বইমেলার মাসে বাংলা একাডেমির আয়োজনে সম্প্রতি শেষ হলো ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’। চার দিনের এই সাহিত্য আয়োজনে আড্ডা, তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠেছিলেন দেশ-বিদেশের লেখক-সাহিত্যিকেরা। এ নিয়ে আয়োজন

ফাদার পল দ্যতিয়েন বে​লজিয়ামের নাগরিক কিন্তু লেখেন বাংলায়। অনুপম বাংলা গদ্যে পাঠককে অভিভূত করে রেখেছেন দীর্ঘদিন। সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। সাক্ষাৎ​কার নিয়েছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

default-image

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: ঢাকায় এবারের একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবলীল বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছেন আপনি বলতেই হয়, বাংলা ভাষা আপনি ভালোই রপ্ত করেছেন প্রথমেই বলুন ভারতবর্ষে কবে এলেন; কীভাবে এতদঞ্চলের মানুষের সঙ্গে স্থাপিত হলো আপনার যোগসূত্র?
পল দ্যতিয়েন: আমি স্বাধীন ভারতে পদার্পণ করি ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে। শ্রীরামপুরের বাসন্তী গ্রাম। বাঘ আসত। সেখান থেকে কিছু বাংলা শেখা হলো। একসময় আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো শান্তিনিকেতন। আমার ভালো লাগেনি। জায়গাটা চমৎকার, মানুষগুলো খুবই ভালো। কিন্তু সাহিত্য শেখাতে পারে না। সাহিত্য কে শেখাতে পারে নিজ থেকে যদি না আসে? তারা শেখায় সাহিত্যের ইতিহাস। ইতিহাস দিয়ে আমি কি করব বলুন? পড়তে পড়তে আর ভালো লাগছিল না, তখন আমার খেয়াল হলো, নিজ থেকে লিখব। নিজ থেকে লিখেছি, কাউকে না দেখিয়ে, কারও পরামর্শ না নিয়ে। আপনি আমাকে তো চেনেন না। হা হা। লিখেছি ‘সাহেবের ডায়েরি ছেঁড়া পাতা’। তারপর সোজা দেশপত্রিকায় পাঠিয়েছি।

ফয়জুল: সেটা ১৯৫৯ সাল তখন তো দেশ-এর সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ
দ্যতিয়েন: সম্পাদকের নাম আমি জানতামই না। দুদিন পর সম্পাদক মহাশয় ডাকে একটা কার্ড পাঠিয়েছেন, লিখেছেন, ‘ইউ হ্যাভ ওপেনড্ আ নিউ ভিসতা ইন বেঙ্গলি লিটারেচার।’—আমি আমার এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের নতুন দিগন্ত খুলেছি। হা হা হা; কী আশ্চর্য! তারপর প্রত্যেক সপ্তাহে লিখেছি। প্রায় টানা দেড়-দুই বছর লিখেছি। সেগুলো পুস্তক আকারে বেরিয়েছে। আর সঙ্গে সঙ্গে আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরস্কার পেয়েছি—নরসিংহ দাস পুরস্কার, ডায়েরিরছেঁড়া পাতা—১৯৭১-৭২-এর সেরা বইয়ের জন্য।

ফয়জুল: বাংলা ভাষার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের গোড়াপত্তন কীভাবে হয়েছিল, এ নিয়ে যদি একটু বলেন...
দ্যতিয়েন: এ দেশে আসার আগে আমি তো সংস্কৃত পড়ছিলাম; নামুরে। সংস্কৃত পড়তে পড়তে একদিন আমাদের লাইব্রেরিতে একখানা বই আবিষ্কার করেছিলাম—অ্যান্ডারসন্স অ্যাপ্লিকা, যেটা বাংলা ব্যাকরণ, রোমান অক্ষরে লিখিত। উদ্ধৃতিও কিছু কিছু ছিল: রবীন্দ্রনাথের দু-একটা গান, নৌকাডুবিছিল, ছিল সঞ্চয়িতাথেকেও। মাইকেলের কিছু কিছু উদ্ধৃতি ছিল। আমি পড়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল। তারপর এই দেশে আসা। আর কিছু কিছু আন্দাজ করেছিলাম বাংলা ভাষার বিষয়ে। খারাপ লেগেছিল রবীন্দ্রনাথের মধ্যে, আবার শরৎচন্দ্রের লেখার মধ্যেও—মেজদিদি-তে ইংরেজি শব্দ বেমানান হয়ে বসেছিল। আমি ভাবলাম, কেন কেন? আমি তো তৎসম শব্দ খুব পছন্দ করি। যা হোক, তারপর আমি তো এই দেশে এসেছি মিশনারি হয়ে। শ্রীরামপুরে ছিলাম এক বছর। ওখানে আমার বাংলায় লেখাপড়া হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল অবনীন্দ্রনাথের শকুন্তলা; তারপর সৈয়দ মুজতবা আলীর চাচা কাহিনী; তারপর রাজশেখর বসুর গড্ডালিকা; পরশুরাম ছদ্মনামে লেখা। এভাবে পড়তে পড়তে বাংলা সাহিত্যের ভেতর ঢুকে গিয়েছি।

ফয়জুল: আমরা এবার আপনার বই গদ্য পরম্পরা প্রসঙ্গে একটু জিজ্ঞেস করিওই গদ্য সংকলনে সেই মৃত্যুঞ্জয় তর্কালংকার থেকে আধুনিক জামানা পর্যন্ত বহুজনের গদ্যের নমুনা সংকলন করেছেন আপনি সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের মা আনোয়ারা বেগমের লেখার উদ্ধৃতিও আছে কেন আগ্রহী হলেন এই সংকলন প্রণয়নে?

দ্যতিয়েন: এর একটা ইতিহাস আছে। আমি তো থাকতাম শ্যামাপুকুরে। তার কাছাকাছি ছিল ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’। একদিন এক লেখক আমার কাছে এসে নালিশ করে, ‘দাদা, আপনি যা–ই লেখেন আমরা সব পড়ি। আপনারা আমাদের কিচ্ছু পড়েন না।’ আমি বললাম, ‘ঠিক কইছো।’ ভাবলাম প্রতিশোধ নেব; যত আছে সব পড়ব। তারপর থেকে আমি প্রতিদিন যেতাম বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের লাইব্রেরিতে। যত পরলোকগত গদ্যলেখক তাঁদের একটা পাতা পড়ব বলে। ১৮০০ থেকে ১৯৭৭। প্রায় ৫০০ পাতাজুড়ে নিজের হাতে লিখেছি। শেষ পর্যন্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে দেখিয়েছি। ও আমার লেখার খুব প্রশংসা করেছিল। সুনীতি আর সুকুমার(সুকুমার সেন) আমাকে খুব ভালোবাসত। পরে আমি খুঁজতে খুঁজতে কেরি সাহেবের ইতিহাসমালা খুঁজে পেয়েছি। সবাই জানত বইটা আছে, কিন্তু জীবনে দেখেনি। বইটা মুদ্রিত হয়েছে, প্রকাশিত হয়নি; কারণ, এই বইয়ের ১৫০ গল্পেরমধ্যে দু-একটা গল্প আছে অশ্লীল। আমি এক কপি না, তিনটি কপি পেয়েছি। উইপোকা সব খেয়েছে, আমি পুনরুদ্ধার করেছি। সুকুমার সেন ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে। আর উৎসর্গ করেছে ফাদার দ্যতিয়েনকে, যিনি ১০৭ বছর পর আবিষ্কার করেছেন এই ইতিহাসমালা

ফয়জুল: প্রমথ চৌধুরীর গদ্য সম্পর্কে আপনার কী ধারণা তাঁকে আধুনিক বাংলা গদ্যের পথিকৃৎ বলা হয়

দ্যতিয়েন: ওর বউয়ের সঙ্গে আমার খুব আলাপ ছিল। ইন্দিরাদেবীর কাছে মাঝেমধ্যে যেতাম। ইন্দিরাদেবী ফরাসি ভাষা বেশ শিখেছিল। প্রমথ চৌধুরী আমার ভালো লাগে কিন্তু প্রভাবিত তো হইনি। আমার লেখার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নেই। লোকে জিজ্ঞাসা করলে আমি বলি, অবনীন্দ্রনাথেরশকুন্তলায় ছন্দ আছে—পছন্দ করি।

ফয়জুল: তৎসম শব্দের মধ্যে ছন্দটা একটু বেশি, নয় কি?

দ্যতিয়েন: হ্যাঁ তো; ঠিক তাই। আমাকে একজন বলেছে, আমার ভাষা নাকি সংস্কৃত ঘেঁষা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক বলেছে কি না, জানি না। তবে তৎসম শব্দ দিয়ে লিখতে ভালোবাসি। অবনীন্দ্রনাথের শকুন্তলা পছন্দ করি, ছন্দ আছে।

ফয়জুল: এই অঞ্চল ছেড়ে আপনি চলে গেলেন সত্তরের দিকে তারপর তিন যুগ কেটে গেছে কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশ, কলকাতা, এবং বাংলা ভাষার?

দ্যতিয়েন: আশ্চর্য, আশ্চর্য, উন্নতির দিকে যাচ্ছে কিন্তু আমার কাছে তো ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগে না। মেয়েরা শাড়ি পরত, এখন তো পরে না কাজ করে বলে। মেয়েরা স্বামীর নাম ধরে ডাকত না। আমার তো ভালো লাগত অন্যরকম। এখন সব সমান হয়ে যাচ্ছে। ওদের সুবিধা, আমাদের তো...হা হা হা। তবে জাতপাত উঠে যাচ্ছে, মুসলমান-খ্রিষ্টানদের উন্নতি হচ্ছে, এটা খুব ভালো লাগে।

ফয়জুল: এখনো লিখছেন দেশ পত্রিকায়, আনন্দবাজার-এ লিখছেন এবং পড়াতেও হয় আপনাকে আপনি কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেন ভাষার মধ্যে?

দ্যতিয়েন: জঘন্য, জঘন্য, জঘন্য। যত উপন্যাস যত ছোটগল্প সব ইংরেজি শব্দ, ইংরেজি বাক্য, ইংরেজি প্যারাগ্রাফ বাংলা অক্ষরে লিখিত—আমি আর পড়ি না। এটা খুব খারাপ লাগে। দোআঁশলা। এখনকার মানুষেরা নিজেদের ভাষাকে রক্ষা করছে না। অধোগতি হচ্ছে। দেখুন দেখুন, আমার মতো ভাষা ভালোবাসে কয়জন আছে? কষ্ট করে মেপে মেপে শব্দ সাজিয়ে এক একটা বাক্য লিখেছি। প্রত্যেক শব্দকে প্রশ্ন করেছি, কী তোমার অধিকার আছে এখানে থাকার? যদি না থাকে কেটে দিই।‘পার্থক্য’ ‘প্রভেদ’, একই অর্থ। একটার ওপেন সিলেবল্, আরেকটার ক্লোজড্। ছন্দের প্রয়োজনে কখনো ‘পার্থক্য’ কখনো ‘প্রভেদ’ শব্দ ব্যবহার করেছি।

ফয়জুল: তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, গদ্যের মধ্যেও একটা সুর বা ধ্বনি আছে; লেখককে অত্যন্ত সতর্কভাবে শব্দচয়ন করতে হবে

দ্যতিয়েন: আমি বলি সাহিত্য মানেই ছন্দ—গদ্য ছন্দ। ইতিহাসের বই লিখলে উৎকৃষ্ট বই হবে; বোধ হয় সাহিত্যের বই হবে না। সাহিত্য হবে তখন, যখন এর ভেতরে গান থাকবে। আমার লেখা নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে একদিন আলাপ হয়েছিল। আমি তাকে বললাম, আমার কানে ভালো লাগে। কিন্তু পাঠকের কানে কেমন লাগবে? তিনি বললেন, তোমার কানকে বিশ্বাস করো। সে জন্য ভাষার ভেতরে আমি ঢুকতে পেরেছি। লোকে বলে ‘দরদি গদ্য’আমার পাঠকের চেয়ে পাঠিকার সংখ্যা বেশি (হাসি)। আমি এটাই বুঝেছিলাম যে দেশপত্রিকায় লেখা পড়ে স্ত্রী স্বামীকে বলে, ওগো শুনছ, ‘তোমার সাহেবের লেখা এসেছে। তোমার সাহেব কী লিখেছে।’—ও তো পড়বে না। কিন্তু বউ হয়তো পড়বে।

ফয়জুল: শেষ দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করি সেদিন বাংলা একাডেমির মঞ্চে একটু রবীন্দ্রসংগীত গাইলেন আপনি রবীন্দ্রসংগীত আপনি কি শোনেন মাঝেমধ্যে?

দ্যতিয়েন: রবি ঠাকুরের এমন গান আছে যে মন কেমন হয়ে যায়। ‘আগুনের পরশমণি’সহ আরও কিছু গান শুনলে আমার যা হয়—ভালো লাগে। আমার সব থেকে প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’। আমি বলে রেখেছি আমার শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে যেন ওই গানটি গাওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন