বৃহস্পতিবার। আধবেলা স্কুল। ছুটি হয়েছে দুটোয়, বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময়। আমাদের বৈঠকখানার সামনে তখন বিভিন্ন বয়সী মানুষের জটলা। ছোট হওয়ার কারণে অন্যদের পায়ের ফাঁক গলিয়ে সামনের দিকে যেতে অসুবিধা হলো না। দেখি, একটা লোক ধুলোতে থেবড়িয়ে বসে; চটের বস্তা শরীরে জড়ানো। সিনেমায় দেখা বুড়ো চীনাদের মতো দাড়ি। জটপাকানো চুল। স্মরণকালে হয়তো চুল কাটেনি, ধোয়ওনি। বয়স অমরত্ব প্রাপ্তির পর বৃদ্ধ হতে হতে কোনো একটা পর্যায়ে আটকে গেল যেমন দেখানোর কথা। তখনো কিছু বুঝে উঠতে পারিনি; খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম লোকটিকে। পায়ের কাছে একটা থলে পড়ে। তলাটা ছেঁড়া, কিছু যে থাকবে না, বোঝা যাচ্ছে। ব্যাগের এক কোনা শক্ত করে ধরে রেখেছে, সে জন্যই কি না ব্যাগটি ধরে টানাটানি করছে টোটন মামা। লোকটি বেশিক্ষণ টিকতে পারল না, টোটন মামা এক টানে কেড়ে নিয়ে ফেলে দিল দূরে। ফেলবেই যখন, নেওয়ার কী দরকার? এই সামান্য প্রশ্নটুকু করার মতো মানুষ সেখানে ছিল না। সকলে মজা দেখছে দাঁড়িয়ে। কত দিন পর যেন তারা কিছু দেখে মজা পাচ্ছে! আগে গ্রামে যাত্রাপালা হতো, অশ্লীলতার অভিযোগে এখন আর হয় না। বড় ভাইদের মুখে স্কুলমাঠে সার্কাস হওয়ার গল্প শুনেছি। সেটিও বন্ধ হয়েছে চিরকালের মতো। যে সার্কাস আমরা কোনোদিন দেখিনি, সে সার্কাসের কথা ভেবে খালি মাঠের দিকে তাকিয়ে শিহরিত হয়েছি বহুদিন। গ্রামের মানুষের মজা করার যে গল্প শুনেছি এত দিন, আজ দেখছি স্বচক্ষে।

ফকির হলি হতি পারে। ফজু চাচা বলে।

আশপাশের দশ গাঁয়ি দেকিছি বুলি মনে হচ্ছি না। পেছন থেকে হাফি চাচার কণ্ঠ শুনি।

আজ শুক্কুরবার না। তা ছাড়া ফকির হলি ভিক্ষি তুলার ঝুলা থাকতুক। এভাবে পড়ি না থেকি বাড়ি বাড়ি যাতুক। মবু ভাই ভুল বলেনি। এখানে শুক্রবার ফকির আসে। অন্য দিনগুলোতেও দু–একজন আসে। এলাকার ফকিরদের নামসহ আমাদের চেনা। কিন্তু এই লোককে কেউ চিনতে পারে না। আব্বার মতো পুরোনো মানুষও যখন ‘কখনো দেখেনি’ বলে ঘোষণা দিল, অন্যরা আর কী বলবে!

এই বুইড়া, তোর নাম কী? কুতা থেকি এইচির? কুউন গাঁতে বাস? একিনে চাস কী? কেমুন করি আসলি? শোয়েব ভাই হাতের কঞ্চি দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে প্রশ্নগুলো একটার পিঠে আরেকটা করে যায়।

মুখ দি’ টুঁ শব্দটাও বের করতি পারলাম না; আর তুই খবরের লোকদের মতোন সাক্ষাৎকার নিতি চাচ্ছিস! শোয়েব ভাইকে উদ্দেশ করে আমাদের অঙ্কের মাস্টার বিলু স্যার বলে।

কঞ্চির খোঁচাতে হাত ও পিঠে ছিলে গেছে। বৃদ্ধ নিশ্চুপ। পুরাতন গাছের মতো তাকিয়ে থাকে মাটির দিকে। নিজের মতো আনমনে কী যেন আঁকাআঁকি করে ধুলোয়। কিছু একটা বোঝা যায়, তো পরমুহূর্তেই অন্য একটা দাগ টেনে গুলিয়ে ফেলে।

কেউ আসতি দেকিছে?

কে দেকিছে পয়লা?

হেঁটি এসিছে? না কিছুতে চড়ি?

একটার পর একটা প্রশ্ন আসতে থাকে। আসরের আজান হয়ে যায়। কেউ কেউ নামাজও পড়ে আসে। এক মানুষ যায়, নতুন মানুষ আসে, জটলা একটিবারের জন্যও হালকা হয় না। লোকজন একবার করে খোঁচা দেয়, সরে দাঁড়ায়। খুব কাছে কেউ যায় না। অচেনা কুকুর নিয়ে খেললে আমরা এমন নিরাপদ দূরত্ব রেখে দিই। পাড়ার মোড়ের বুড়ো সজনে গাছ থেকে আমরা যে রকম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঠা বের করি, গাছটি নড়েও না, চড়েও না, এই অচেনা বৃদ্ধও সে রকম প্রাণ থেকেও জড়ের মতো পড়ে থাকে। গাছের মতো একটি বারও নিজে থেকে প্রাণের প্রমাণ দিতে যায় না। এক দল হতাশ হয়, অন্য দল নতুন উদ্যম নিয়ে শুরু করে। একটা পরিপূর্ণ শব্দ ওর মুখ থেকে যে বের করতে পারবে, সে যেন গ্রামে বীরের মর্যাদা পাবে!

আমরা যখন একঘেয়ে দৃশ্যে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম, তখনই আমাদের মধ্য থেকে বোমাটা ফাটাল কেউ।

স্পাই! দেখোগে ভারতের স্পাই। বোবা-পাগলের ছদ্মবেশে তথ্য নি’ পালাচ্ছি। কেউ একজন বলল ভিড়ের ভেতর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে জনতা চাঙা হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। মুহূর্তে সকলে যেন নিশ্চিত হয়ে গেল, লোকটি স্পাই ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। গ্রামের পশ্চিমে খাড়া মাইল ছয়েক হাঁটলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। আমাদের গোপন কোনো তথ্য নিয়ে সীমান্ত দিয়ে পালাচ্ছে বলে আমরা ধরে নিলাম।

স্পাইদের নিয়ে গ্রামে অনেক গল্পের প্রচলন ছিল। একটা গল্পের কথা তখনই মনে পড়ল। এরা এমন কৌশলী ও নিবেদিত দেশপ্রেমিক হয় যে, কোনো দেশে স্পাইগিরি করতে গিয়ে বিয়ে-সংসার পর্যন্ত করে। তারপর মিশন শেষ হলে বিনা বাক্যে স্ত্রী-সন্তান ছেড়ে স্বদেশে ফিরে যায়। এমনভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যে তাদের এই ছদ্মবেশ ধরাও যায় না।

আমাদের ভেতর থেকে কেউ কেউ এরই মধ্যে পরীক্ষা করতে শুরু করেছে। প্রথমেই একজন কঞ্চির মাথায় চুলগুলো পেঁচিয়ে টান মারল জোরে। নকল চুল হলে উঠে আসত। কিন্তু মাত্র কয়েকটা চুল ছিঁড়ে এল। বৃদ্ধের গায়ের রং আসল কি না, মুখে মেকআপ দেওয়া কি না, পরীক্ষা করার জন্য হাবু ভাই পেছনের গর্ত থেকে এক বালতি ঘোলা পানি তুলে ওর মাথায় ঢেলে দিল। গায়ের রং যেমন ছিল, তেমনই থাকল। মাঝখান থেকে সকলের সন্দেহটা থেকে গেল।

কাপড়–চোপড় খুলি দেখা দরকার কুনো কাগজপত্র বা চিরকুট আছে কি না? হাফিজুল ভাই বলে। লোকজন তার কথায় উৎসাহ পায়। কাপড়–চোপড় বলতে তেলচিটচিটে চটের বস্তা। তা–ও শরীরের সামান্য অংশ ঢাকা। সেটুকুই খোলার জন্য কয়েকজন এমনিতেই সুযোগ খুঁজছিল; এতক্ষণে তারা জনসম্মতি পেয়ে গেল। নারীরা আড়ালে দাঁড়াল। চটের বস্তাটা শরীর থেকে আলাদা করতে কষ্ট হলো না। হাত লাগাতে হয়নি। লাঠির মাথা দিয়ে টানাটানি করতে করতে কিছুটা ছিঁড়ে, কিছুটা খসে শরীরটা আলগা হয়ে গেল। আমরা চারপাশ থেকে ঘুরেফিরে দেখলাম। কাগজের ছিটেফোঁটাও নেই। কিন্তু আমাদের মধ্যে একজন এমন একটা বিষয় আবিষ্কার করল যে তাতে বৃদ্ধের হিন্দুস্তানি স্পাই পরিচয় নিয়ে কারও ভেতর আর কোনো সন্দেহ থাকল না। হিন্দু হলে ভারতীয় স্পাই হবে, এ রকম একটা প্রশ্নহীন বিশ্বাস বাতাসে কে বা কারা যেন কবে ভাসিয়ে দিয়েছে, আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে তা শরীরে মিশে গেছে।

যেহেতু কোনো সন্দেহ থাকল না, লোকজন মোটামুটি নিশ্চিত হলো যে, কাগজ বা চিরকুট নিশ্চয় ছিল সঙ্গে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যা করা উচিৎ, তাই করেছে, খেয়ে ফেলেছে। পেটটা চিরে দেখা সম্ভব হলে পাওয়া যেত। কিন্তু ততদূর করা সম্ভব নয়। কারও কারও মনে ইচ্ছা থাকলেও¯স্রেফ অনভ্যস্ততার কারণেই লোকটির পেট কেউ চেরার কথা ভাবতে যায় না। লোকজন চাইলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে। পেট চেরার চেয়ে গণধোলাই অনেক সহজ বিষয়। কিন্তু তাতে সে যে তথ্য নিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো জানা যাবে না।

থানায় দিই। পুলিশের হাতে পড়লি পিটি সব তথ্য বের করি নেবে। একজন বলে।

সেই ভালো। একটা খবর হলি দেশের মানুষ জানবি আমাদের ওপর হিন্দুদের স্পাইগিরির ব্যাপারটা। মেরি ফেলা ঠিক হবে না। অন্য একজন বলে। ততক্ষণে দিনের আলো নিভে গেছে। অন্ধকারে অনেকের মধ্যে কে কখন কথা বলছে, ঠিকমতো বোঝা যায় না। সিদ্ধান্ত যখন এক রকম চূড়ান্ত হয়ে এসেছে, তখনই মা এল।

যা করার সকালে করিস। তুরা একুন যা। সারা দিন কিছু খায়নি; খাবে। পাড়ার লোকজন মাকে ভয় পেত, না সমীহ করত জানি না, মা বলাতে মৃদু প্রতিবাদ উঠলেও সেটা দানা বাঁধতে পারল না। সকালে মার কাছ থেকে বুঝে নেবে এমন শর্তে লোকজন যে যার মতো সরে গেল অন্ধকারে। দু–তিনজন মিলে ধরে লোকটিকে বৈঠকখানার ভেতরে তোলা হলো। খাইয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে রাখা হবে। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমিও এলাম ভাত আর তরকারি নিয়ে। হারিকেনের আলোয় মা একটা থালে ভাত, পাশে দুটো বাটিতে আলাদা আলাদা করে তরকারি দিল। মাছ আর ডাল। বৃদ্ধ একবার নড়ে, হালকা বাতাসে গাছের পাতা নড়ার মতন। হারিকেনের আলোয় মায়ের দিকে তাকিয়ে প্লেটের ভাত নাড়তে থাকে। মা নিজে ডালের বাটিটা ঢেলে মাছটা দিতে গেলে ইশারা করে বারণ করল।

জিজ্ঞাসা করো তো কোথা থেকে এসেছে? মাকে বললাম। মনে হচ্ছিল মা এখন কিছু জানতে চাইলে বলবে। কিন্তু মা কোনো প্রশ্ন করল না। পাশে বসে থেকে খাওয়াল। খাওয়া শেষ হলে আমাকে নিয়ে বের হয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। যে দুয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিল, তারাও আমাদের দেখাদেখি সরে গেল।

সেদিন শুতে গেলাম চাপা উত্তেজনা নিয়ে। থানায় খবর চলে গেছে। সকালে পুলিশ আসবে। শুক্রবার, স্কুল নেই। থাকলেও যেতাম না। এমন ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ জীবনে দুবার আসে কি না সন্দেহ। আমার ধারণা গ্রামের প্রত্যেকে সেদিন উত্তেজনায় শান্তি করে ঘুমাতে পারেনি। আমার ঘুমটা এল বেশ দেরিতে, ভোররাতের দিকে। তাই উঠতে পারলাম না সময়মতো। বাইরে হইচই না হলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ ঘুমাতাম। তাড়াতাড়ি উঠে এসে দেখি অস্থিরভাবে লোকজন ছুটোছুটি করছে। লোকটিকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাইরে থেকে
তালা আটকানো আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে সে নেই। এক গ্লাস পানি রাখা হয়েছিল, খালি গ্লাস পড়ে আছে। মা একবাক্যে বলে দিয়েছে,Ñলোকজনের ছুমুতে ভেতরে রেখি তালা দি’
শুইছি। একুন কীভাবে কী হলু, আমি কী জানি!

ততক্ষণে আশপাশের গ্রামে, সীমান্তের দিকে লোকজন চলে গেছে খুঁজতে। একজন এ–ও বলল, লোকটা মানুষ না, জিন। অন্য একজন প্রশ্ন করল, জিন হেঁদু হয় নাকি? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে কেউ এগিয়ে এল না। বিকেল পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান পাওয়া গেল না। আমি নিজে অন্যদের সঙ্গে মাঠের আখ আর গ্যামাক্ষেতের ভেতর লাঠি দিয়ে বাড়িয়ে বাড়িয়ে খুঁজেছি। একটা লোক কীভাবে এল, কীভাবে গেল, কেউ কিছু বলতে পারে না। রাতে মনখারাপ করে শুতে গেলাম। গা ছমছম করছিল, মনে হচ্ছিল লোকটি যায়নি, আশপাশেই আছে। পাশের ঘর থেকে মা–বাবার চাপা কণ্ঠে কথা কাটাকাটির শব্দ
আসে।

কাজটা ঠিক করলে না। বাবা বলে। 

তুমরা ঠিক করছিলে তো? স্পাই বলে পুলিশের হাতে তুলে দিতে বাঁধছিল না? মা প্রশ্ন করে।

স্পাই কি না সেটা পুলিশ দেখতুক। বাবার উত্তর। 

তাই বুলি সব জেনিবুঝি?

এত বছর পর এসিছে কেনে?

এটা ওর দেশ। বাড়ি। জন্মভিটি। আসতিই পারে।

বুললিই তো হলু না। বাড়িঘর জমি-জায়গা আর তার আছে নাকি?

ছেলেমেয়েসহ বউকে ঘরের মধ্যি আটকি পুড়ি মারলু পাকিস্তানিরা। দেশ স্বাধীন হলি একা মানুষটাকে পাগল বানি’ দেশছাড়া করলি তুমরা। একুন আবার স্পাই বুলি পুলিশের হাতে তুলি দিতি যাচ্ছিলে, আর কত অবিচার করবা মানুষটার ওপর? মা এবার চড়া কণ্ঠে বলে।

আস্তে। ছেলিমেয়িরা শুনি ফেলবি। বাবা ধমকের সুরে থামিয়ে দেয়। বাড়িজুড়ে প্রাচীন নিস্তব্ধতা নেমে আসে মুহূর্তেই।

চোখ বন্ধ করে টের পাই, কেউ একজন সিঁথির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তার গরম নিঃশ্বাসে বাতাসটা ভারি হয়ে উঠছে। আমি বলতে গিয়ে পারি না, আমি সব জানি। বাবার ছায়া পড়ে আমার শরীরে। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0