default-image

শহীদ কাদরী কবিতা লেখেন, তাতে খুশি হন মা আর বড় ভাই শাহেদ কাদরী। তিনি শামসুর রাহমানের পরিচিত খোকনকে বলেন, খোকন যেন শহীদ কাদরীর সঙ্গে শামসুর রাহমানের পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৫৪-৫৫ সালের কথা। শহীদের বয়স তখন ১০-১১।
১৯৫২ সালে শহীদ কাদরী কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। খোকন শামসুর রাহমানকে শহীদ কাদরীর নাম বলেছিলেন, শামসুর রাহমান একদিন আসতেও চেয়েছিলেন শহীদদের বাড়িতে। কিন্তু আসা হয়নি।
একদিন দুপুরবেলা শহীদ কাদরীর বাড়িতে এল বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকাটি। আর সেখানে ‘মনে মনে’ আর ‘তার শয্যার পাশে’ নামে দুটো কবিতা ছাপা হয়েছে শামসুর রাহমানের। সেটা মনে রাখলেন শহীদ কাদরী।
ক্লাস এইটে পড়ার সময় ‘জলকন্যার জন্য’ শিরোনামে একটা কবিতা পাঠিয়ে দিলেন স্পন্দন পত্রিকায়। ছাপাও হয় তা। সদরঘাটের কাছে খান মজলিশের পত্রপত্রিকার দোকানে শহীদ দেখলেন, এক লোক স্পন্দন খুলে তাঁরই কবিতা পড়ছেন।
শহীদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন লাগল কবিতা?’
‘কেন, আপনি লিখেছেন নাকি?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনার কথা আমাকে খোকন বলেছে।’
দুজনের দেখা হয়ে গেল, ইনিই যে শামসুর রাহমান, সেটা বুঝতে বাকি রইল না শহীদের। সদরঘাটের রিভারভিউ ক্যাফেতে বসলেন দুজন। চা-বিস্কুট খেতে খেতে কথাবার্তা চলল।
সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে খুব অন্তরঙ্গতা ছিল শহীদ কাদরীর। বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডার পর যে যাঁর বাড়ি ফিরে যেতেন তাঁরা। রাতের খাবার খেয়ে গভীর রাতে শহীদ চলে আসতেন সৈয়দ হকের বাড়িতে। সেখানে রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত চলত সাহিত্য আড্ডা। বিউটি বোর্ডিংটা শহীদই চিনিয়েছিলেন সৈয়দ হককে।
শামসুর রাহমানের আমন্ত্রণে ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’-এর আসরে গেলেন শহীদ। সেখানেই দেখা হলো আল মাহমুদের সঙ্গে। শহীদ কাদরী আল মাহমুদকে চেনেন না তখনো, মাহমুদের কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি নিয়েই (‘বিছানায় শরীর ঢেলে, জানালায় বৃষ্টির তীর মেরে’) রসিকতা করছিলেন তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে আল মাহমুদ বললেন, ‘চলুন, আমার ওখানে।’
নির্দ্বিধায় তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন শহীদ।
‘আপনি তো আমার কবিতা পছন্দ করেন না।’ যেতে যেতে মাহমুদ বললেন।
শহীদ বললেন, ‘আমি ঠাট্টা পছন্দ করি।’
সে রাতটা মাহমুদের ডেরায় কাটিয়ে দিলেন শহীদ।
এরপর এক রাতে আবার গেছেন তাঁর বাড়িতে। আল মাহমুদ তখন কবিতা নিয়ে ব্যস্ত।
‘কী করছ?’
‘কবিতা পত্রিকায় কবিতা পাঠাব!’
এর আগে শুধু শামসুর রাহমান আর সৈয়দ হকের কবিতা ছাপা হয়েছে কবিতা পত্রিকায়।
শহীদ কাদরীর বাড়িতে পরদিন সকালে এসেছিলেন শামসুর রাহমান। উত্তেজিত শহীদ বললেন, ‘আল মাহমুদ কবিতা পত্রিকায় কবিতা পাঠাচ্ছে!’
শামসুর বললেন, ‘আপনিও পাঠান!’
শহীদের হাতের লেখা ছিল খুবই বাজে, শামসুর রাহমানই কবিতা বেছে দিলেন, কবিতা কপি করে দিলেন, তাঁরই পরামর্শে লেখা হলো দুই লাইনের চিঠি, ‘কবিতার জন্য কবিতা পাঠালাম। প্রকাশিত হলে বাধিত হব।’ সময়টা ছিল ১৯৫৬ সাল।

কিছুদিন পরের ঘটনা। যেদিন ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়লেন শহীদ কাদরীর মা এবং বিকেলেই মারা গেলেন, সেদিনটি কাটল বিভীষিকার মতো। শহীদের তখন ১৪ বছর বয়স। নিকটাত্মীয়দের জন্য একদিন রেখে দেওয়া হলো লাশ, পরদিন বিকেলে কবর দেওয়া হলো। শহীদ লক্ষ করলেন, শামসুর রাহমানও এসেছেন।
এরপর বিকেলে বিউটি বোর্ডিংয়ে এসেছেন শহীদ কাদরী। টেবিলে মাথা রেখে কাঁদছিলেন। একটু পর এলেন শামসুর রাহমান, হাতে তাঁর কবিতা।
‘আপনার কবিতা ছাপা হয়েছে।’ বললেন রাহমান।
শহীদ কাদরীর শোকে মুহ্যমান বাড়িতে যখন ডাকপিয়ন এই কবিতা পত্রিকাটি দিতে এসেছিলেন, তখন শামসুর রাহমান সেটা রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছে, নইলে এত লোকের ভিড়ে তা হারিয়ে যেতে পারত।
কবিতা পত্রিকায় যদি লেখা ছাপা না হতো, তাহলে হয়তো শহীদ কাদরী কবিতা নিয়ে পড়ে থাকতেন না। কবিতা পত্রিকার একই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল আল মাহমুদের কবিতাও।
আর সে দিনটির কথা সৈয়দ হকের কবিতায় আছে এ রকম করে:
‘ভাঙা তোরণের নিচে
শহীদের কণ্ঠ
ফেরে, “আজ মা গেলেন।”’

সূত্র: ১. শহীদ কাদরীর সাক্ষাৎকার, ‘শুরু যেভাবে করেছিলাম, সেভাবে তো শেষ করতে পারলাম না’ সাক্ষাৎকার: সুমনা শারমীন, প্রথম আলো, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
২. তিন পয়সার জ্যোছনা: সৈয়দ শামসুল হক, প্রথমা প্রকাশন, এপ্রিল ২০১৭

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0