বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিয়ের দশ দিন পর, অন্য পুরুষদের যা হয়, আমারও তা-ই হতে থাকে। আমি চারপাশে খালি সুন্দরী মেয়ে দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে দু-একজনের সঙ্গে আমার নিশ্বাস ঘন হওয়ার সম্পর্ক সূচিত হয় (আপনারা অন্য কিছু ভাববেন না। নিশ্বাস ঘন হওয়ার সম্পর্ক মানে প্রেমের সম্পর্ক। একবার সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ে দেখুন না!)। এই ফেসবুকের যুগে সম্পর্কগুলো পরস্পর যুদ্ধ করে আমার চেষ্টায় অবশেষে একটাতে এসে থিতু হয়। আমার ফেসবুক-প্রেমিকার নাম নিশি। এবং যথারীতি আমি স্থান-কাল অনুযায়ী নিশিকে ডাকি নিশি মণি!

নিশি মণি আমার জীবনে এসেছে চিমনির উত্তাপের বিপরীতে হিমেল হাওয়া হয়ে। আমি বিশ্বাস করি, সব ঘরেই একটা করে চিমনি থাকে, আর সেটা থেকে নিজেকে বাঁচানোর প্রয়োজনে একটা করে হিমেল হাওয়াও রাখতে হয়। আর তাই নিশি মণিকে নিয়ে আমার কোনো অপরাধবোধ নেই। তবে লুকোচুরি আছে। ওটা থাকতেই হবে, যেহেতু সভ্যতা আর লুকোচুরি হাত ধরাধরি করে চলাচল করে।

কিছুদিন আগে সিমি আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে, ‘আমি এখন তৃষ্ণার্ত এক কাক। পানি আছে, কিন্তু কলসির একেবারে তলায়। নাগালের বাইরে। পাথর ভরে পানিটাকে যে ওপরে ওঠাব সে উপায় নেই। ঠোঁট গুটিয়ে নিই তাই। পাথরের আঘাতে যদি ফুটো হয়ে যায় কলসিটা! ভালোবাসা যদি ঝরে যায়! সর্বস্বান্ত হয়ে যাব হতভাগ্য এই আমি। তার চেয়ে বরং ওভাবেই থাক। অন্তত জানব, কিছু ভালোবাসা আছে ওখানে আমার জন্য। তোমার কাছে। সেটা জেনেই ভালো থাকব। সুখে থাকব।’

নিচে প্রশ্ন করেছে কার মেসেজ ছিল এটা?

এই কথাগুলো আমি কোথায় যেন পড়েছি। মনে পড়ছে না। কার মেসেজ ছিল! আমার বুকটা ধক করে উঠল। নিশি পাঠায়নি তো! না, নিশির সঙ্গে আমার এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি যে এমনটা লিখবে। তাহলে? আগের জন পাঠায়নি তো!

আমি হন্যে হয়ে মেসেঞ্জার স্ক্রল করতে লাগলাম। লাভ হলো না। কারণ মেয়েদের সঙ্গে করা সব চ্যাট আমি ডিলিট করে দিই। তবে সিমির স্মৃতিভ্রষ্ট রোগ হওয়ার পর থেকে এ কাজে আমার মধ্যে অবহেলা চলে আসে। আজ নির্ঘাৎ সেটার মাশুল গুনতে হবে।

সিমি এসে বলল, প্রশ্নের জবাব দিলে না যে?

ধুকপুকে বুক নিয়ে কাঁপা গলায় আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি এখন কিছুটা ভালো বোধ করছ?

সিমির চিকিৎসা চলছে। ওর ভুলে যাওয়া রোগ হয়েছে। এতে যে সুবিধাটা সবচেয়ে বেশি পেতে শুরু করেছি তা হচ্ছে, নিশির সঙ্গে আমি মোটামুটি বাধাহীন যোগাযোগ করতে পারছি। সিমিকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার ইচ্ছা আমার মোটেও ছিল না, কিন্তু যখন দেখলাম ও রান্নাবান্না করতেও ভুলে যাচ্ছে এবং যখন দেখলাম ডাক্তারের কাছে না নিয়ে যাওয়াটা পারিবারিক-সামাজিকভাবেও অপরাধ হয়ে যাচ্ছে, তখন আর কোনো উপায় খুঁজে পাইনি।

ডাক্তার যখন বললেন, এটা মানসিক সমস্যা, আমি মনে মনে খুশিই হলাম। ঘরে আধাপাগল বউ থাকলে লজ্জা না পেয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করাই যেতে পারে। আমি ডাক্তারের কাছে ভদ্রভাবে জানতে চাইলাম, এই রোগে কোনো ঝুঁকি নেই তো? পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? ডাক্তার বললেন, দুশ্চিন্তার কিছু নেই। চিকিৎসা চললে ভালো হয়ে যাবে।

প্রত্যাশিত উত্তর না পেয়ে আমার গলাটা শুকিয়ে গেল।

ডাক্তার বললেন, আপনি ওনাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করবেন।

দশ বছরের পুরোনো বউকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা...মাথা খারাপ!

সিমি আবার বলল, প্রশ্নের জবাব দিলে না যে? মুচকি মুচকি হাসছে সে।

আমি বাথরুমে গেলে আমার মেসেঞ্জার সে ঘেঁটে দেখে। নানা রকম প্রশ্ন করে। আবার ভুলে যায়। কিন্তু আজ ভুলছে না কেন? নিশ্চয়ই মারাত্মক কিছু দেখে ফেলেছে সে!

আমার মনে নানান দুই নম্বরি চিন্তা। নিশির কথা মনে পড়ছে। আগে যখন অনেকগুলো হিমেল হাওয়া একসঙ্গে এসেছিল, সেগুলোও মনে এসে ভিড় করছে। না জানি কে ফাঁস করেছে কাক আর কলসির গল্প! আরেকটা তিন নম্বরি চিন্তাও আছে—এটা তো সিমির সুস্থ হওয়ার লক্ষণ। ও সুস্থ হয়ে উঠলে আমার নিশির কী হবে!

সিমি বলল, তুমি এ রকম ঘামছ কেন? টেনশন কোরো না। তোমাকে আমি সন্দেহ করছি না। করিও না কখনো। আরে, এটা আমি পাঠিয়েছি। তোমাকে আমি মোট এগারোটা চিঠি লিখেছি, তোমার মনে নেই? তার একটাতে এই কথাগুলো ছিল।

ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল আমার।

সিমি বলল, তোমাকে দেখছি আমার রোগে ধরেছে। ভুলভুলাইয়া।

সিমি গোসলে যাওয়ার পর আমি এগারোটা চিঠি নিয়ে বসলাম। ওর গোসল সারতে কমসে কম পৌনে এক ঘণ্টা লাগবে। দশটা চিঠি পড়ে ফেলেছি। ওই কথাগুলো নেই।

এগারো নম্বরটাতেও নেই। আমার গলা শুকিয়ে এল।

হঠাৎ আমি আবিষ্কার করলাম, এক বিবাহিত গর্দভ তৃষ্ণার্ত কাকে পরিণত হয়ে ঠোঁট দুটো ফাঁক করে হাঁপাচ্ছে।

দুদিন পর সিমি বলল, তুমি কি বুঝতে পারছ, তুমি বিভ্রমে আক্রান্ত? তোমাকে নিয়ে আমি কী করি! কীভাবে বাঁচব আমি? চলো, ডাক্তারের কাছে চলো।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন