বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আর কিছুটা অপেক্ষা করতাম খবরের কাগজের সাহিত্যপাতার জন্য। সপ্তাহের কোনো একদিন যা প্রকাশিত হতো, যদিও প্রচলিত আর প্রথাগত লেখাপত্রের বাহুল্য ছিল সেসব পাতায়। তরুণ লেখকদের, বিশেষত মফস্বলের অস্পৃশ্য করে রাখা সম্ভাবনাময় লেখকদের লেখা নতুনতর কবিতা পড়ার সুযোগ ছিল না সেসব পত্রিকায় কোনো এক অদৃশ্য, অচিহ্নিত সম্পাদকীয় নীতির কারণে। আমরা বরং নিশ্চিন্তে ভরসা রাখতাম ছোট কাগজগুলোর ওপর, অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে হতে হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে স্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দিয়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটানোর সামর্থ্য নিয়ে জন্ম হতো যাঁদের।

এহেন দূরত্বে বসে সাহিত্যচর্চার দুরূহ সময়ে প্রথম আলো নামের দৈনিকটি প্রকাশিত হতে শুরু করে ঢাকা থেকে।

প্রথম আলো প্রকাশিত হওয়ার আগে কোনো কোনো দৈনিকের সাহিত্যের পাতায় দু–একটি কবিতা ততদিনে ছাপা হয়ে গেছে আমার। ডাকে কবিতা পাঠিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা আর সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ‘পত্রিকা বিপণি’র সামনে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের পাতাটুকু উল্টেপাল্টে দেখা ছিল নিয়মিত কাজ। সাহিত্যপাতায় যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের নামটুকুই শুধু জানতাম। সামনাসামনি কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি তখনো। কারা, কোন প্রক্রিয়ায়, কেন আমার কবিতা ছাপছে কিংবা বাতিল করছে তা জানার সুযোগও ছিল না।

ছোট জেলা শহরগুলোতে সাহিত্যচর্চার প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল—দেশের বা দেশের বাইরের সাম্প্রতিক লেখালেখির খবরাখবর খুব সহজে লেখকদের কাছে পৌঁছাত না। বইয়ের দোকানগুলোতে জনপ্রিয় লেখকদের বই-ই শুধু সহজলভ্য ছিল। বই বা পত্রিকা পরিবেশনার প্রথাগত কোনো সিস্টেম থেকে সংগত কারণে দূরত্ব বজায় রাখত ছোট কাগজগুলো। ফলে শিল্পের তাড়া খাওয়া, ঘোরগ্রস্ত কিন্তু পরিশ্রমী ছোট কাগজের সম্পাদকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ না থাকলে তাঁদের সেসব পত্রিকা চোখে দেখার সুযোগই হতো না। এখন যেমন গুগলে দু–চারটে কি-ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করলেই সব তথ্য এসে বসে থাকে চোখের সামনে। ফেসবুকে পছন্দের বা অপছন্দের সাহিত্যিককে ফলো করলেই তাঁর চিন্তা বা কাজের নানান নমুনা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তখন সেসবের কোনো সুযোগই তৈরি হয়নি সেখানে। আমাদের সার্চ অপশন ছিল বহুবিধ কণ্টকে আকীর্ণ।

সেসব অনুসন্ধানের দায়, খেয়াল করে দেখলাম, প্রথম আলো, বিশেষত তার সাহিত্যপাতা নিজ কাঁধে নিয়ে বসে আছে। তরুণ কবিদের কবিতার পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রকাশিত প্রথাবিরোধী সাহিত্য পত্রিকার খবরও এই দৈনিক মারফত আমাদের কাছে পৌঁছাতে লাগল।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে লেখা প্রকাশের অনেক মাধ্যম তৈরি হয়ে যাওয়ায় এখন এ ব্যাপারটা হয়তো আর নেই; কিন্তু তখন লেখালেখি শুরুর প্রথম দিকে, দু–একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক কাগজে কবিতা ছাপা হওয়া ছিল আমাদের অনেকের কাছে আত্মশ্লাঘার বিষয়। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের নামের পাশে নিজের ছাপা নাম দেখতে পেলে প্রভূত আনন্দ হতো। রংপুরে টাউন হল মাঠের অর্থপূর্ণ আড্ডার মেজাজ থেকে তৈরি হওয়া কবিতা সুদূর ঢাকায় কারা যেন পরম মমতায় ছেপে দিচ্ছেন, যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়নি কখনো, পরিচয়ই নেই—এসব ভেবে সাহিত্য সম্পাদক তো বটেই, অচেনা–অজানা কম্পিউটার অপারেটরের প্রতিও কী যে ভালো লাগা তৈরি হতো!

বছরখানেক পরে, ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে প্রথম আলোর তৎকালীন সিএ ভবনের অফিসে প্রথম দেখা হয় সাজ্জাদ ভাই, মানে কবি সাজ্জাদ শরিফের সঙ্গে। তখন সম্ভবত তিনি সাহিত্যপাতাটা দেখাশোনা করতেন। তারিখটাও মনে করতে পারি, ২০ নভেম্বর। কারণ, ওই দিন বেগম সুফিয়া কামাল প্রয়াত হন, আর সাজ্জাদ ভাই সেই কারণে আমাকে মিনিট পাঁচেক সময় দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে চলে যান সুফিয়া কামালের বাড়ি।

পেশাগত কাজে পরবর্তী সময়ে দুই বছর ঢাকাবাসের সময় যোগাযোগগুলো খুব যে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তা হয়তো নয়, কিন্তু দেখা হতো, টুকটাক কথাও হতো প্রিয় মানুষদের সঙ্গে। যেচে লেখা দিতে না পারার অভ্যাস আমার বরাবরের। যাঁরাই বিভিন্ন সময়ে প্রথম আলোর সাহিত্যপাতা কিংবা ঈদসংখ্যার দায়িত্বে থেকেছেন, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত আমার অলসতা কিংবা অন্তর্মুখীনতাকে অগ্রাহ্য করে তারাই একরকম জোর করে ধস্তাধস্তি করে লেখা আদায় করে নিয়ে ছেপেছেন, হালের আলতাফ শাহনেওয়াজ পর্যন্ত।। হয়তো সে কারণেই এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া কবিতার সংখ্যাই আমার বেশি।

েতইশ বছর আগে, কোনো এক শীতের সকালে রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের বুকস্টল থেকে পাঠক হিসেবে প্রথম আলোর উদ্বোধনী সংখ্যা সংগ্রহ করার সময় আমি কখনোই ভাবিনি ২০২১ সালে এসেও পত্রিকাটির সঙ্গে আমার লেখালেখির সম্পর্ক টিকে যাবে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সংকট আর টানাপোড়েনের মধ্যেও টিকে আছে তো!

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন