তখন থেকেই নির্মলেন্দু গুণের কবিতা পড়ি, পড়তে পড়তে তাঁর কবিতা আমি মুখস্থ করে ফেলেছি। ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘কবিতা, অমীমাংসিত রমণী’, ‘চৈত্রের ভালোবাসা’—এসব বইয়ের প্রথম সংস্করণ আমার কাছে ছিল। তারপর পেলাম ‘নির্বাচিতা’। কাজী হাসান হাবিবের প্রচ্ছদটা এত ভালো লেগেছিল! আমি দিনরাত নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বই পড়ি। ‘অসমাপ্ত কবিতা’—‘মাননীয় সভাপতি, কে সভাপতি, ক্ষমা করবেন সভাপতি সাহেব, আপনাকে আমি সভাপতি মানি না।’ পড়ি, আর মুগ্ধ হই। ‘তুমি চলে যাচ্ছ, নদীতে কল্লোল তুলে লঞ্চ ছাড়ছে...’
কী উপলক্ষে বা কোন অজুহাত নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের পলাশীর সেই কলোনির ঘরে হাজির হয়েছিলাম, মনে পড়ছে না। হলে সাহিত্য–সংস্কৃতি সপ্তাহ হতো, তাতে বিচারক লাগত, কবিতার বিচারকও দরকার হতো, তাঁকে বিচারক হতে অনুরোধ করতে গিয়েছিলাম কি? আবার আমি মোজাম্মেল বাবুর নেতৃত্বে ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই ‘কাগজ’ নামে চার পৃষ্ঠার কাগজ বের করতে শুরু করে দিয়েছিলাম, শাকুর মজিদ আর খাজা সাহান মিলে আমরা ছিলাম সম্পাদক–প্রকাশকের দল, শাহিন হাসান ছিল আমাদের সঙ্গে। সেই ‘কাগজ’–এর জন্য লেখা চাইতে কি গিয়েছিলাম?
সেদিনটা ছিল শীতে কাতর একটা দিন। পলাশীতে গিয়ে বাজারের লোককে জিজ্ঞেস করি, কবি নির্মলেন্দু গুণের বাসা কোনটা?
কেউ বলতে পারে না।

আমি তো খেপেটেপে একাকার। আপনারা কবি নির্মলেন্দু গুণকে চেনেন না। আমার মনে পড়ে যায় নির্মলেন্দু গুণের কবিতা: ‘যখন একজন নারী আমাকে উপেক্ষা করে অবহেলায় অতিক্রম করে যায়, আমি তার গন্তব্যের দিকে শেষবার ত্বরিত তাকাই...তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বলি, প্রভু, ওকে তুমি ক্ষমা করে দাও, ওকে তুমি দুঃখ দিও না। আমি জানি, একদিন পৃথিবীর সব নারী করজোরে দাঁড়াবে দুয়ারে, ভুল হয়ে গেছে প্রভু, আমি বড় দৃষ্টিহীনা, তোমাকে দেখিনি, আমি সব নারীকেই ক্ষমা করে দেব।’ (স্মৃতি থেকে লিখছি। বই বের করে ঠিকঠাক লাইন তুলে দেওয়া যায়। তাহলে সেটা তো আর স্মৃতিকথা হয় না, গবেষণা হয়। হা হা হা)।

default-image

বাজারের লোকদের বলি, আরে বড় বড় দাড়ি, বড় বড় চুল, পাঞ্জাবি–পায়জামা পরেন...
তখন একজন বলে, ও, ওই হুজুর, উনি তো ওই বাড়িটাতে থাকেন।
কলতলার ভিড় এড়িয়ে আমি নির্মলেন্দু গুণের দরজায় হাজির হই।
দরজায় নক করি। ঠকঠক।
কে?
আমি বুয়েট থেকে আসছি। কবি নির্মলেন্দু গুণের কাছে।
আসো। দরজা খোলা আছে।

ঘরে গিয়ে দেখি, নির্মলেন্দু গুণ একটা লেপ বা কম্বলের নিচে শরীরটা ঢুকিয়ে মাথাটা বের করে শুয়ে আছেন।
আমাকে বললেন, আসো। যা শীত পড়ছে, বিছানা ছাড়তে পারতেছি না। তোমার নাম কী?
আমি বললাম, আনিসুল হক মিটুন।

তিনি বললেন, মিঠুন। বাহ, ভালো নাম।

বালক নির্মলেন্দু গুণ বললেন, আমিও ম্যাজিক দেখামু। তিনিও রাতের বেলা সবাইকে ডেকে ম্যাজিক দেখানো শুরু করলেন। অনেকগুলো দাড়ি কামানোর ব্লেড তিনি জোগাড় করে রেখেছেন। তিনিও জলের গেলাস হাতে নিয়ে একমুঠো ব্লেড মুখে পুরে জল দিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললেন। বাড়ির সবাই হায় হায় করে উঠল। জাদুকর তো ট্রিকস করে। আসলে খায় না। তুই যে খেয়ে ফেললি!

আমি আর ট/ঠ-এর ঝামেলায় গেলাম না। আমেরিকানরা ট-কে ঠ বলে, ঠ-কে ট বলে। যেমন, থমাসকে বলে টমাস আর টাইমকে বলে ঠাইম। আমার নাম মিটুন, মিঠুন, মিঠু, মিতু, মিটন, মিল্টন—সব সই। আমার প্রোপার নামে ভুল বলে কিছু নাই।
গুণদা আমাকে এখনো মিঠুন নামে ডাকেন। ফোন করে বলেন, মিঠুন।
জি গুণদা।

খবরদার জি বলবা না। জি আবার কী? তুমি কি হিন্দি ভাষায় কথা বলো নাকি। বাংলায় কথা বলো। বলবা, হ্যাঁ। বুঝলা?
জি গুণদা।

ফোন করলে এক ঘণ্টার আগে গুণদা ফোন রাখবেন না। যদি বলি, গুণদা, অফিসে আছি, মিটিং আছে, এখন রাখি?
না। রাখতে পারবা না। তুমি যদি আমার সাথে কথা শেষ করতে না পারো, তাহলে ফোন ধরছ ক্যান? তুমি ফোন ধরলা মানে তুমি রাজি আছ, আমি যতক্ষণ কথা বলব, ততক্ষণ তুমি ফোন রাখতে পারবা না।

গুণদার নিজের মুখে বলা দুটো হাসির ঘটনা আগে বলে নিই।
এক. শোনো। এক মাস স্নান করি না। সেদিন চিরুনি দিয়া চুল আঁচড়াইতে গেছি, ঝরঝর করে মাথা থেকে উঁকুন মেঝেতে পড়তে লাগল, বুঝলা!
[এখানে আরেক কবির গল্প বলি। ত্রিদিব দস্তিদার। তিনি আর ইহলোকে নাই। পরম করুণাময় তাঁর মঙ্গল করুন এবং আমাকে এই গল্প বলার জন্য ক্ষমা করুন। ত্রিদিবদা একদিন সাপ্তাহিক ‘চলতিপত্র’তে এসে গল্প করতে লাগলেন। বিভুদা (বিভুরঞ্জন সরকার), মুনিরুজ্জামান ভাই সেখানে আছেন। ত্রিদিবদা বললেন, আহ। কী আরাম লাগতেছে। দুই মাস স্নান করি না। শরীরে আগুন জ্বলতেছিল। রাস্তা দিয়া হাঁটতেছি। দেখি, একটা পুকুর। পুকুরে নাইমা গেলাম। জামা-কাপড়সমেতই নামলাম। দুই মাস একই কাপড় পরা। তারপর উঠলাম। এখন খুব শান্তি লাগতেছে।

আমি বললাম, আপনার তো শান্তি লাগতেছে। কিন্তু পুকুরটার কী হলো? পুকুরটা কি ঘোলা হইয়া গেল? ]
দুই.. এটা আছে নির্মলেন্দু গুণের বইয়ে। ‘আমার ছেলেবেলা’ সেই বইয়ের নাম।
নির্মলেন্দু গুণ তখন বালক। তাঁদের বাড়িতে একজন জাদুকর এলেন। চৌকি জোড়া দিয়ে মঞ্চ বানানো হলো। ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখালেন। আস্ত আস্ত ব্লেড পানি দিয়ে তিনি খেয়ে ফেললেন।

default-image

বালক নির্মলেন্দু গুণ বললেন, আমিও ম্যাজিক দেখামু। তিনিও রাতের বেলা সবাইকে ডেকে ম্যাজিক দেখানো শুরু করলেন। অনেকগুলো দাড়ি কামানোর ব্লেড তিনি জোগাড় করে রেখেছেন। তিনিও জলের গেলাস হাতে নিয়ে এক মুঠো ব্লেড মুখে পুরে জল দিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললেন। বাড়ির সবাই হায় হায় করে উঠল। জাদুকর তো ট্রিকস করে। আসলে খায় না। তুই যে খেয়ে ফেললি।

কবিরাজ এল বাড়িতে। ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হলো। রোজ এক গেলাস করে গোমূত্র পান। রোজ এক গেলাস করে গোরুর মুত বেশ কয়েক দিন ধরে বালক নির্মলেন্দু গুণকে খেতে হয়েছিল।

চার. গুণদার স্মৃতিকথায় আরেকটা ঘটনা আছে। গুণদা গেছেন দৈনিক ‘পাকিস্তান’–এ, কবি আহসান হাবীবের কাছে। আহসান হাবীব তখন চা খাচ্ছেন। গুণদা বসে আছেন তাঁর সামনে। একটু পর কবি আহসান হাবীব তাঁর দপ্তরির সঙ্গে চেঁচামেচি করতে লাগলেন, এই আমাকে চা দাওনি কেন?
না। আপনাকে চা দিছি। আপনে চা খাইছেন।

না। কখন খেলাম?
গুণদা বললেন, হাবীব ভাই, আমার সামনেই আপনি চা খেয়েছেন।

গুণদা বুঝলেন। কবি হতে গেলে ভুলে যেতে পারতে হবে। তিনি নেত্রকোনায় তাঁর গ্রাম কাশবনে ফিরে এলেন। রাতের বেলা খেয়েদেয়ে শুতে গেলেন। মাঝরাতে উঠলেন বিছানা থেকে। মাকে গিয়ে বললেন, মা, আজকে তো তুমি আমারে ভাত দাও নাই।

মা বলেন, কী বলিস! একটু আগে না ভাত খেলি সবার সাথে!
না, খাই নাই। তুমি দাও নাই।

মা কাঁদতে লাগলেন। আমার ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

গুণদার ছোট বোন তখন বলে ফেললেন, আমি বুঝছি, দাদার কী হইছে? দাদা আসলে কবি হইতে চায়। (গুণদা তার বোনকে আগেই আহসান হাবীবের গল্পটা বলে ফেলেছিলেন)
নির্মলেন্দু গুণের গল্প শেষ হয় নাই। আরও বলতে হবে। আগামী মঙ্গলবার কবি নির্মলেন্দু গুণের মজার কাণ্ড এবং মহৎ কর্মের কিছু প্রত্যক্ষ স্মৃতি নিয়ে আবারও হাজির হব। আপনারা সামনের মঙ্গলবারে আবারও প্রথম আলো ডটকম বা অন্যআলো ডটকমে আসবেন।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন