default-image

এবার ফেব্রুয়ারির শুরুতেই একুশে গ্রন্থমেলার সঙ্গে উদ্বোধন হলো বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’। উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর সঙ্গে মঞ্চে আরও ছিলেন জার্মানির গবেষক হান্স হার্ডার, ফরাসি লেখক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, বেলজিয়ামের সাহিত্যিক ফাদার দ্যতিয়েন ও ভারতের ভাষাবিদ পবিত্র সরকার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও ভাষণের কথা স্মরণ করেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানান, একাডেমির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সাহিত্য সম্মেলন। চার দশক আগে একাডেমি যে বড় আকারের সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছিল, তাতে ভারতসহ ছয়টি দেশের লেখক-প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন। এবারের সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া, ইকুয়েডরের প্রায় ৪০ জন কবি-লেখক অংশ নিচ্ছেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন হান্স হার্ডার, ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, ফাদার দ্যতিয়েন ও পবিত্র সরকার। এ সময় হান্স, ফ্রাঁস ও দ্যতিয়েনের বাংলায় কথার জাদুতে মুগ্ধ হন সবাই। 
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনের শুরু ২ ফেব্রুয়ারি সকালে। একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে প্রথম অধিবেশনে ‘এই সময়ের সাহিত্য’ শীর্ষক সম্মেলনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। ‘সাহিত্য সত্যকে ধারণ করে। মানবীয় অভিজ্ঞতায় জীবনকে উত্তীর্ণ করার যে পন্থা সাহিত্য নির্দেশ করে—এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আমরা তার রূপরেখার সন্ধান পেতে পারি।’—সৈয়দ হকের এমন বক্তব্যের পর সমসময়ের কথাসাহিত্য নিয়ে দিনব্যাপী অধিবেশনের প্রথম পর্বে আলোচনায় অংশ নেন ভারতীয় কথাশিল্পী নবনীতা দেবসেন, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও দিলীপ সিনহা। কথাসাহিত্যবিষয়ক বিধিবদ্ধ আলোচনার বাইরে নবনীতা দেবসেনের তীক্ষ্ণ বক্তব্য স্পর্শ করে সবাইকে।
বেলা ১১টায় ‘সমকালীন কথাসাহিত্য’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সাহিত্যের লিখিত রীতির পাশাপাশি মৌখিক কথকতার রূপরীতিকে আমাদের কথাসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য আঙ্গিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে সেলিনা হোসেন আলাপচারিতায় মিলিত হন দুপুর ১২টায়। আলাপনে উঠে আসে শীর্ষেন্দুর জীবন ও সাহিত্যের নানা কথকতা। এ সময় নিজের ঘুণপোকা উপন্যাস রচনার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শীর্ষেন্দু স্বীকার করেন, কবি হতে না পারার ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসই হয়তো তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে এত বিপুল গদ্যসাহিত্য।
কলকাতা বইমেলায় ফিরে যাওয়ার তাগাদায় পশ্চিমবঙ্গের কবি শ্রীজাত বেলা তিনটায় কথাসাহিত্যকেন্দ্রিক চতুর্থ অধিবেশনের শুরুতেই পাঠ করেন নিজের গোটা তিনেক কবিতা। বাংলাদেশ-ভারত সব জায়গায় আগুনময় সময়ের নামে পঠিত তাঁর কবিতার শব্দছন্দে অন্য রকম আবেশ ছড়িয়ে যায় মিলনায়তনজুড়ে। পরে কথাশিল্পী মঞ্জু ইসলাম ও কাজী আনিস আহমেদের সঙ্গে কথোপকথনে যুক্ত হন নিয়াজ জামান।
বিকেলে ছিল কথাসাহিত্য থেকে পাঠ ও আলোচনা। গল্প পড়েন পূরবী বসু, আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাকির তালুকদার, ইমানুল হক। গল্পের বদলে কবি-কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক শ্রোতাদের শোনান কবিতা।
৩ ফেব্রুয়ারি ‘এই সময়ের সাহিত্য: কবিতা’ শিরোনামে দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে শুরুতে কবিতা বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মুহম্মদ নূরুল হুদা। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ইকুয়েডরের সাহিত্যিক মারিয়া হেলেন বারেরা, সুইজারল্যান্ডের নাট্যকার তবিয়াস বিয়ানকনে, বেলজিয়ামের কবি জার্মান ড্রুগেনব্রুট, হান্স হার্ডার, ভোজপুরি কবি চন্দ্রভূষণ, সালাহউদ্দীন আইয়ুব। কবিতা পাঠ করেন সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ ও হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতি ছিলেন আসাদ চৌধুরী। এই দিন দুপুরের মূল আকর্ষণ ছিল সমকালীন মালয়েশীয় নবীন-প্রবীণ কবিদের কবিতা পরিবেশনা। এ সময় কবিতা নিয়ে কথা বলেন মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট কবি দাতু ড. আহমেদ কামাল আবদুল্লাহ কামেলা।
এরপর দুপুরে কবিতাপাঠে যোগ দেন বিভিন্ন দেশের কবি—সিন্ডি লিন ব্রাউন, পিটার নাইবার্গ, জামি ঝু, সুবোধ সরকার, বীথি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। শেষ পর্বে কবিতা পড়েন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজন্মের প্রায় ৩০ জন কবি।
৪ ফেব্রুয়ারির অধিবেশন শুরু হয় ‘এই সময়ের সাহিত্য: নাটক’ শীর্ষক পর্বের মাধ্যমে। এখানে প্রবন্ধ পাঠ করেন রামেন্দু মজুমদার। বাংলা ও বিশ্বনাটক বিষয়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সুইজারল্যান্ডের তবিয়াস বিয়ানকনে, ভারতের নাট্যব্যক্তিত্ব অশোক মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, মামুনুর রশীদ, সৈয়দ জামিল আহমেদ, আবদুস সেলিম, সামিনা লুৎফা। বিকেলে শুরু হয় বাংলাদেশের দশটি নাটকের নির্বাচিত অংশের প্রদর্শনী।
চার দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনের সমাপন ঘটে ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়। বক্তব্য দেন ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, হান্স হার্ডার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও সৈয়দ শামসুল হক। ফ্রাঁসের কণ্ঠেই যেন ধ্বনিত হয় সম্মেলনের মূল সাফল্য, ‘এ সম্মেলনে এসে, বইমেলায় বইয়ের জন্য এত মানুষের আগ্রহ দেখে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার নতুন উপলব্ধি জন্ম নিয়েছে। আমি বারবার ফিরে ফিরে আসতে চাই এই বাংলাদেশে।’ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির সভাপতি আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এই সম্মেলনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে জোর দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক সাহিত্যের বর্তমান পরিস্থিতিও উঠে এসেছে।’
এবারের আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের মুখ্য আকর্ষণ হান্স হার্ডার, ফাদার দ্যতিয়েন, ফ্রাঁস ভট্টাচার্য—এঁরা সবাই বঙ্গবিদ্যাচর্চার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। বাংলা-ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস-পরিসর নিয়ে হান্স হার্ডারের গবেষণা, বাংলা গদ্য বিষয়ে ফাদার দ্যতিয়েনের ভিন্নধর্মী চর্চা কিংবা আনিসুজ্জামানের সঙ্গে যুগ্মভাগে ফ্রাঁস ভট্টাচার্যের ফরাসি-বাংলা অভিধানকর্মের সূত্রে বাংলাদেশের লেখক গবেষক-পাঠকদের কাছে তাঁরা এমনিতেই পরিচিত ও প্রিয় নাম। তাঁদের একত্র উপস্থিতি সম্মেলনের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। সেই সঙ্গে প্রবন্ধ উপস্থাপনের চেয়ে সৃজনশীল সাহিত্যের উপস্থাপনার অংশ আগত সবাইকে সহজেই যুক্ত করেছে ‘এই সময়ের সাহিত্য’ ধারণার সঙ্গে। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন সৃষ্টি করেছে বিপুল আগ্রহ ও উদ্দীপনা।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন