বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

তিনি হাঁটু মুড়ে চেয়ারে বসে, টেবিলের ওপর কাগজ রেখে লিখতে শুরু করলেন। সারা রাত লিখলেন। তিনি লেখা পাতাগুলো একের পর আমাকে দিচ্ছেন আর আমি সেগুলো পড়ছি। সেটা ছিল মিসির আলিকে নিয়ে তাঁর প্রথম লেখা। উপন্যাসটির ইলাস্ট্রেশন আমিই করেছিলাম।

সকালবেলা হ‌ুমায়ূন ভাইয়ের বাসা থেকে বেরিয়েছি। আমি আগে, পেছনে হ‌ুমায়ূন ভাই। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আমাকে ডাকলেন, মাসুক। দেখি হ‌ুমায়ূন ভাইয়ের হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট। টাকাটা মাটিতে পড়ে ছিল। তুলে নিয়ে আমাকে দেখাচ্ছেন।
আমি বললাম, ‘দেখেন, আপনার কী কপাল। আমি আপনার সামনে হাঁটছি। আর আপনি আমার পেছনে। অথচ টাকাটা আমি দেখলাম না। দেখলেন আপনি।’
হ‌ুমায়ূন ভাই বললেন, ‘একটা টোকাইকে এই টাকাটা দেব।’

আমরা হাঁটতে হাঁটতে নিউমার্কেটের ওভারব্রিজের কাছে এলাম। সিঁড়ি ভেঙে দুজন ওপরে উঠলাম। একটু এগোতেই এক ঘুমন্ত টোকাইকে পাওয়া গেল। ডেকে তোলা হলো। একটা ৫০০ টাকার নোট পেলে টোকাইয়ের চেহারাটা কেমন হয়, হ‌ুমায়ূন ভাই সেটা দেখলেন।

হ‌ুমায়ূন ভাই মেঝেতে বসে চেয়ারের ওপর কাগজ রেখে লিখতেন। মেঝেতে প্লেটে কিছু ভাত থাকত। সঙ্গে একটা কাঁচি। লেখা ভুল হলে কাগজটা কাঁচি দিয়ে কেটে ভাত দিয়ে জোড়া দিতেন। আমি একবার তাঁর এই অবস্থা দেখে একটা পোলি গাম কিনে দিয়ে আসি। কয়েক দিন পর হ‌ুমায়ূন ভাই গামটা নিয়ে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ অফিসে আসেন। আমাকে দেখামাত্রই বললেন, ‘ন্যাও মিয়া, তোমার গাম। এইটা দিয়া আমার কাম হয় না। আমার ভাতই ভালো।’

হ‌ুমায়ূন ভাই যখন লিখতে বসতেন, একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। চায়ের কাপে তিনি ঘন ঘন চুমুক দিতেন। ছোট ছোট অক্ষরে লিখে যেতেন। আর বিড়বিড় করে কথা বলতেন। হঠাৎ হয়তো লেখা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, লুঙ্গিটা কোমরের কাছে বাঁ হাত দিয়ে ধরে রেখেছন। হ‌ুমায়ূন ভাইয়ের মেয়ে নোভা বা শিলা—কেউ একজন বাবার কোমরের কাপড়টা লজ্জারাঙা মুখে ঠিক করে দিচ্ছেন।

default-image

চাঁদনি রাত হ‌ুমায়ূন ভাইয়ের খুব প্রিয় ছিল। চাঁদপুরে তখন ‘আগুনের পরশমণি’র শুটিং হচ্ছে। ‘অঙ্গীকার’ ভাস্কর্যের সামনে ছবির টাইটেল শট হবে। একটি দোতলা লঞ্চ ভাড়া করা হলো। ‘আগুনের পরশমণি’র পুরো ইউনিটসহ একদল গায়ক ও বাদক দল নিয়ে শুটিং হবে। চাঁদনি রাতে লঞ্চের ছাদে সারা রাত গান-বাজনা হলো, খাওয়াদাওয়া হলো। সকালে চাঁদপুর নেমে শুটিং শেষ করে আবার লঞ্চের ছাদে বসে গান গাইতে গাইতে ঢাকায় ফিরছি।

হ‌ুমায়ূন ভাই লঞ্চের ছাদ থেকে চাঁদ দেখার জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছেন। সেলিম চৌধুরী গাইছেন হাসন রাজার গান। আমি চোখ বুজলে এখনো এই দৃশ্য দেখতে পাই।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন