default-image

শাগি চুপচাপ তার মাকে দেখছিল। সারাক্ষণই দেখতে থাকে। তিন ছেলেমেয়েকে একই ছাঁচে গড়েছে অ্যাগনেস, তার প্রত্যেক সন্তান জেলখানার পাহারাদারের মতো একাগ্র ও সাবধানী।

‘তাইলে এখুউউউন এট্টু হালকা হালকা মজাআআ।’ টিভিতে দেখা অর্থহীন সংলাপ অনুকরণ করে বলে শাগি।

অ্যাগনেস শিউরে ওঠে। তার নেলপলিশ–রাঙা হাতের আঙুল দিয়ে শাগির মুখটা মুঠোয় ধরে টোল খাওয়া গালে মৃদু চাপ দিতে থাকে। ছেলেটার নিচের ঠোঁট চাপ খেয়ে বেরিয়ে আসা পর্যন্ত অ্যাগনেস ঠেলতেই থাকে, ‘এ...খ...ন’, সে উচ্চারণ ঠিক করে দেয়, ‘এ...খ...ন।’

নিজের গালের ওপরে মায়ের স্পর্শ ওর ভালো লাগছিল, তাই মাথাটা একটু কাত করে তুলে ধরে টোপ ফেলে ‘এক্ষুউউউউন।’

অ্যাগনেস ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হাতের তর্জনী শাগির মুখের ভেতর ঠেলে ঢুকিয়ে নিচের পাটির দাঁতের মাড়িতে চাপ দেয়। আলতো করে শাগির চোয়াল খুলে ফেলে টেনে ধরে বলে, ‘ওদের লেভেলে নিজেকে নামানোর কোনো দরকার নেই, বাবু। দেখি আবার বলো তো!’

মায়ের আঙুল নিজের মুখের ভেতর নিয়েই শাগি ঠিকঠাক শব্দটা উচ্চারণ করে, যদিও খুব স্পষ্ট হয় না। ওকারটা খুব সুন্দরভাবে উচ্চারিত হলো, ঠিক যেমন মা পছন্দ করে। অ্যাগনেস অনুমোদকসূচক মাথা নেড়ে ঠোঁট ছেড়ে দেয়, ‘তাইলে কি মানে আমরা ঘুরের মুইদ্যে আর ঘুরাঘুরি কুরতে পারবুউউউ নাআ?’ মাকে খ্যাপানোর জন্য এ রকম আবোলতাবোল পাগলামিভরা বাক্যটা শেষ করার আগেই খুব হাসতে হাসতে দৌড় লাগায় সে। অ্যাগনেসও ছোটে তার পেছন পেছন। খুশিতে, উত্তেজনায় খলবল করতে করতে শাগি বিছানার চারপাশে দৌড়ে বেড়ায়।

বিজ্ঞাপন

অ্যালার্ম ঘড়ির পাশে অনেক ক্যাসেট রাখা। শাগি সেগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে কিছু মাটিতে ছিটানোর পর তার পছন্দের রেকর্ডটা খুঁজে পায়। অ্যালার্ম ঘড়িটা অ্যাগনেসকে কিনে দিয়েছিল শাগ। সে একগাদা পেট্রলের কুপন জমিয়ে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, সেগুলো অ্যাগনেসের হাতে তুলে দিয়েছিল যেন সোনার তাল। প্লাস্টিকের বোতাম টিপলে ক্যাসেটের বক্স খুলে যায়। শাগি ভেতরে টেপ ঢুকিয়ে রিউইন্ড করে একদম শুরুতে নিতে নিতে তার চেঁচামেচি চালিয়ে যায়। অ্যালার্ম ঘড়ির ভেতরে ক্যাসেটের শব্দটা ধাতব আর ফাঁপা লাগে, তবে অ্যাগনেস তাতে কিছু মনে করে না। সুরের কারণে ঘরটা কম খালি খালি লাগে। শাগি বিছানার ওপরে দাঁড়িয়ে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে। সেভাবেই কিছুক্ষণ তারা দুলতে থাকে সুরের তালে তালে। অ্যাগনেস ছেলের নাকে চুমু খায়। শাগি মায়ের নাকে চুমু খায়।

গান বদলের সঙ্গে সঙ্গে শাগি দেখে তার মা বিয়ারের ক্যান বুকে চেপে ঘরময় ঘুরে ঘুরে নাচছে। অ্যাগনেস জোর করে চোখের পাতা বন্ধ করে এমন এক জায়গায় চলে যায়, যেখানে সে উদ্ভিন্নযৌবনা, আশাবাদী ও আকাঙ্ক্ষিত। সেই ব্যারোল্যান্ডে, যেখানে অচেনা পুরুষেরা ক্ষুধিত চোখে বলরুমজুড়ে তার পেছন পেছন ঘুরত আর নারীরা হিংসায় চোখ নামিয়ে নিত। হাতের আঙুলগুলো একটা সুন্দর পাখার মতো মেলে দিতে দিতে সে এখন নিজের গায়ে হাত বোলায়। ঠিক কোমরের ওপরে একগুঁয়েভাবে জমে থাকা চর্বি স্পর্শ করে, যা সে তিন সন্তান জন্ম দিতে দিতে অর্জন করেছে। হঠাৎই তার চোখ খুলে যায়। অতীত থেকে ফিরে আসে সে। নিজেকে তার বোকা বোকা, পচা একটা চর্বির পিণ্ড মনে হয়।

‘এই ওয়ালপেপারটা অসহ্য। ওই পর্দাগুলো অসহ্য। ওই বিছানা আর ওই বালের ল্যাম্প সব...সব অসহ্য!’

শাগি তার মোজা পরা পায়ে নরম সুজনিঢাকা বিছানার ওপর উঠে দাঁড়ায়। সে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে আবার তার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু এবার অ্যাগনেস তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়।

default-image

ভূমিকা ও অনুবাদ: লুনা রুশদী

প্রতিবছরই মনে মনে বুকার পুরস্কার নিয়ে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করি। সাধারণত মিলেও যায়। পুরস্কারটা নির্দিষ্ট একটা বইয়ের লেখককে তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি, গল্পের বিস্তার, লেখকের নিজস্বতা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর খেয়াল রেখে দেওয়া হলেও বিশ্বরাজনীতির কিছুটা প্রভাব এখানেও এড়ানো যায় না। যেমন এখনকার দুনিয়ায় মানবিক অধিকারবিষয়ক যে কয়েকটি বিষয় কেন্দ্রে রয়েছে, তা হলো নারীবাদ, সমকামীদের অধিকার আর জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকে ঘিরে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন। এর প্রতিফলন দেখতে পাই এ বছরের বুকার বিচারকদের মধ্যে। এবার বিচারকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্গারেট বাসবি, যিনি ঘানায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাজ্যে, পরবর্তীকালে তিনি প্রথম কৃষ্ণবর্ণ নারী প্রকাশক হয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে অ্যালিসন অ্যান্ড বাসবি নামের প্রকাশনী সংস্থা শুরুর মাধ্যমে। এ বছরে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম এক শ জন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের মধ্যে একজন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য বিচারকদের মধ্যেও ছিলেন জন্মসূত্রে ইথিওপিয়ান, কৃষ্ণাঙ্গ লেখক লেম সিসে ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত সমীর রহিম। বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া বইগুলো পড়ার আগে শুধু লেখকদের দিকে দেখলেই তাঁদের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন ও পারিপার্শ্বিকের আভাস পাওয়া যায়। সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ছয় লেখকের ভেতরে এবার তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ, একজন ভারতীয় আর দুজন ছিলেন শ্বেতাঙ্গ; চারজন নারী ও দুজন পুরুষ; তিনজন সমকামী; মোট ছয়টির ভেতরে চারটি বই–ই প্রথম বই। এবারের বইগুলোতে মোটা দাগের আরও কিছু মিল দেখতে পাই, মা ও সন্তান অথবা পারিবারিক সম্পর্ক; সমাজে উপেক্ষিত, নির্যাতিত অথবা প্রান্তিক মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পগুলো বলা হয়েছে। কোভিডের কারণে এবার লেখকেরা নিজের বাড়ি থেকে অন্তর্জালের মাধ্যমে বুকার পুরস্কার উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানে হাজিরা দিয়েছেন। এ সম্পর্কে দুবার বুকার ও সাহিত্যে নোবেলজয়ী কাজুও ইশিগুরো মন্তব্য করেছেন, ‘হয়তো এবারেই বিষয়টা লেখকদের জন্য একটু আরামদায়ক হলো। লেখার সময় একজন লেখক একা, পড়ার সময় পাঠক একা অথচ লেখালেখি উদ্‌যাপনের এই চাকচিক্যময় অনুষ্ঠানে লেখকের উপস্থিত থাকতে হয় বহু অচেনা মানুষের ভিড়ে, নিজের বাড়ির অভ্যস্ততার বাইরে গিয়ে সাধারণত অন্তর্মুখী এই মানুষগুলো হয়তো কিছুটা বিব্রতবোধ করেন, আর তার সঙ্গে উৎকণ্ঠা তো থাকেই। হয়তো কোভিডের কারণে তাঁরা কিছুটা নিস্তারই পেলেন।’ যুবরাজ চার্লসের সহধর্মিণী ক্যামিলা এই ৫২তম বুকার পুরস্কারের উদ্‌যাপনী অনুষ্ঠানে করোনার সময়ে বই পড়া সম্পর্কে বলেছেন, ‘কোভিডের সময় বহু কিছু থেকে বঞ্চিত হলেও অন্তত বই পড়তে পেরেছি। আর এর মানে ভ্রমণ করা, অন্বেষণ করা, হাসা, কাঁদা এবং জীবনের রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করা। এ জন্যই এ বছরের বুকার পুরস্কার অন্যান্য বছরের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আমরা ইংরেজি সাহিত্যের ঐশ্বর্যময়তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পাই। এর মাধ্যমে ধন্যবাদ জানাতে পারি একটা বইয়ের রূপান্তরকারী ক্ষমতাকে, যা কাঁটাগাছকেও ফুল বানাতে পারে। সর্বোপরি, বুকারের মাধ্যমে আমরা সেই সব দুর্দান্ত লেখককে উদ্‌যাপন করি, যাঁরা তাঁদের এই শক্তির মাধ্যমে পাঠকদের প্ররোচিত করেন, নাড়িয়ে দেন ও সান্ত্বনা দেন।’ একই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন ‘একটা বই লেখা কোনো সহজ কাজ নয়, বিশ্বাস করেন, আমি জানি। এই পৃথিবীটাকে বোঝার জন্য আমি সব সময়ই লেখালেখির আশ্রয় নিয়েছি। এখনো লেখকদের অবিশ্বাস্য সব গল্প আমাকে মুগ্ধ করে। সমালোচকেরা অবশ্য আমার বক্তৃতাগুলোকেও বলেছেন গল্প।’ এ বছরের বৈশ্বিক হালচাল দেখে ধরে নিয়েছিলাম, কৃষ্ণাঙ্গ নারী লেখকদের একজন এবার বুকার পাবেন। অথচ জিতলেন স্কটিশ-আমেরিকান লেখক ডগলাস স্টুয়ার্ট। তিনি জন্মেছেন গ্লাসগো শহরে, বর্তমানে নিউইয়র্কে থাকেন এবং ‘শাগি বেইন’ তাঁর প্রথম উপন্যাস। আত্মজৈবনিক এই উপন্যাস তিনি লিখেছেন ১২ বছর ধরে। উপন্যাস নিয়ে ডগলাস বলেন, ‘শাগি বেইন’ মূলত একটা ভালোবাসার গল্প, যা আশির দশকে গ্লাসকো শহরের এক শ্রমজীবী পরিবারকে ঘিরে লেখা হয়েছে। এখানে অ্যাগনেস নামে এক নারী ভালোবেসে বিয়ে করেছিল ট্যাক্সিচালক শাগ বেইনকে। তিন সন্তান জন্মানোর পর একসময় শাগ বেইন স্ত্রীকে ছেড়ে যায়। চলনে–বলনে এলিজাবেথ টেইলরকে অনুকরণ করতে চাওয়া অ্যাগনেস এ ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। প্রতিকূল পরিবেশে তিন সন্তান কীভাবে মায়ের আশ্রয় হয়ে উঠতে চেয়েছিল, সেই গল্পই বলা হয়েছে এ উপন্যাসে। তিন সন্তানের ভেতর সবচেয়ে ছোট শাগি। অনূদিত অংশটুকু বইয়ের চতুর্থ অধ্যায় থেকে নেওয়া। পাঁচ বছর বয়সী শাগি ও অ্যাগনেসের কিছু মুহূর্ত ধরা পড়েছে এখানে।
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন