সাজেদুল আউয়াল
সাজেদুল আউয়ালছবি: সংগৃহীত

করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের অনেকে বিখ্যাত এবং জাতীয় ব্যক্তিত্ব হলেও তাঁরা ছিলেন আমার ব্যক্তিগত নৈকট্য থেকে দূরবর্তী জগতের মানুষ। সেসব মৃত্যুর শোকও জাতীয়। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতর মহল পর্যন্ত করোনার সম্প্রসারিত থাবা আমাদের প্রতিনিয়ত বিমর্ষ করে তুলছে। মুঠোফোন থেকে প্রিয় মানুষের নাম ও নম্বর মুছে ফেলা যে কী ভীষণ কষ্ট ও বেদনার, সাজেদুল আউয়াল, আমার শামীম ভাইয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা আবারও টের পেলাম।

সাজেদুল আউয়ালের সঙ্গে প্রথম পরিচয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে নব্বই দশকের শেষ দিকে। তিনি এসেছিলেন সেলিম আল দীন স্যারের কাছে ‘ঋত্বিক কুমার ঘটকের চলচ্চিত্র: সমাজবাস্তবতা ও নির্মাণভাবনা’ বিষয়ে পিএইচডি করবেন বলে। সেলিম স্যার তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ‘ফণিমনসা’র নাট্যকার এবং ঢাকা থিয়েটারের কর্মী হিসেবে। আমি সেলিম স্যারের তত্ত্বাবধানে তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণার কাজ করছি। পরিচয়ের পর আমরা উভয়ে চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। দুজনের আলাপচারিতা এবং আন্তরিকতায় পূর্ণ নামের সাজেদুল আউয়ালের আড়াল থেকে বের হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শামীম ভাই। গবেষণার কাজে শামীম ভাইয়ের বাসায় গিয়েছি, লাইব্রেরি ব্যবহার করেছি এবং দুপুরে ভাবির রান্না খাবারও খেয়েছি। আমার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ এবং বাংলা একাডেমি থেকে ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: আর্থসামাজিক পটভূমি’ বইয়ে লিখেছিলাম, ‘চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী ও ঋত্বিক কুমার ঘটকের ওপর গবেষণামূলক কাজের জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন জনাব সাজেদুল আউয়াল। এ গ্রন্থ প্রণয়নকালে তাঁর লাইব্রেরি ব্যবহার আমার জন্য ছিল উন্মুক্ত। অধিকন্তু, তাঁর সঙ্গে গ্রন্থটির বিভিন্ন অধ্যায়ের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে সমৃদ্ধ হয়েছি। ঋণ স্বীকার করছি সস্ত্রীক সাজেদুল আউয়ালের কাছে।’ শামীম ভাইয়ের সঙ্গে সখ্য আরও গভীর হয় ২০০৮ সাল থেকে, যখন ফিল্ম আর্কাইভের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল’ পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। জার্নালটিকে মানসম্মত গবেষণা পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে শামীম ভাইয়ের অবদান অনেক। লেখা যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা ও মনোযোগ জার্নালটির প্রথম সংখ্যা থেকেই দেখেছি। ২০০৮ থেকে শুরু করে ২০২০ পর্যন্ত শামীম ভাই পত্রিকাটির সম্পাদনা পর্ষদের সদস্য এবং নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্পাদনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে অন্যান্যের মতো বেশ কটি সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত  থাকার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল। এ সময় শামীম ভাইয়ের চলচ্চিত্রচিন্তার সঙ্গেও নিবিড় নৈকট্য তৈরি হয়েছিল। ২০০৯ সালে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চলচ্চিত্রবিষয়ক একাধিক গবেষকের পিএইচডি সেমিনারে আলোচক হিসেবে তিনি আমাদের আমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ আলোচনায় অনেকে গবেষকই উপকৃত হয়েছেন।

মুঠোফোন থেকে প্রিয় মানুষের নাম ও নম্বর মুছে ফেলা যে কী ভীষণ কষ্ট ও বেদনার, সাজেদুল আউয়াল, আমার শামীম ভাইয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা আবারও টের পেলাম।
বিজ্ঞাপন

সাজেদুল আউয়াল সৃষ্টিশীল লেখক, ঢাকা থিয়েটারের কর্মী, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক, নিষ্ঠাবান চলচ্চিত্র গবেষক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯৯৯ সালে বৌদ্ধ জীবনদর্শনের ওপর তিনি নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নির্ভানা’। তাঁর নির্মিত ভিন্ন মেজাজের চলচ্চিত্র ‘ছিটকিনি’ ২০১৭ সালে মুক্তি লাভ করে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সরকারি অনুদানের জন্য ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ নামের একটি চিত্রনাট্য জমা দিয়েছেন তিনি। হায় অদৃষ্ট, করোনার এই অতিমারি তাঁকে মৃত্যুঞ্জয়ী হতে দিল না, আফসোস! শামীম ভাই বেশি ছবি তৈরি না করলেও চলচ্চিত্রভাবনা এবং গবেষণায় ছিলেন চলচ্চিত্রেরই ভেতর মহলের মানুষ। চলচ্চিত্র গবেষণার একেবারে খুঁটিনাটি বিষয়কেও তিনি যৌক্তিক অনুষঙ্গের বাইরে বিবেচনা করতেন না।
সাজেদুল আউয়ালের জন্ম ১৯৫৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম বলেই তিতাস নদের প্রতি তাঁর গভীর এক টান ছিল। সেই টান মানবিক আবেগের। সেই আবেগের মথিত প্রকাশ আমরা তাঁর সৃষ্টিশীলতায় খুঁজে পাই। তিতাসপারের মালো সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে রচনা করেছিলেন ‘ফণিমনসা’ নাটক। রচনা করেছেন গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘তিতাসপারের মানুষ ও তাঁদের গান’। এ ছাড়া, দক্ষিণবঙ্গীয় উপকূলে পঞ্চদশ শতকে পর্তুগিজ জলদস্যুদের হামলার ঘটনা উপজীব্য করে রচনা করেছেন উপাখ্যান ‘রাঙামিলার পাঙ্খাবিবি’। বিখ্যাত নাট্যকার ওলে সোয়েংকার ‘দ্য সোয়াম্প ডুয়েলার্স’ নাটকটি ‘অ্যালুমাকুরিকথা’ নামে তিনি অনুবাদ করেছিলেন তরুণ বয়সে। তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে ‘ঋত্বিকমঙ্গল’, ‘তিতাসপুরাণ’, ‘চলচ্চিত্রচর্যা’, ‘নাট্যচর্যা’, ‘চলচ্চিত্রতত্ত্ব’ প্রভৃতি অন্যতম।

ঋত্বিক কুমার ঘটকের চলচ্চিত্র সম্পর্কে শামীম ভাই একধরনের মুগ্ধতা অনুভব করতেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণের পর ঋত্বিক সম্পর্কে তিনি যারপরনাই আপ্লুত হন। ব্যক্তিগত জীবনে সাজেদুল আউয়াল তিতাস ও তার তীরবর্তী জনপদের মানুষের প্রতি ছিলেন গভীর অনুরক্ত। অনুরক্ত ছিলেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস এবং একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রতিও। ব্যক্তিগত জীবনে এক পুত্রসন্তানের জনক তিনি। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের অনন্তর নামে নাম রেখেছেন একমাত্র পুত্রসন্তানটিরও। একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় গর্বভরে এবং অকপট দৃঢ়তার সঙ্গে এ কথা তিনি বলতেন। বলতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে তাঁর নিবিড় নৈকট্যের প্রসঙ্গেও। তিতাস-অন্তঃপ্রাণ এই মানুষ ঢাকায় বসবাস করেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে চাইতেন। কোনো উপায় বা উসিলায় তিতাসের পারে যেতে পারলে তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন।
তিতাস-অন্তঃপ্রাণ শামীম ভাইয়ের আত্মা প্রবহমান তিতাসের পারে পারে পুলকিত আনন্দে বিচরণ করুক।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন