শঙ্খ ঘোষ
শঙ্খ ঘোষ

‘কখনো এমন হয়, হতে পারে, বানিয়ে তুলতে হয় সব
ইস্কুলই পুলিশফাঁড়ি।
আর পড়ুয়ারা?
পথে বা বিপথে তারা প্রত্যেকেই একে একে AK 47!’
(নিরুপায়)
সেই ‘বাবরের প্রার্থনা’র যুগ থেকে শঙ্খ ঘোষ আমাদের অন্তঃশীলে প্রবাহিত করে চলেছেন বহির্বাস্তবের রেখা ও রং। নিষ্ঠ চিত্রীর মতো ক্ষান্তিহীন তাঁর এ সাধনা। নিবিড় তাঁর বুনোট, নিমগ্ন তাঁর সত্তা।

প্রসাধিত প্রবঞ্চনায় শঙ্খের অনাস্থা; তিনি বরঞ্চ জীবনের রুক্ষ প্রতিবেদনের ভেতর থেকে সংগ্রহ করে চলেন শিল্পের শাঁস। তারপর শব্দে-ছন্দে বিন্যাসে তারা ধারণ করে কবিতানাম্নী চুনির আকার। পান্নার প্রতিম নিজস্ব-নিরালা এমত কবিতাভান্ডার নির্মাণের অধিক যেন সৃষ্টি। সচেতনভাবেই উপর্যুক্ত বাক্যটি ব্যবহৃত হলো। কেননা গোটা ‘দেশজোড়া জউঘর’ (২০১০) পড়তে গিয়ে মনে হবে কবিতার ছলে এ তো আমাদেরই আত্মকথা—
‘সবাই আমার ভালো করতে চায়।
ওরা এসে আমার ভালো করতে চাইলে
ঘর ছেড়ে এগিয়ে যাই
ওরা কেটে নেয় আমার ডান হাতখানা
ঝুলিয়ে দেয় গাছের ডালে
এরা এসে আমার ভালো করতে চাইলে
মাঠ ছেড়ে এগিয়ে যাই
এরা কেটে নেয় আমার বাঁ হাতখানা
গেঁথে দেয় আলপথে।’
(ভালো)

বিজ্ঞাপন

ছেষট্টিটি কবিতার গাঁথা মালা এই বই। প্রারম্ভ কবিতা ‘ভালো’ থেকে শেষের কবিতা ‘ঘরখোয়ানো’ পর্যন্ত যেমন বৈচিত্র্যের বিভা ব্যাপ্ত, তেমনি আবার এক নিবিড় পরম্পরার স্বাদও অলভ্য নয়। সব মিলিয়ে পাঠকের জন্য এ এক চাঞ্চল্যকর ভ্রমণ। উপরন্তু ‘নজর’, ‘স্থবির’, ‘ভাঙাসেতু’ শীর্ষক পর্বত্রয়ী গহন-গভীর সংকেত রেখে চলে।
ঠিকই তো, কবি তো নজরদারই বটে। স্থবির সময়ে তিনি আমাদের অন্তর্গত সব সেতুর ভাঙন চাক্ষুষ করছেন। জগদ্দল পাষাণকালের লীয়মান পরিস্থিতির দ্রষ্টা ছাড়া তো কিছু নন তিনি। এই চোখেই একদা জলকেও পাষাণ হতে দেখেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। সেই পাষাণদশা এখন তার সমস্ত আবডাল ছিন্ন করেছে। জলের বুক ছাপিয়ে এখন সে সর্বত্র বিস্তারিত। বিস্তারিত তো শুধু নয়, বরং একই সঙ্গে সে—
‘নিস্তারহীন পর্বের সূচনা করেছে যে ব্যক্তি ও বিশ্বপ্রাণকে যেন ঠেলে দিয়েছে
নিরস্তিত্বের বাস্তবে।’
শঙ্খ ঘোষের ‘কবিজীবন’ (১৯৯৯) নামের উন্মোচক গ্রন্থে তারাপদ আচার্যের আবিষ্কার—
‘আত্মবিস্তারের যে কবিতা, তারও আছে আত্মনির্মিতি ও সৃজন। আবার আত্মকেন্দ্রিকতার যে কবিতা, তার মধ্যেও আছে বিশ্ব। বিশ্বের কোনো ঘটনা বা সাময়িক বিক্ষোভ যে কবিতার বিষয়, তার মধ্যেও সঞ্চারিত থাকে আলাদা মাত্রা, কবিতা সেখানে রাষ্ট্রিক ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদ জানায়। কবিতা সেখানে খুব বড় ধরনের এক অস্ত্র; সে অস্ত্রে বহুতর বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে অমোঘ আঘাত হানা যায়। নিজেকে আড়ালে রেখে এই আঘাত করার বিচিত্র ছন্দ কবির হাতে ধরা।’

কোনো দৈব সমাধানের ফুলঝুরিতে আস্থা নেই তাঁর। রক্ত–মাংস ভেদ করে হাড়ের কাঠামো পর্যন্ত জাজ্বল্য করে দেখাতেই স্বস্তি শঙ্খের। নিখিল যে লাশের বাস্তবে বসবাস আমাদের, তার চিত্র তিনি ফুটিয়ে তোলেন নিরাভরণ। কোনো প্রাসাদে-মঞ্জিলের ডঙ্কায় তাকে ঢেকে রাখার উপায় নেই। যেন এক নির্নিদান যুগের উদয় হয়েছে, যেখানে স্বপ্নও অনাহত নয়।

পরোক্ষতার সঙ্গে যাথার্থ্যের মিলন ঘটিয়ে অনায়াস-ইন্দ্রজাল রচনা করেন শঙ্খ। এর মাধ্যম কখনো খুঁজে পান পুরাণে আর কখনো বা কুড়িয়ে নেন ঘটমান বর্তমানের মাঠ থেকে। তাই ‘সৌপ্তিক পর্ব’–এর পাশে হাত ধরাধরি অবস্থান করে ‘পলিটিকালি’র মতো কবিতা, ‘গুম’-এর সঙ্গে দেখি ‘অধ্যাস’-এর সহাবস্থান। শঙ্খালোচনায় শব্দ সুপ্রয়োগের এ উল্লেখ বাহুল্যমাত্র মনে করি না। কারণ, তিনি তো শব্দ আর সত্যকে সমার্থক জ্ঞান করেন। শিল্প তাঁর কাছে উপরিতলার সজ্জা নয়, বরং শিল্পেই সৃজিত তার অন্তর্গত বিভূতি।

‘স্বপ্নবাস্তব’ কবিতায় কল্পিত এক ‘তিনি’র দেখা পাই। এই তিনি কি পরিত্রাতা, মোজেস না আত্মরূপেরই অন্যতর প্রতিভাস? টুকরো উদ্ধৃতিতে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক—
‘তাকিয়ে দেখি আমারই বসতির চারপাশে
ঘিরে আছে অচরিতার্থ সারি সারি শব।
পরেরই মুহূর্তে তিনি প্রাসাদে মঞ্জিলে ঢেকেছিলেন তাকে, আর
পা বাড়ালেন ফিরে যাবার জন্য।
আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করি তখন: কিছু কি বলবেন আমাকে?
হেসে জানালেন তিনি:
একটাই শুধু কথা—
তোমার স্বপ্নে কোনো বাস্তব নেই, বাস্তবে নেই কোনো স্বপ্ন।’

বিজ্ঞাপন

দেখতি পাচ্ছি, কোনো দৈব সমাধানের ফুলঝুরিতে আস্থা নেই তাঁর। রক্ত–মাংস ভেদ করে হাড়ের কাঠামো পর্যন্ত জাজ্বল্য করে দেখাতেই স্বস্তি শঙ্খের। নিখিল যে লাশের বাস্তবে বসবাস আমাদের, তার চিত্র তিনি ফুটিয়ে তোলেন নিরাভরণ। কোনো প্রাসাদে-মঞ্জিলের ডঙ্কায় তাকে ঢেকে রাখার উপায় নেই। যেন এক নির্নিদান যুগের উদয় হয়েছে, যেখানে স্বপ্নও অনাহত নয়। রাহুর এমন ব্যাপ্ত প্রতাপে কবি আমাদের কীই–বা শোনাতে পারেন? কিন্তু না। ফুলের জলসায় কবি তাই নীরব থাকেন না। তিনি যেন নিরুচ্চার শুভর জেগে ওঠার প্রতীক্ষায়—
‘দাহকাজ সাঙ্গ করে যে যার মতো ফিরে গেছে সবাই
গোটা পাড়া শুনশান
কাছেই শেয়াল ডাকছে
ঘরের পাশে লেগে থাকা রক্তদাগ মুছে নিতে নিতে
বিড়বিড় করছে দাওয়ায় বসে থাকা একলা বুড়ো
জেগে থাকাও
জেগে থাকাও একটা ধর্ম।’
(বুড়ো)
কবি তাঁর আসা-যাওয়ার পথের ধারে সবাইকে দেখেন নিদ্রামগ্ন। দশ দিকে কেবল সুপ্তির সাধনা। এই বিরূপ বিদ্যমানে বসতি গেড়েও নিজেকে তিনি সঁপে দেন না ঘুমের গহ্বরে।
চেতনার অবনয়নের কালে কবিতা, শিল্প কোনো কিছুরই তো বাইরে থাকার জো নেই। তবে আশা এই, জতুগৃহকে ক্রমাগত অস্ত্রঘরে রূপ নিতে দেখে শঙ্খ ঘোষ নামে এক বাঙালি কবি ভাবছেন ‘এখন তবে জেগে থাকাই ধর্ম বটে।’

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন