আবুল হাসনাতের ছবি অবলম্বনে
আবুল হাসনাতের ছবি অবলম্বনে কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

প্রথম রুমে কম্পিউটারে আতাউর, পাশের টেবিলে লেখক সৌভিক রেজা, যত দূর মনে পড়ে। ভেতরের রুমে যাঁরা বসেন, তাঁরা ইন্টারভিউ নেবেন। আস্তে করে দরজা ঠেলে দিতেই ড. হায়াৎ মামুদের সহাস্য আমন্ত্রণ, ‘আরে, আসো দিকি!’ তিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক, মুখ চিনি। বাকিজনকে এই প্রথম দেখলাম, আগে নাম শুনেছি মাত্র। চেহারা গম্ভীর, ঘাবড়ে যাওয়া টাইপ, চশমার ভেতরে শান্ত-উজ্জ্বল বড় বড় চোখ দুটো টেবিলের ওপাশ থেকে কৌতূহলী। তিনি ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য পাতার খ্যাতনামা সম্পাদক আবুল হাসনাত, আমাদের হাসনাত ভাই! তখনো জানি না এই মানুষটি মাহমুদ আল জামান নামে নিয়মিত লেখালেখি করেন। পরে অবশ্য হায়াৎ স্যারের মুখে শুনেছি। গণসাহায্য সংস্থার পত্রিকাটিতে তখন আরও চাকরি করতেন জি এইচ হাবীব ও সৌভিক রেজা। হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার যতটুকু স্মৃতি, তা এই ‘প্রণোদনা’ পত্রিকার অফিসটি ঘিরেই, মাত্র বছর দুয়েকের।

বিজ্ঞাপন

পত্রিকাটির নামধাম-নিবন্ধন প্রভৃতি নিয়ে কথা হচ্ছিল যখন, তখন জি এইচ হাবীবসহ আমরা ছিলাম মোট পাঁচজন, যদিও হাবীব ভাই যাই যাই করছিলেন। এর মধ্যেই দেখলাম হাসনাত ভাইয়ের ব্যাপারে সবারই কেমন একটা সমীহ, আমতা আমতাভাব! তিনি আসার আগে আগে অফিসের পরিবেশ বদলে যায়, টান টান গুছিয়ে সিরিয়াস হয়ে উঠছে সবাই। আর হাসনাত ভাই লাজুক ও গম্ভীরের মিশেল দেওয়া চেহারা নিয়ে খানিকটা তাড়াহুড়া পায়ে নিজের টেবিলে গিয়ে বসতেন। আদৌ কারও চোখের দিকে সরাসরি তাকাতেন না, তারপরও আমরা জানতাম, তিনি খুঁটিয়ে ঠিকই সব দেখে ফেলেছেন। তিনি এলেই সাদামাটা বাড়িটি একটি পত্রিকা অফিস হয়ে উঠত। হাসনাত ভাই তখনো ‘সংবাদ’-এ আছেন আর হায়াৎ স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। আমাদের মধ্যে সৌভিককে হাসনাত ভাই দারুণ পছন্দ করেন, শিল্পী রফি হক তখন যাওয়া-আসা শুরু করেছেন মাত্র। হাসনাত ভাই তাঁরও বিরাট ফ্যান। পরবর্তীকালে হাবীব ভাই ও সৌভিক চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে, আমাদের সঙ্গে নতুন এসে জোটে শাহীদ, বিশ্বজিৎ ও জুয়েল।

বিপুল আগ্রহ নিয়ে পত্রিকাটি শুরু করেন হাসনাত ভাই। তাঁর পরিচিত বৃত্তের সবাইকে লিখতে বললেন। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য পাতায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যাঁদের সব সময় জায়গা করে দিতে পারতেন না, তাঁদের জন্য ‘প্রণোদনা’ একটি ভালো সুযোগ হিসেবে দেখা দিল। অনেক ভালো ও উঁচুমানের একটি প্রকাশনা করতে হবে, এই চাপে তিনি নিজেও ভুগতেন, আমাদেরও রাখতেন।

default-image

ঠিক কী কারণে জানি না, শুরু থেকেই হাসনাত ভাইয়ের কঠিন পণ ছিল, ‘প্রণোদনা’র প্রিন্টার্স লাইনে তাঁর নাম থাকবে না। ফ. র. মাহমুদ হাসান, এনজিওটির প্রধান নির্বাহী এটা মেনে নিয়েছিলেন। হাসনাত ভাইকে রাজি করাতে তাঁর খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তিনি প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন, পত্রিকায় কে কে কাজ করবে এবং কী কী প্রকাশ হবে, সেসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন হাসনাত ভাই। হয়েছিলও তা-ই! রুমে ঢুকেই কাগজ-কলম নিয়ে বসে যেতেন পরের সংখ্যার পত্রিকার পাতা মেকআপ করতে। চেষ্টা করতেন যেন একঘেয়েমি না আসে মেকআপে! কী যে মনোযোগ, উৎসাহ আর আনন্দ নিয়ে কাজটি তিনি করতেন, তা ওই অবস্থায় তাঁকে না দেখলে বোঝা যাবে না। শিশুর সরলতায় তিনি একের পর এক কাগজ টেনে নিতেন আর কোন লেখা কোথায় কীভাবে যাবে, তা এঁকে চলতেন। একেকটা পাতার ডিজাইন করা হলে সেটি হাতে নিয়ে জানতে চাইতেন, ‘কী, বলেন তো, সুন্দর হয়েছে না!’ তারপর বোঝাতে শুরু করতেন কোনটার কী মানে। ভাবতাম, এই কি সেই মানুষটি, যাঁকে সবাই এত গুরুগম্ভীর বলে জানে, ভয় পায়!

হ্যাঁ, তিনি কথা কম বলতেন, বললেও মৃদু কণ্ঠস্বরে, হাসতেনও কম। তারপরও তাঁকে প্রচুর হাসতে, কৌতুক করতে দেখেছি। বিশেষ করে হায়াৎ স্যার, রফি হক বা সৌভিক যখন কাছাকাছি থাকতেন। তাঁরা যে কী কী নিয়ে ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলতেন, প্রায়ই ধরতে পারতাম না। অনেক দিনই এমন হয়েছে যে আমি রুমে ঢোকামাত্র সবার মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেছে, হাসনাত ভাই গম্ভীর হয়ে গেছেন। হায়াৎ স্যার যেখানে হো হো গলা ফাটাতেন, হাসনাত ভাই সেখানে মুখ টিপে অপরাধীর হাসি হাসতেন। কাজে ফাঁকিটাকি মারলে শাসন করতেন, ‘ইশ, অমুক লেখাটা এখনো আনতে পারলেন না, রফির কাছ থেকে ইলাসট্রেশনটা এখনো পাওয়া গেল না, কী যে করেন! পত্রিকাটির মান খারাপ হলে মানুষকে তো মুখ দেখানো যাবে না।’

বিজ্ঞাপন

লেখালেখির কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় হাসনাত ভাইকেও আগে থেকে চিনতাম না। তাঁর সম্পর্কে বাজারে যে মিথ চালু ছিল, তা-ও ছিল আমার অজানা। তাই প্রথম প্রথম বুঝে উঠতে পারিনি তাঁর সঙ্গে এত গম্ভীর হওয়ার কী আছে। কিন্তু আদৌতেই তাঁর মধ্যে ভয় পাওয়ার কিছুই খুঁজে পাইনি বলে শুরুতেই সহজ-সরল একটা কাজের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাঁর সঙ্গে। নানা রকম প্রশাসনিক কাজ করতে হতো আমাকে, পাশাপাশি হাসনাত ভাইয়ের সূত্র ধরে বড় বড় লেখকের লেখা জোগাড় করা ছিল অন্যতম একটা বড় দায়িত্ব। তাঁর হাত ধরে চিনে নিয়েছিলাম সংস্কৃতিজগতের বড় বড় মানুষজনকে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা, শিল্প-সংস্কৃতির জগৎ সম্পর্কে একেবারেই নবিশ আমাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে-লিখিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব হাসনাত ভাই নিজের হাতে তুলে নেন। একেকজন রথী-মহারথীর কাছে পাঠানোর আগে তিনি মুখে তাঁদের কাজের ধরন, গুরুত্ব, ব্যক্তিত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে আগাম ধারণা দিয়ে দিতেন, যাতে তাঁদের সামনে একেবারে আহাম্মক বনে না যেতে হয়। বিস্ময় নিয়ে দেখেছি, বড় বড় সব লেখক-সংস্কৃতিকর্মী কী অবলীলায় হাসনাত ভাইয়ের নামে নরম হয়ে পড়েন!

শহরের কোথায় কোন প্রদর্শনী কত দিন চলবে, তা ছিল তাঁর মুখস্থ। প্রদর্শনীগুলো দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহের অন্ত ছিল না, আমাদেরও সঙ্গে নিতেন। তাঁর সঙ্গেই অনেক বড় বড় চিত্রশিল্পীর বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার।

পত্রিকায় লেখার কনটেন্ট কম থাকলে, হাতে কোনো না কোনো একটা বিষয় ধরিয়ে দিয়ে আমাকে লিখতে বলতেন। বিরাট আলসেমি আর ফাঁকিবাজি করতাম সেই লেখা নিয়ে। ওই সময় তাঁকে রেগে যেতে দেখেছি। রেগে গেলে কালো মুখ লাল করে রাখতেন। চোখের দিকে তাকানো যেত না, মনে হতো এর চেয়ে ভূমিকম্প ভালো। রাগ করা মাত্র তাঁর মুখে দীর্ঘ কুলুপ বসে যেত। ভ্রুও খানিক কোঁচকাত, শিগগির রাগ ভাঙার কোনো লক্ষণ দেখা না গেলে অসহায় বোধ করতাম। অবশেষে দৌড়ে হায়াৎ স্যারের ডানার নিচে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো। এসব সময়ে হাসনাত ভাই হায়াৎ স্যারকে টিজ করতেন, ‘হায়াৎ, আপনার কারণে এরা বখে গেল!’ আবার কোনো লেখা ভালো লাগলে আড়ে আড়ে কৌতুকও করতেন হায়াৎ স্যারের মুখের দিকে চেয়ে, ‘হায়াৎ, মেয়েটার লেখার হাত ভালোই, তাই না।’ হায়াৎ স্যারও সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠতেন, ‘কিন্তু দেখো মা জননী, বানানটাও একটু ঠিক করে লিখো পাশাপাশি।’

হাসনাত ভাই সম্পর্কে বাজারে বেশ কিছু মিথ চালু ছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি অত্যন্ত খুঁতখুঁতে আর দরকারের বাইরে একটিও কথা বলতে নারাজ; সামনে গেলে অতি অবশ্যই মুখ সিরিয়াস করেই যেতে হবে, অত্যন্ত রাশভারী, মেপে কথা বলেন, আদর-আপ্যায়ন করেন না আর রুক্ষ আচরণ ইত্যাদি ইত্যাদি। এক শতে নিরানব্বইজনকে দেখেছি, হয়তো স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথা বলছিলেন নিজেরা নিজেরা, হাসনাত ভাই সেখানে এলেন তো পরিবেশ ভারী হয়ে গেল। এটা প্রথম প্রথম আমাকে বিরাট অবাক করত। আড়ালে তাঁকে নিয়ে ফিসফাস করতেন যাঁরা, তাঁরাই আবার সামনে গেলে ভয়ে ঢোঁক গিলতেন। কিন্তু ভয়টা কিসের, প্রথমে বোধগম্য হয়নি। পরে হয়তো খানিকটা বুঝতে পেরেছি। সবাই ভয় পেত হাসনাত ভাইয়ের লেখাবিষয়ক খুঁতখুঁতির। কত নামকরা লোকেরও লেখা যে রোল করে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন, তা তো চোখের সামনেই দেখেছি! সাহিত্য দুনিয়ায় সমাদর পেতে ‘সংবাদ’-এর পাতায় লেখা ছাপা হওয়া একটা বিরাট ব্যাপার, সেটাও তখন বুঝতে পারলাম। সেখানে তিনি বেজায় কট্টর ছিলেন বলে লোকজনের আফসোসের অন্ত ছিল না। অথচ এর পুরো উল্টো চেহারাটিও তো ছিল। হাসনাত ভাই যাঁদের ভালোবাসতেন, তাঁদের জন্য জান-অন্ত ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড় ও জোরালো সম্পর্ক রাখতেন। তাঁদের অনেক যেনতেন লেখাও তিনি অবলীলায়ই ছেপে দিতে বলতেন। কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ্যে প্রকাশে তাঁর ছিল বিরাট কুণ্ঠা! অনেক দিন এমন হয়েছে, তাঁর খুব প্রিয় পাত্র কেউ একজন অফিসে এলেন, কিন্তু সামনাসামনি হাসনাত ভাই তেমন কিছুই বললেন না। তবে তিনি চলে যাওয়ার পরপরই প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলছেন তাঁকে নিয়ে। হাসনাত ভাইকে তখন আর মেলাতে পারতাম না। মানুষ পছন্দের বেলায় হাসনাত ভাই ছিলেন স্পেকট্রামের দুই প্রান্তে। তিনি হয় কাউকে পছন্দ করতেন, নয় করতেন না!

যাঁরা তাঁকে ভালোবাসতেন, বেশিই ভালোবাসতেন। তবে তাঁরাও কেমন যেন ভালোবাসাটা চেপে রাখতেন। তাঁরাও ফিসফাস করতেন পরস্পর, কী জানি, মুড ভালো তো! অথচ হাসনাত ভাইয়ের মুড ভালোই থাকত বেশির ভাগ সময়। বাইরে কী এক শক্ত খোলস যে তিনি দিয়ে রাখতেন! সেটা ভেদ করে বাইরের কোনো ভালোবাসা ভেতরে বা তাঁর ভেতরের কোনো ভালোবাসা বাইরে আসত কি না, তা টের পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার! অনুভূতি চেপে রাখার ওস্তাদ হাসনাত ভাই কারও প্রতি একচিলতে হাসি দিলে তা খবর হওয়ার মতো বিষয়! জি এইচ হাবীব, সৌভিক রেজাদের দেখতাম মনে মনে রিহার্সাল দিয়ে, মুড মেপে তারপর হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে কথা শুরু করত। মনে পড়ে, কত দিন এডিট করা কাগজ হাতে নিয়ে আগে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে খানিক হেসে নিয়ে তারপর মুখ গম্ভীর করে হাসনাত ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। ঔপন্যাসিক নাসরীন জাহান তো একদিন বলেই বসলেন, ‘হাসনাত ভাইয়ের এক হাতের দূরত্বে যাওয়ার সাহস হয় কী করে তোমাদের! ’

হাসনাত ভাই লাজুক ছিলেন বলেই কিনা জানি না, তবে লক্ষ করেছি, তিনি সহসা কারও মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন না, খানিকটা অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। কখনো মাটির দিকে, হাতের কলমের দিকে অথবা পত্রিকার দিকে। আর তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি ছিল, কাজের কথাটুকু হওয়ার পরপরই তিনি টেলিফোন রেখে দেন খটাস করে। খটাস করে ফোন রেখে দেওয়ার ব্যাপারটি ছিল অভিনব! মাঝেমধ্যে এত জোরে ফোন রাখতেন যে চমকে উঠতাম কিন্তু ফোন রেখে দিয়ে তিনি মুখটাকে নিউট্রাল করে বসে থাকতেন। মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না তিনি খুশি নাকি বেজার হয়েছেন। অনেক দিন ভেবেছি, হায় হায়, ফোনের খটাস শব্দে ওপাশের মানুষটা না জানি কী ভাবল। কিন্তু হাসনাত ভাইয়ের চেহারা নির্বিকার। পরে দেখেছি, ফোনের খটাস নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামায়নি। বলত, ‘ওহ, হাসনাত ভাই ও রকমই। বাড়তি কথা তিনি পছন্দ করেন না।’

‘প্রণোদনা’য় আমরা যারা স্বল্প দিন কাজ করেছি, তারা একপ্রকার ভাগ্যবানও ছিলাম। শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কারও কারও কাছে হাসনাত ভাইও কখনো-সখনো সমানে একের পর এক কৌতুক করে যেতেন এবং হা হা করে ঘর ফাটিয়ে হাসতেন! টিপ্পনী কাটতেন আর ঠারে ঠারে আমাদের দিকে তাকাতেন! তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি আমরাও কম করিনি। তিনিও আমাদের নিয়ে কম হাসেননি। কথায় কথায় বলতেন, ‘কোনো অসুবিধা নাই।’ রেগে গেলেও বলতেন, বিপদে পড়লেও বলতেন, হাসির কিছু হলেও বলতেন, ভদ্রতাবশতও বলতেন। এই ‘কোনো অসুবিধা নাই’ নিয়ে আমরা আড়ালে কত না চিকন হাসি হেসেছি! পরে অবস্থা এমন হলো, হাসনাত ভাই বলার আগেই আমরা কেউ কেউ বলে উঠতাম, ‘কোনো অসুবিধা নাই।’

বিজ্ঞাপন

নিভৃতচারী হাসনাত ভাই যে এত এত মানুষকে আলোড়িত করে যাবেন, জীবিত হাসনাত ভাইকে দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে যে অজস্র লেখা ছাপা হচ্ছে। তার ভিড়ে ‘প্রণোদনা’র উল্লেখ চোখে পড়েনি। হয়তো পত্রিকাটির আয়ু কম ছিল অথবা হাসনাত ভাইয়ের নাম সেখানে ছিল না অথবা সাম্প্রতিক ‘কালি ও কলম’-এর দাপটে তাঁর এই অধ্যায়টি পাত্তা পায়নি তেমন।

হাসনাত ভাই লাজুক ছিলেন বলেই কিনা জানি না, তবে লক্ষ করেছি, তিনি সহসা কারও মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন না, খানিকটা অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। কখনো মাটির দিকে, হাতের কলমের দিকে অথবা পত্রিকার দিকে। আর তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি ছিল, কাজের কথাটুকু হওয়ার পরপরই তিনি টেলিফোন রেখে দেন খটাস করে। খটাস করে ফোন রেখে দেওয়ার ব্যাপারটি ছিল অভিনব! মাঝেমধ্যে এত জোরে ফোন রাখতেন যে চমকে উঠতাম কিন্তু ফোন রেখে দিয়ে তিনি মুখটাকে নিউট্রাল করে বসে থাকতেন। মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না তিনি খুশি নাকি বেজার হয়েছেন।

হাসনাত ভাইয়ের মায়াটা চোখে দেখার নয়, ওটা ছিল অনুভবের। ‘প্রণোদনা’ পত্রিকাটির দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। প্রথাগতভাবে, প্রিন্টার্স লাইনে তাঁর নাম থাকেনি, কিন্তু উদ্যোগটির সঙ্গে তিনি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন এবং এই পত্রিকাটিকে তিনি দেখেছিলেন ‘মাই বেবি’ হিসেবে। নিজের সন্তানকে পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে দিয়েছিলেন পুরোপুরি নিষ্ঠার সঙ্গে। নাম নয়, যশ নয়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। নিজেকে আড়ালে রেখেও নিজের মেধা ও দক্ষতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন আবুল হাসনাত। এখানেই সম্পাদক হিসেবে তিনি অনন্য। আবুল হাসনাতের জীবনের ‘প্রণোদনা’ উপাখ্যানটুকু আড়াল করে রাখলে কেবল তাঁর প্রতি অবিচারই করা হয় না, তাঁর দক্ষতাকে উপেক্ষাও করা হয়।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন