নাসির উদ্দীন ইউসুফের ছবি অবলম্বনে কোলাজ
নাসির উদ্দীন ইউসুফের ছবি অবলম্বনে কোলাজ

নাসির উদ্দীন ইউসুফ ভাইকে আমি ডাকি ‘কমান্ডার’ বলে, বড় ভাই বলে, ওস্তাদ বলে। আমি তাঁকে বলেছি, বড় ভাই, আপনি যা বলবেন, আমার জন্য সেটা কিন্তু আদেশ। কাজেই বুঝে-শুনে বলবেন। বললেই কিন্তু আমি পালন করব।

আমি নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে গিয়েছিলাম আমেরিকায়, হিউস্টনে, ফোবানার অতিথি হয়ে। আমরা একসঙ্গে গেছি, একসঙ্গে ফিরেছি, একই বাসায় থেকেছি। আমাদের সঙ্গে সেবার ফোবানায় কবি রফিক আজাদ এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও ছিলেন।

সেখানে, ফোবানার অনুষ্ঠান চত্বরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখেছিলাম। একজন প্রবাসী বাঙালি এসেই প্রথমে নাসির উদ্দীন ইউসুফকে স্যালুট করলেন। তারপর আলিঙ্গন। তারপর কথার ফুলঝুরি। আমি ব্যাপারটা লক্ষ করলাম। এই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফের নেতৃত্বাধীন থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তাঁর অভিযানের কাহিনি তিনি বলেছিলেন এমন সরস ভঙ্গিতে যে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়েছিলাম। আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তাঁরা কাঁদছিলেন।

আমার জীবনে নাসির উদ্দীন ইউসুফের প্রভাব অনেক। ছোটবেলায় রংপুরে বসে পড়েছিলাম ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত তাঁর রচনা ‘ঘুম নেই’। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে এমন মর্মস্পর্শী সাহিত্যিক রচনা আমি খুব কমই পড়েছি। এরপর পড়ি তাঁর বই ‘টিটোর স্বাধীনতা’। এটাও একটা অসাধারণ বই।

বিজ্ঞাপন

নাসির উদ্দীন ইউসুফ আমাকে ‘মা’ বইয়ের কাহিনির সন্ধান দেন। ২০০১ সালের ঘটনা। তিনি বলেন, আমাদের একটা ভাই ছিল, মুক্তিযোদ্ধা, আজাদ, আজাদ ভাইয়ের মা জানিস ভাত খেতেন না। তিনি আমাকে বলেন একুশে টিভির জন্য নাটক লিখে দিতে। আমি বলি, না, টিভি নাটক বানিয়ে এই কাহিনির অমর্যাদা করা যাবে না। কারণ, টিভি নাটক সবাই ভুলে যাবে। এটা বই করতে হবে। তখন আমি প্রথম আলোয় বিজ্ঞাপন দিই, মগবাজার এলাকায় থাকতেন আজাদ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন, কেউ কি তাঁর কোনো খোঁজ জানেন? এরপর আস্তে আস্তে আজাদের পরিবারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধে আজাদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে জানতে প্রথম বৈঠকটা আমরা করি নাসির উদ্দীন ইউসুফের নয়াপল্টনের বাড়িতে। শিমূল ইউসুফ ছিলেন, আর ছিলেন হাবিবুল আলম বীর প্রতীক। গল্প শুনতে শুনতে ডিনার। তারপর সারা রাত কেটে গেল। তাঁর বাসা থেকে যখন বের হলাম, তখন ভোরের আজান হচ্ছে।
নাট্যকার সেলিম আল দীনের স্নেহও পেয়েছিলাম। তিনি আমাদের কবিতা পড়ার জন্য জাহাঙ্গীরনগরে নেমন্তন্ন করে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর নাট্যজন শিল্পী আফজাল হোসেনের ‘মাত্রা’র অফিসে বসে সেলিম আল দীনের কণ্ঠে সদ্য রচিত নাটকের পাঠ শুনতাম। পরে যখন সেগুলো বই হয়ে বেরোত, তা পড়ে অভিভূত হলেও আমার চিন্তা ছিল, বর্ষায় দুকূল উপচে পড়া বেনোজলের মতো সেলিম আল দীনের নাটক, এর কোনো কূল নাই, কিনার নাই, এ থেকে নাট্য মঞ্চায়ন কীভাবে সম্ভব। পরে নাসির উদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনায় নাটকগুলো দেখতে যেতাম। ‘প্রাচ্য’, ‘বনপাংশুল’—এসব নাটক। তখন বুঝতে পারলাম, এই অসম্ভবকে সম্ভবপর করে তুলেছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। আমি তখন থেকেই এই মত পোষণ করে চলি যে নাসির উদ্দীন ইউসুফের মতো নির্দেশক না পেলে সেলিম আল দীনকে আমরা মঞ্চে পেতাম না। সেলিম আল দীন পুস্তকের কালো অক্ষরেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। আমি অবশ্য প্রথম দেখি ‘কেরামতমঙ্গল’। দেখে ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকায় রিভিউ লিখেছিলাম। জেলখানা থেকে মিনার মাহমুদ সেই ‘রিভিউ’ পড়ে আমাকে চিঠি লিখেছিলেন, ‘আমাদের লেখালেখির জগৎ আপনাকে চায়, আপনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যাবেন না।’

তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, এটাই আমার কাছে তাঁর বড় পরিচয়। সে কারণেই আমি বলি, তিনি যা আদেশ করবেন, তা আমি শুনব। আমি যেমন সুবেদার ওহাব (বীর বিক্রম)-কে দেখলে দাঁড়িয়ে সালাম তো করতামই, তাঁর ব্যাগ বহন করে দিতাম। এটা আমি করবই। তবে দ্বিতীয় যে কারণে আমি নাসির উদ্দীন ইউসুফকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তা হলো, ঢাকা থিয়েটারে নির্দেশক হিসেবে, সেলিম আল দীনের নাটকগুলোর পরিচালক হিসেবে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ ভাইকে পেয়েছিলাম ১৯৯০-এর আন্দোলনের সময়। এরশাদ সাহেবের পদত্যাগের ঘোষণার পরে রাত ১০টায় আমরা প্রেসক্লাবের সামনে মিছিল করে আনন্দ করছিলাম। নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিমূল ইউসুফ মাইক আনলেন, মঞ্চ তৈরি করে ফেললেন। সারা দিন-রাত গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদি হতে লাগল পল্টনে সিপিবি অফিসের পাশে। তারপর যখনই সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে, তখনই তাঁকে রাজপথে দেখেছি। শাহবাগের আন্দোলনের সময় রাস্তায় ছিলেন। এখনো তাঁরা সজাগ ও সক্রিয় আছেন। যদিও একটা সমালোচনা আছে যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তাঁরা সরব নন। তবে বেশ কয়েকটা ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে সরকারের নীরবতা কিংবা যা তাদের কাছে সরকারের ভুল পদক্ষেপ বলে মনে হয়েছে, তার সমালোচনা করেও তাঁরা বিবৃতি দিয়েছেন।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, এটাই আমার কাছে তাঁর বড় পরিচয়। সে কারণেই আমি বলি, তিনি যা আদেশ করবেন, তা আমি শুনব। আমি যেমন সুবেদার ওহাব (বীর বিক্রম)-কে দেখলে দাঁড়িয়ে সালাম তো করতামই, তাঁর ব্যাগ বহন করে দিতাম। এটা আমি করবই। তবে দ্বিতীয় যে কারণে আমি নাসির উদ্দীন ইউসুফকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তা হলো, ঢাকা থিয়েটারে নির্দেশক হিসেবে, সেলিম আল দীনের নাটকগুলোর পরিচালক হিসেবে। তার সঙ্গে যদি যোগ করি যে টেলিভিশন প্রযোজক হিসেবে ‘যদি কিছু মনে না করেন’ বা টেলিভিশন বিতর্কর প্রযোজক তিনিই ছিলেন, তা হয় সোনায় সোহাগা। ‘একাত্তরের যীশু’ বা ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্র মুকুটে নতুন পালক মাত্র।

১৯৫০ সালের ১৫ এপ্রিল নাসির উদ্দীন ইউসুফের জন্ম। সেদিন পয়লা বৈশাখ ছিল। আজ ২ বৈশাখ। তিনি ৭১ পূর্ণ করলেন। ‘একাত্তরের যীশু’ ছবির নির্মাতার ৭১ বছর বয়স খুব গুরুত্বপূর্ণ।
শুভ ৭১, কমান্ডার!

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন