আমি হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে এক রিকশায় উঠে টিএসসি থেকে আজিমপুরে গিয়েছি। মনে রাখতে হবে, আমার বয়স তখন ২২। আমি ছাত্র এবং হুমায়ুন আজাদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে, কবি হিসেবে এবং লেখক হিসেবে আমার কাছে দূরের তারা। আমি ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ নামে তাঁর কবিতার বই মুখস্থ বলে দিতে পারি।

‘যদি মরে যাই কিছুই থাকবে না
এই মাটি যতই বান্ধব হোক কোনো দিন মনেও রাখবে না
পঁচিশ বছরে গদ্যে–পদ্যে যা কিছু রচনা
সবই মিথ্যে অনুশোচনা
শুধু রবে বলে এই মন
কলাভবনের তিনতলাজুড়ে একটি অন্ধ অন্যায় চুম্বন
কিংবা
আমার সমস্ত ঘুম কেড়ে নিয়ে একজন নিবিড় ঘুমুচ্ছে বগুড়ায়।’

হুমায়ুন আজাদ স্যারকে মোজাম্মেল বাবু রাজি করালেন দেশবন্ধু পত্রিকায় কলাম লিখতে। তিনি তাঁর সাহিত্যসুন্দর ভাষায় লিখতে লাগলেন অপরূপ সব কলাম: ‘সৎ মানুষেরা, ব্যর্থ মানুষেরা, আপনাদের আমি করুণা করি।’ আমি যা উদ্ধৃত করছি, সবই করছি স্মৃতি থেকে। কাজেই তাতে কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকবেই। কিন্তু তাঁর লেখা আমাকে কতটা গ্রস্ত করে রেখেছিল, এই মনে রাখা থেকেই তা আপনারা বুঝতে পারছেন।

ওই সময় তিনি লিখলেন বা বললেন, ‌শামসুর রাহমান জানেন না, কার সঙ্গে শয্যায় আর কার সঙ্গে পর্দায় যেতে হয়। তিনি যা করতেন, তাতেই বিতর্কের ঝড় উঠল। এই কথা নিয়েও উঠল। শামসুর রাহমান বিটিভিতে গিয়েছিলেন, আমজাদ হোসেন বা অন্য কেউ ওই অনুষ্ঠানে বলে ফেললেন, শাবানা হলেন এ কালের রোকেয়া। দেশের মানুষ খেপে গেল। তখন হুমায়ুন আজাদ এই বাণী দিলেন।

আমি পূর্বাভাস পত্রিকায় লিখি। হুমায়ুন আজাদও লেখেন। মোজাম্মেল বাবু বললেন, ‘স্যার, তসলিমা নাসরিন নারী নিয়ে লিখছেন, আপনিও লিখুন।’ হুমায়ুন আজাদ ‘নারী’ বইটা লেখার জন্য সবকিছু ত্যাগ করে বইপত্র নিয়ে গবেষণা করতে লেগে গেলেন। ‘নারী’ ধারাবাহিকভাবে পূর্বাভাস পত্রিকায় ছাপা হতে লাগল।

আমার প্রথম কবিতার বই ‘খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে’ (১৯৮৯) হুমায়ুন আজাদ স্যারকে দিলাম। তিনি পড়লেন। বললেন, তুমি আবুল হাসানের ভক্ত নাকি! আমি বললাম, জি। হুমায়ুন আজাদ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে পছন্দ করেছিলেন। তিনি ব্রাত্য রাইসুকে বলেছিলেন, আনিসুল হকের কবিতা তোমাদের সংকলনে রেখো। রাইসু পড়ে আমাকে সে কথা জানান।

হুমায়ুন আজাদ প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি করতেন। বইমেলায় একবার তরুণ লেখকেরা তাঁকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। আমি ছুটে গেলাম। (চলবে)

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন