বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নেড়েচেড়ে দেখলাম কয়েক পৃষ্ঠার পর নাম দেখা যাচ্ছে—‘আমি এবং আমরা’। বই বলতে আমি তখন বুঝি রূপকথার বই। ‘মিসরের রূপকথা’, ‘চীনের রূপকথা’, ‘জাপানের রূপকথা’—বইয়ের নাম হবে এমন।

‘আমি এবং আমরা’ কীভাবে বইয়ের নাম হতে পারে, আমার মাথায় ঢুকল না। জানি না কোন কারণে মেঝেতে বসেই বইটা পড়া শুরু করলাম। মেঝে থেকে শুরু হলো আমার সীমাহীন যাত্রা—হুমায়ূন-আবিষ্কার।

এরপর হুমায়ূন আহমেদকে কাছে পাওয়া সহজ হলো ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার পর। আমাদের লাইব্রেরিতে একটা বড় অংশজুড়ে ছিল হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, সুমন্ত আসলামদের বই। সপ্তাহে এক দিন, বেশির ভাগ সময়ই ফোর্থ পিরিয়ডে, আমাদের লাইব্রেরি ক্লাস থাকত৷ কোনো ক্লাসের জন্যই আমরা এতটা অপেক্ষা করতাম না, যতটা করতাম লাইব্রেরি ক্লাসের জন্য। ওই দিন ফোর্থ পিরিয়ডের বেল পড়ামাত্রই খাকি ইউনিফর্ম পরা ২৭-২৮টা মেয়ে ধুপধাপ দৌড়াদৌড়ি করে লাইব্রেরিতে যায়। এটা সিনিয়র অথবা জুনিয়র হওয়ার ওপর নির্ভর করে না, সব কালের সব বয়সের ক্যাডেটদেরই আমরা দৌড়াতে দেখেছি।

যখনই আমরা গুচ্ছবদ্ধভাবে কাউকে করিডর দিয়ে দৌড়াতে দেখতাম, বুঝতে কষ্ট হতো না এদের আজ লাইব্রেরি ক্লাস।
মনে প্রশ্ন আসতে পারে, দৌড়ায় কেন?

আজ থেকে ৯ বছর আগে, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। আমি তখন নাইনে পড়ি। সম্ভবত সেদিনই কিংবা তার আগের দিন ক্যাডেট কলেজ থেকে বাসায় ছুটিতে আসি। সেদিন বৃষ্টি ছিল। অবাক হয়ে শুনতে পাই লোকটা মারা গেছে। কী আশ্চর্য! যে লোকটা আমাকে অকারণে হাসিয়েছে, হাসতে হাসতে কাঁদতে বাধ্য করেছে, ভালোবাসতে শিখিয়েছে—সেই লোকটা মারা গেছে। এই সংবাদ বিশ্বাস করার ক্ষমতা সেই মুহূর্তে আমার ছিল না। বুকটা ক্রমাগত মোচড়াতে মোচড়াতে একসময় স্তব্ধ হয়ে যাই৷ কষ্টে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। এমন কষ্ট—যার সঙ্গে আমি তখনো পরিচিত নই। ফলে সেদিন, তার পরদিন, তার পরদিনও স্বাভাবিক হতে পারিনি আমি।

আমরা দৌড়াতাম। কারণ, লাইব্রেরিতে সব সময়ই ছিল আগে গেলে আগে পাবেন টাইপ অবস্থা। কয়েক মিনিট দেরি করে যাওয়ার ফলে কাঙ্ক্ষিত বই হারানোর সুযোগ ছিল অনেক বেশি। আমরা তো ওই এক দিনই বই ইস্যু করার সুযোগ পেতাম। রেজিস্ট্রি খাতায় তারিখ, বার লিখে স্বাক্ষর দিয়ে এবং বেশ দীর্ঘ সিরিয়ালের পর লাইব্রেরিয়ানের স্বাক্ষর নিয়ে বই ইস্যু করতাম। স্বাভাবিকভাবে সবাই চাইত নিজের পছন্দের লেখকের দিকে ঝুঁকতে। এক সপ্তাহের জন্য সেই বইটা নিজের হয়ে যেত। কেউ চাইলে অবশ্য পরের সপ্তাহেও একই বই ইস্যু করে বেশ কয়েক দিন নিজের কাছে রাখতে পারত।

বেশির ভাগ দৌড় পার্টির গন্তব্যস্থল ছিল হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল কর্নার। তাই আমাদের পরিশ্রমও ছিল বেশি। এই ইস্যু করা বই বেশির ভাগই পড়া হতো দুপুরে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে, যাকে ডাকা হয় ‘রেস্ট আওয়ার’ নামে।

একবার এমন এক রেস্ট আওয়ারে আমি পড়ে শেষ করি ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ উপন্যাস। সেদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। অঝোরে কাঁদছি আমি। প্রথমে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিঃশব্দে, এরপর বাথরুমে—শাওয়ার ছেড়ে। এখন আমার বইটির ভেতরের চরিত্র বা প্লট—কিছুই মনে নেই, মনে করতেও চাই না। আমার শুধু মনে আছে এক রেস্ট আওয়ারের কথা। বাইরে কড়কড়ে রোদ। জানালার পাশেই আমার বিছানা। আমি শুয়ে শুয়ে নিঃশব্দে কাঁদছি। কাঁদতে কাঁদতে আমার সাদা বালিশ ভিজে নীল হয়ে যাচ্ছে।

রেস্ট আওয়ার ছিল আমাদের ‘আউট বই’ পড়ার জন্য একমাত্র অফিশিয়াল সময়। অন্যান্য সময়ে বাধা দেওয়ার মতো কেউ না কেউ থাকলেও এই সময়ে আমরা মুক্ত ছিলাম। কিন্তু মাত্র ৪০-৫০ মিনিট দিয়ে কতটুকুই-বা হয়? বাকিটুকু আমরা পুষিয়ে নিতাম ক্লাস চলাকালে। ক্লাসে পেছনের ডেস্কে বসে বইয়ের ভেতর বই ঢুকিয়ে গল্পের বই পড়তাম। শিক্ষকের গতিবিধি নজরে রাখতে না পারলে কিংবা বইয়ের পাতায় বেশি মনোযোগ দিয়ে ফেললে ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল শতভাগ।

আমি প্রথম ধরা খাই কোন ক্লাসে, তা মনে নেই। তবে যে বইটি নিয়ে ধরা খাই, তার নাম ‘মধ্যাহ্ন’। ক্যাডেট কলেজের দৃষ্টিতে ক্লাস টাইমে অন্য বই পড়া অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। আমাদের ‘অন্যায়’ কর্মকাণ্ড রোধ করতে বিভিন্ন সময়ে ক্লাসের (আমরা বলি ‘ফর্ম’) আশপাশ দিয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল রাউন্ড দিতেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমরা সেটা আগেই টের পেতাম। অন্তত একজন টের পেলেও সেটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ক্লাসে সার্কুলেট হতো হিসহিস শব্দে, ‘ভিপি স্যার আসছে...সাবধান!’

প্রথম ধরা খাবার সময় আমার ডেস্ক ছিল পেছনের সারির আগের সারিতে, ক্লাসের ডান দিকে বড় জানালার পাশে। জানালার পাশ দিয়ে কখন যে ভিপি স্যার এসে দাঁড়িয়েছেন, দেখিনি। ‘মধ্যাহ্ন’ বইটা ছোঁ মেরে নিয়ে গেলেন। বিষণ্ণ মন নিয়ে সারা বেলা কাটিয়ে দিলাম৷

প্রায় সবাইকেই এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। দু-তিন সপ্তাহ অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে ঘোরাঘুরি এবং নানা গঞ্জনার পর সেসব বই মুক্তি পেত। এরপর অবশ্য আরও বহুবার, বহুবার ধরা পড়েছি। তবে প্রথমবারের মতো অনুভূতি হয়নি। প্রথম সবকিছুর স্মৃতি আসলে অত্যন্ত দামি৷ এরা সাধারণত পিছু ছাড়ে না। ক্রমাগত তাড়া করতে থাকে৷ যেমন আমাকে তাড়া করে ‘মধ্যাহ্ন’, কিংবা ‘আমি এবং আমরা’।
আজ থেকে ৯ বছর আগে, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। আমি তখন নাইনে পড়ি। সম্ভবত সেদিনই, কিংবা তার আগের দিন ক্যাডেট কলেজ থেকে বাসায় ছুটিতে আসি। সেদিন বৃষ্টি ছিল। অবাক হয়ে শুনতে পাই লোকটা মারা গেছে। কী আশ্চর্য! যে লোকটা আমাকে অকারণে হাসিয়েছে, হাসতে হাসতে কাঁদতে বাধ্য করেছে, ভালোবাসতে শিখিয়েছে—সেই লোকটা মারা গেছে। এই সংবাদ বিশ্বাস করার ক্ষমতা সেই মুহূর্তে আমার ছিল না। বুকটা ক্রমাগত মোচড়াতে মোচড়াতে একসময় স্তব্ধ হয়ে যাই৷ কষ্টে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এমন কষ্ট—যার সঙ্গে আমি তখনো পরিচিত নই। ফলে সেদিন, তার পরদিন, তার পরদিনও স্বাভাবিক হতে পারিনি আমি।

আমাদের বাসায় তখন দুটো রুম। আমি ঘুমাতাম মায়ের সঙ্গে। আমার ক্রমাগত চোখের পানি আর বিষণ্নতা দেখে আম্মা ভাবলেন আমি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় ভুগছি৷ প্রেমট্রেমজনিত। উঠেপড়ে লাগলেন রহস্য উদ্ধারের আশায়।
তিনি বেশ বিরক্ত হলেন, যখন জানতে পারলেন একজন লেখকের জন্য আমি বিরহযাপন করছি। তিনি কি আমার প্রেমিক? তাঁর জন্য আমি না খেয়ে বসে থাকব কেন? আমার কষ্ট মায়ের কাছে আদিখ্যেতা মনে হলো। কিন্তু তাঁকে কীভাবে বোঝাই, আমার কেন এমন লাগে?
আমি লেখক নই, তবু এই গল্পগুলো ঘুরেফিরে অনেক জায়গায় লিখেছি। ভবিষ্যতেও লিখব। এর চেয়ে বেশি কীই-বা করার আছে? মাথার ওপর ছাতার মতো স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কী করতে পারি?
নয়টা বছর কেটে গেল। আমি আর কিশোরী নেই, তেইশ বছরের তরুণী। লাইব্রেরি ক্লাসে দৌড়ানো সহপাঠীরা বড় হয়ে গেছে। কেউ বিয়ে করেছে, কেউ দেশের বাইরে থাকে। কিন্তু সেই বইগুলো রয়ে গেছে আগের মতো।
এখন তাদের পড়লে কিশোর বয়সের মতো বুকে মোচড় দেয় না ঠিকই, কিন্তু ভীষণ মায়া হয়। সরস চোখে তাকিয়ে থাকি ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘প্রিয়তমেষু' অথবা ‘নবনী’র দিকে।
কী অদ্ভুত ব্যাপার! এখনো চোখ ভেজে কেন? কষ্টগুলো মেঘের মতো ওড়ে না কেন?

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন