default-image

রুহুল আমিন তারেক ছাপাই মাধ্যমের ছবির জন্য ইতিমধ্যেই বেশ পরিচিত নাম। যদিও এটি তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। এখন পাঠকের প্রশ্ন থাকতে পারে, কেন তিনি এত পরিচিতি লাভ করছেন?

এর উত্তরে বোধহয় সবাই এক বাক্যে তাঁর কাঠখোদাই মাধ্যমের দক্ষতার দিকে নির্দেশ করবেন। ছাপাই মাধ্যমের ছবি শ্রম, সময় ও ব্যয়সাধ্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটি আরও ব্যয়বহুল হওয়ার কারণ, এ দেশে অতি স্বল্প সংস্করণে এটি ছাপা হয়। ফলে অপরাপর মাধ্যমের তুলনায় ছাপাই মাধ্যমের ছবির ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। যদিও এ মাধ্যমের উদ্ভব হয়েছিল স্বল্প মূল্যে জনসাধারণের কাছে ছবি পৌঁছানোর লক্ষ্যে। বাজার অনুকূল না হওয়ায় যাঁরা এই মাধ্যমে এখন কাজ করেন, তাঁরা এটি করেন নেহাতই মাধ্যমটির প্রতি তাঁদের একান্ত ভালোবাসা থেকে।

তারেকও এর ব্যতিক্রম নন, যা তাঁর ছবির সংস্করণসংখ্যা থেকেই অনুমেয়। তারেক উডকাট করেন একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায়, যা ‘ফোর প্লেট’ নামে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় কাজ করতে গেলে আলো-ছায়ার তারতম্য ধরার জন্য অনেক সূক্ষ্মভাবে প্লেট কাটতে হয়। লিথো, লিনোকাট, রিলিফ বা এচিং পদ্ধতি এর অনুপাতে অনেক সহজ ও ব্যয় অনুকূল। তার ওপরে তারেকের ঝোঁক একটু বড় আকারের ছবির দিকে, যা তাঁর কাছে আরও দীর্ঘ সময় দাবি করে। এই প্রদর্শনীর প্রধানতম কাজগুলো তাঁর বিগত পাঁচ বছরের পরিশ্রমের ফসল।

আগেই বলেছি, এটি তারেকের প্রথম একক প্রদর্শনী। যদিও ইতিমধ্যে তিনি অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কার। দলগত প্রদর্শনীতে আলোচিতও হয়েছেন। তবে তাঁর কাজের যে বিষয়টি সর্বাধিক আলোচিত হয়েছে, তা হলো তাঁর করণকৌশল। করণকৌশলটি কিন্তু তারেকের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়, এটি তিনি অর্জন করেছেন তাঁর অগ্রজ শিক্ষক আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে। ঢাকা চারুকলায় এটা একটা জনপ্রিয় মাধ্যমও বটে। তারপরও তারেক এমন কী বিশেষত্ব অর্জন করেছেন যে তিনি এক্ষেত্রে আলোচিত? 

সেই আলোচনায় গেলে আমরা লক্ষ করব, তারেক আনিসুজ্জামানের করণকৌশলকে আত্তীকরণ করেও এ ধারায় নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন। বিষয়টি বুঝতে তাঁর বর্তমান প্রদর্শনী আমাদের সাহায্য করবে। 

মাধ্যমগত দক্ষতাকে শিল্পীর কারুকর্মের ওস্তাদি হিসেবেই দেখা হয়, যদি না তাঁর ভাষা–দক্ষতা, অন্তর্নিহিত চিন্তা ও চিন্তনের বিষয়টি উদ্ভাবনের শক্তিতে সচল হয়ে হৃদয়গ্রাহী হয়ে উপস্থাপিত হয়। তারেকের কাজে তার অনুসন্ধান করার জন্য আমাদের সযত্নে দৃষ্টিপাত করতে হবে তাঁর চিন্তার গ্রন্থির সন্ধানে। তারেক নিজের চিন্তাকে প্রবাহিত করেছেন একটি ধ্রুপদি দর্শনের হাত ধরে। যে চিন্তা গ্রিক দর্শন থেকে সুফি, বাউল—সবাইকে প্রভাবিত তো করেছেই এমনকি আজও এই দর্শনের উপযোগিতা ও চর্চা বর্তমান রয়েছে। আর সে দর্শন হলো, আপন আয়নায় আপনাকে দেখা। এ কারণেই তারেকের চিত্রকর্মে একটা বড় অংশ দখল করে আছে তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি। আর এই আত্মপ্রতিকৃতিতে তারেক বাইরের চেনা অবয়ব থেকে স্বতন্ত্র। তাঁর ছবির আলো-ছায়ার রহস্য একটা ধ্যানমগ্নতা রচনা করে। এবং বলা দরকার, অধিকাংশ ছবির বর্ণবিন্যাসে একটা পুরাতন স্মৃতির বাতাবরণের আবহ লক্ষণীয়। তাঁর নারীরা মধ্যযুগের আবহে ধরা দেয় আমাদের দর্শকের সামনে।

আত্মপ্রতিকৃতিতে শিল্পী নানা কথা লিখেছেন বিভিন্ন বাউল ও দার্শনিকদের উদ্ধৃতি থেকে। ব্যবহার করেছেন নানান রেখা ও প্রতীক। এগুলো কখনো ইঙ্গিতবহ হলেও তারেকের ছবিতে গতি ও সময় স্থবির হয়ে থাকে বিচিত্রময় গতিময় ভঙ্গিতে, মনে হয়, মূর্তির স্থরিবতায় এরা স্থির। এ ছাড়াও তাঁর এই প্রদর্শনীতে আছে নিসর্গ, যা পেনসিল, কলম, রিলিফ বা মিশ্র মাধ্যমে আঁকা।

পরিশেষে দুটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা তারেকের চিন্তা ও রচনার জগৎ চিনতে আমাদের সহায়তা করবে বলে আশা রাখি। শিল্পকলার আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা শিল্পীর করণকৌশলের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক সময়ই তাঁর চিন্তার জগৎকে হারিয়ে ফেলি। ‘আলোর প্রত্যাশা’ শিরোনামের একটি লিথোগ্রাফ আছে প্রদর্শনীতে, এরই সঙ্গে আছে ‘আলতা সুন্দরী’ নামের কাজ। দর্শক যদি এই দুটি কাজ অপরাপর কাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তবে তারেকের চিন্তা ও ভাষার গঠন নিয়ে একটা চিত্র আঁকাতে পারবেন, আশা রাখি। গ্যালারি কায়ায় ৮০টি চিত্রকর্ম নিয়ে ৬ মার্চ থেকে শুরু হয়ে প্রদর্শনীটি চলেছে ১৭ মার্চ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0