‘লেখক হব শুনে মা হেসেছিলেন’

‘লেখক হব শুনে মা হেসেছিলেন’
বিজ্ঞাপন
ভারতে বসে সৃষ্টি করা ইংরেজি সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ রাসকিন বন্ড। গত ১৯ মে ছিল তাঁর ৮৬তম জন্মদিন। জন্মদিনের অছিলায় ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ মুখোমুখি হয়েছিল এ কিংবদন্তি লেখকের। বন্ড শুনিয়েছেন তাঁর লেখক হয়ে ওঠার গল্প। অনুবাদ করেছেন মারুফ ইসলাম।

১৯৫১ সালের শুরু দিকে আমাদের স্কুলের বোর্ড পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা শেষ করে অপেক্ষা করছি ফল প্রকাশের। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ইংরেজি, ইতিহাস ও ভূগোলে ভালো নম্বর পাব কিন্তু গণিত ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে ছিলাম দুশ্চিন্তায়। পরীক্ষা মোটেও ভালো হয়নি। বিজ্ঞান ভালো লাগে না আমার। তবে ফেল করার মতো অতটা খারাপ পরীক্ষাও দিইনি।

ফল প্রকাশের পর কী করব, কোথায় ভর্তি হব—এসব নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাসায় আলোচনা হয়। তখন একদিন আমার সৎবাবা বললেন, তিনি চান আমাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিতে। তবে মা সেটা চান না। মা চান আমি যেন সেনাবাহিনীতে যোগ দিই। আর আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক, তিনি চান ভবিষ্যতে আমি যেন একজন শিক্ষক হই।

বড়দের এসব চাওয়া আমাকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। একেক জনের একেক রকম পরামর্শে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। শেষে সিদ্ধান্ত নিই, আমি একজন শিক্ষক হব। কিন্তু স্কুলের নিয়মকানুন, হোমওয়ার্ক, সাতসকালে পিটি-প্যারেড এসব তো ভালো লাগে না। তাহলে কি সেনাবাহিনীতে যোগ দেব? ওরে বাবা! সেখানে তো আরও কড়াকড়ি নিয়মকানুন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি আমার মাকে গিয়ে বললাম, মা, আমি লেখক হতে চাই। মা শুনে হাসলেন। অবশ্যই তাচ্ছিল্যের হাসি। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমার হাতের লেখা সুন্দর আছে। তুমি বড়জোর আদালতের কেরানি হতে পারবে।’

আমি আমার মাকে গিয়ে বললাম, মা, আমি লেখক হতে চাই। মা শুনে হাসলেন। অবশ্যই তাচ্ছিল্যের হাসি। হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমার হাতের লেখা সুন্দর আছে। তুমি বড়জোর আদালতের কেরানি হতে পারবে।’

আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। তারপর থেকে আমার স্বপ্নের কথা, আমি কী হতে চাই, কী করতে চাই, এসব নিয়ে আর কাউকে কিছু বলতাম না। নিজের ইচ্ছেমতো বই পড়তে শুরু করি। তখন আমার কাছে বই কেনার মতো যথেষ্ট অর্থকড়ি ছিল না। তবে শহরে একটা লাইব্রেরি ছিল। সেখান থেকে দুই রুপি দিয়ে বই ধার নেওয়া যেত। আমি প্রতিদিন একটা করে বই ধার নিতাম। এভাবেই পিজি উডহাউস, আগাথা ক্রিস্টি, ডর্নফোর্ড ইয়েটস, সমারসেট মম, জেমস হিলটন—এঁদের জনপ্রিয় উপন্যাসগুলো পড়ে ফেলি।

মাঝেমধ্যে আমার সৎবাবা আমাকে এক-দুই রুপি করে দিতেন। কিন্তু আমার প্রয়োজন ছিল আরও রুপি। কীভাবে অর্থ উপার্জন করা যায়, এই দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হতো না। শেষে একটা বুদ্ধি পেলাম। সৎবাবার ছিল একটা খুবই পুরোনো আমলের টাইপরাইটার। সেই টাইপরাইটারে আমি গল্প লিখতে শুরু করলাম এবং সারা দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিনে পাঠাতে শুরু করলাম।

মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত ‘মাই ম্যাগাজিন অব ইন্ডিয়া’ নামের একটি ছোট কাগজে আমার গল্প ছাপা হলো। তারা আমাকে সম্মানী বাবদ পাঁচ রুপি মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দিল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এভাবে আমার অর্থ উপার্জন শুরু হয়। আমি ওই ম্যাগাজিনে আরও নানান বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করি। ফলে নিয়মিত আমার কাছে মানি অর্ডার মারফত পাঁচ রুপি করে আসতে থাকে। এসব কথা আমি আমার বই ‘আ সং অব ইন্ডিয়া: দ্য ইয়ার আই ওয়েন্ট অ্যাওয়ে’-তে লিখেছি। ‘আ সং অব ইন্ডিয়া’ আমার আত্মজীবনী সিরিজের চতুর্থ বই। এটি প্রকাশ করেছে পাফিন। এই বইয়ে আমার লেখালেখির শুরুর গল্প আছে, দেরাদুনের শেষ দিনগুলোর কথা আছে, ইংল্যান্ডে যাওয়ার কথা আছে, আবার ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আমার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য রুম অন দ্য রুফ’ লেখার গল্প আছে।

default-image

সত্তর বছর ধরে আমি লিখছি। সাত দশকের লেখালেখির জীবনে আমি শিশুদের জন্য শত শত গল্প লিখেছি। বড়দের জন্যও লিখেছি। এখনো লিখছি। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবানদের একজন এ কারণে যে আমার বসবাসের জায়গাটা পাহাড়ের ওপর, প্রকৃতির কোলে খুবই সুন্দর একটি জায়গায়। আমার চারপাশের প্রকৃতির কাছ থেকে আমি লেখার অনুপ্রেরণা পাই। আমি তাই সব সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি প্রকৃতির প্রতি, কৃতজ্ঞতা জানাই শিশুদের প্রতি, কৃতজ্ঞতা জানাই পশুপাখির প্রতি। কারণ, এরাই আমার লেখার অনুপ্রেরণা। আমার লেখালেখিজুড়ে আছে এরাই।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনারা জানেন, আমার জন্ম হিমাচল প্রদেশের কাসাউলিতে সেই ১৯৩৪ সালে। কিন্তু বেড়ে উঠেছি বিভিন্ন জায়গায়—গুজরাটের জামগড়, দেরাদুন, নয়াদিল্লি ও শিমলায়। এখন বাস করছি মুসৌরিতে। আমার বয়স যখন মাত্র ১৭, তখন প্রথম উপন্যাস ‘দ্য রুম অন দ্য রুফ’ লিখেছিলাম। উপন্যাসটি ১৯৫৭ সালে জন লেওয়েলিন রেইস মেমোরিয়াল পুরস্কার পায়। এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস লিখেছি। শিশুদের জন্য লিখেছি ৪০টির বেশি বই।

এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৩ সালে পেয়েছি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার এবং ২০১২ সালে ভারত সরকার আমাকে প্রদান করেছে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।
একজীবনে আর কী চাই!

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন