বিজ্ঞাপন

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে আশির দশকে পরিচিত বন্ধুবৃত্তের মধ্যে সঞ্জীবের গান শোনা গেলেও ‘আহ’ নামে ‘দলছুট’-এর প্রথম অ্যালবাম বের হয় ১৯৯৭ সালে। এরপর ২০০৫-এ ‘স্বপ্নবাজী’ শিরোনামে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম ও একমাত্র একক অ্যালবাম। ‘দলছুট’-এর অন্যান্য অ্যালবামের নামও এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলে ফেলা যায়: ‘হৃদয়পুর’ (২০০০), ‘আকাশচুরি’ (২০০২), ‘জোছনাবিহার’ (২০০৫), এবং ২০০৭-এ সঞ্জীবের মৃত্যুর পর ২০১০-এ বের হয় ‘আহ আমন্ত্রণ’। তবে এই অ্যালবামে সঞ্জীব চৌধুরীর কাজ ছিল অনুপস্থিত। সেই অর্থে খুব বেশি দিন গান করতে পারেননি সঞ্জীব। কিন্তু গণতন্ত্র-পরবর্তী আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তীয় মন, রুচি-পছন্দ ও জনসংস্কৃতির নাড়ি বোঝার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে তাঁর গান।
কথাটি খোলাসা করতে হলে ফিরতে হবে নব্বই দশকের শুরুর পর্বে। গণতন্ত্রের জন্য ঢের আত্মত্যাগ ছিল আমাদের। স্বপ্নের সেই গণতন্ত্র অর্জিত হলোও, কিন্তু অচিরকালের মধ্যেই সেটি হারাতে শুরু করল তার কার্যকারিতা। এই স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা পয়লাই অনুভব করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, যাদের বড় অংশ ছিল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তরুণ। উপরন্তু নিকট সময়ে সোভিয়েত পতনের ফলে বিশ্ব ব্যবস্থায়ও তখন ঘটে গেছে বড়সড় অদলবদল। মুক্তবাজার অর্থনীতির উন্মুক্ত প্রবাহ পালে হাওয়া পেয়েছে তত দিনে। এই পাটাতনে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামোতে ভালো-মন্দ—বিস্তর পরিবর্তন তো ঘটলই, পাশাপাশি মাল্টিন্যাশনাল আর করপোরেটের শীতল ঘরে ঢুকে ধীরে ধীরে একপ্রকার ভাষাহীন হতে শুরু করলাম আমরা। পক্ষান্তরে শাসক শ্রেণির ষোলো আনা বিধি-নিষেধ জারি থাকল আগেই মতোই। এর সঙ্গে শাকের ওপর আঁটির বোঝার মতো গণতান্ত্রিক ও করপোরেটজাত সমাজে তৈরি হলো নতুন নতুন উপশাসক। শাসনের ষোলো আনাকে আরও দুই আনা বাড়িয়ে যেন আঠারো আনা করে তুললেন সবাই মিলে। সঞ্জীব চৌধুরীর গান এবং সেই গানের জনপ্রিয়তার উৎস বুঝতে হলে সমাজতাত্ত্বিক এই বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। প্রসঙ্গগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হবে তাঁর গানের গড়ন ও বিস্তারকে।
মেলা দিন পর শিক্ষিত তরুণ সমাজকে ভাষা দিয়েছিল সঞ্জীবের গান। সেখানে অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে যেমন বক্তব্য যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আছে নগরজীবনের প্রেম, বিপন্নতা, বিষাদসহ যাপনের দহনঘেরা আনন্দ—আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। আর আগেই তো বললাম, সঞ্জীবের গান খোলা হাওয়ার মতো—সেটা গানের কথা বা গায়কি—যা-ই বলি না কেন।

এই অদ্ভুত বিন্যাসের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোত্রের কণ্ঠে কণ্ঠেই সঞ্জীব মূলত গীত হতে থাকলেন (এখনো কি তা-ই নন?), প্রচারিত হতে থাকলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের জনসমাজের এই পলায়নবাদী বাস্তবতা বোধ করি বেশ ভালোভাবেই ধরেছিলেন সঞ্জীব। আদতে তিনি নিজেও তো ছিলেন সেই শ্রেণির প্রতিনিধি। যে কারণে হয়তো তাঁর গানের কথা, গান বাছাইও ছিল ওই নিরিখে। কিন্তু গানগুলো দারুণভাবে ছিল সময়োপযোগী।
default-image

প্রথমে গানের কথায় চোখ ফেরানো যাক। সঞ্জীব নিজে যেমন গান লিখেছেন, গেয়েছেন অন্যের লেখাও। তাঁর গাওয়া গানের বড় অংশই গান লেখার প্রথাগত ব্যাকরণ মেনে সৃষ্টি হয়নি, রচনাধারার দিক দিয়ে এগুলো বরং কবিতার সঙ্গেই বেশি মেলে। এ ছাড়া অতি অবশ্যই গানের ছদ্মবেশে রচিত সেসব কবিতায় উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে সময়, সমকাল এবং মধ্যবিত্ত তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা ও মনস্তত্ত্ব। টুকরো কথায় সেই মনস্তত্ত্বের ময়নাতদন্ত করলে বলতে হবে এটি এক অদ্ভুত মনোবাস্তবতা: এই তরুণেরা একই সঙ্গে প্রেমিক ও বিপ্লবী; হাঁসফাঁস বর্তমানে দাঁড়িয়ে এরা তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায় বটে, কিন্তু পেছনে থাকে শত দ্বিধা। এরা সংবেদনশীল, পরিবর্তনপ্রত্যাশী। একই সঙ্গে আত্ম-উন্নয়নকামিতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও শ্রেণি সচেতনতাও তাদের অন্তরে টনটনেভাবে প্রোথিত। সর্বোপরি রয়েছে বিপ্লব বেহাত হয়ে যাওয়ার অন্তর্গত হতাশা। এই অদ্ভুত বিন্যাসের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গোত্রের কণ্ঠে কণ্ঠেই সঞ্জীব মূলত গীত হতে থাকলেন (এখনো কি তা-ই নন?), প্রচারিত হতে থাকলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের জনসমাজের এই পলায়নবাদী বাস্তবতা বোধ করি বেশ ভালোভাবেই ধরেছিলেন সঞ্জীব। আদতে তিনি নিজেও তো ছিলেন সেই শ্রেণির প্রতিনিধি। যে কারণে হয়তো তাঁর গানের কথা, গান বাছাইও ছিল ওই নিরিখে। কিন্তু গানগুলো দারুণভাবে ছিল সময়োপযোগী।
এক্ষণে সঞ্জীবের গাওয়া কয়েকটি গানের প্রথম লাইন মনে করি চলুন : ‘এই নষ্ট শহরে নাম না জানা যে কোনো মাস্তান’, ‘গাড়ি চলে না চলে না’, ‘শাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে’, ‘সবুজ যখন বাঁধে বাসা’, ‘আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া সন্ধান করিয়া স্বপ্নের ওই পাখি ধরতে চাই’ ,‘এক নিমেষেই চলে গেল আহ কী যে তার মুখখানা রিকশা কেন আস্তে চলে না’, তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, ‘আমার বয়স হলো সাতাশ আমার সঙ্গে মিতা পাতাস’, ‘কেটে নেয়া মাথা, রক্তের ফোঁটা, পিরিচে দুচোখ নড়েচড়ে ওঠে’, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও’—চেনা এসব গানের পুরোটা মনে করলে একনজরে আমরা কী দেখতে পাই? দেখি যে সমকালের মধ্যবিত্তীয় আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে জুটি বেঁধে গানের মেলোডিতে ছুটে যাচ্ছে কাব্য তরঙ্গ, যার সঙ্গে মিলেমিশে আছে নাগরিকতা, দ্রোহ, মরমিবাদ, স্বপ্নভঙ্গ প্রভৃতি। আর সেই তরঙ্গের ভেতরে থাকা ছবি আমাদের হৃদয়কে আলতো করে নাড়াও দেয়। বলাবাহুল্য, নিজের গাওয়া প্রায় সব গানে কবিতা ও গীতির এক অপূর্ব নাড়াঘাঁটা করেছিলেন সঞ্জীব। একসময় আমাদের কবিতা ও গানের মধ্যে খানিক ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। একুশ শতকের আগমুহূর্তে যে কয়েকজন মানুষ কবিতা আর গানকে একই রাখীবন্ধনে বেঁধেছিলেন, তাদের মধ্য সঞ্জীব অগ্রগণ্যই থাকবেন।

এও বলা সংগত হবে যে নিজে কবি ছিলেন বলেই সরাসরি কবিদের আস্ত কবিতাকে সুরে বেঁধে গলায় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সেহেতু ফরহাদ মজহার, সাজ্জাদ শরিফ, আনিসুল হক, কামরুজ্জামান কামু, টোকন ঠাকুর, জাফর আহমদ রাশেদ প্রমুখের কবিতা অবিকৃতভাবে সহজেই গানের মহিমা পেয়ে যায় ওঁর গলায়। ফলে খোলা হাওয়ার মতো সঞ্জীবের গানও পেয়েছিল ভিন্নতর এক সঞ্জীবনী দ্যোতনা। অনেককাল এই দ্যোতনার স্বাদবঞ্চিত আমাদের মধ্যবিত্ত মন তাই একে আদর করতে একফোঁটাও কসুর করেনি।
এবার যদি দু-চার কথা তাঁর গায়কি নিয়ে বলতে হয়, পুনর্বার বলি, এখানেও ‘খোলা হাওয়া’ শব্দবন্ধটি বড্ড লাগসই হবে। দরাজ গলায়, এমনকি তাঁর গায়নে কোথাও কোথাও সিলেটের আঞ্চলিক টান ঢুকে পড়লেও, সেগুলো আমাদের কানকে পীড়িত করে না, বরং চিরাচরিত সংগীতের পরিপাট্য ও শুদ্ধবাদী ধারণা থেকে কিছুটা মুক্তির অবকাশ মেলায়।
এগুলো কি ঘটে ‘এই নষ্ট শহরে’ আমরা সবাই ‘নাম না জানা মাস্তান’ বলে? অনেক রাজা-উজির মেরে যখন আমরা একা হয়ে উঠি, নিজের সামনে দাঁড়াই, সে সময় হারিয়ে ফেলা অনুভূতির তল তো আমাদের খুঁজতে হয় সঞ্জীব চৌধুরীর গানেই। অতঃপর সেই গানে পলায়নবাদিতাসমেত নিজেকে আমরা দেখতেও পাই যে!

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন