default-image

বছর ঘুরে ১ নভেম্বর এলে শিল্পী মবিনুল আজিমের কথা আমাদের মনে হয়—আমরা, অর্থাৎ যাঁরা তাঁকে এক শক্তিমান শিল্পী হিসেবে জানি—এই দিনে অকালে যেহেতু তিনি চলে গিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১ নভেম্বর মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর স্মরণে অবশ্য কোনো অনুষ্ঠান হয় না, যেহেতু তাঁকে যাঁরা চিনতেন, তাঁদের অনেকেই আর বেঁচে নেই; তাঁর কাজ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাও সংখ্যায় কম। তবে এই গুণী শিল্পীকে ভুলে যাওয়াটা মোটেও উচিত নয়। তিনি—তাঁর অনেক পরিচিত সতীর্থের মতোই, আমাদের চিত্রকলার ১৯৪৮–পরবর্তী উত্থানপর্বে, বিশেষ করে এর আধুনিকতার রূপ অন্বেষণে, এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁকে বিস্মৃত হওয়ার পেছনে অন্য কারণটি তাঁর দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন। ঢাকার পরিবর্তে করাচিকে তিনি তাঁর কাজের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। করাচিতে তিনি বড় শিল্পী হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন, কিন্তু ঢাকায় তাঁর পরিচিতি ব্যাপক ছিল না। ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল, হয়তো ঢাকায় বসে ছবি আঁকলে তিনি মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে যেতেন। সেই সুযোগটা স্বাধীনতার পর তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন, ঢাকায় ফিরে তিনি নতুন করে শুরু করেছিলেন, কিন্তু মৃত্যু এসে তাতে ছেদ টানল। যেটুকু কাজ তিনি ঢাকায় বসে করেছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁর যাত্রা হতে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য। কাজ যে বেশি কিছু করেছেন, তা নয়, কিন্তু যা রেখে গেছেন, তা তাঁকে আমাদের শিল্প আন্দোলনের একজন পথিকৃতের মর্যাদা দিয়েছে।

প্রকৃতিকে আঁকতেন মবিনুল, মানুষকেও। কিন্তু অন্যদের থেকে ভিন্নভাবে। মানুষ, অবয়ব বা ফিগারের একটা আভাস আঁকতে পছন্দ করতেন তিনি, আদলটা সম্পূর্ণ আঁকার পরিবর্তে, যদিও তা-ও তিনি যথেষ্ট করেছেন। প্রকৃতি আঁকতে গিয়ে রংটাকে ব্যবহার করতেন প্রধান ভাষা হিসেবে, তারপর একটা আধা বা পুরোপুরি বিমূর্ত ফর্মে তাকে সাজাতেন। মবিনুলের মতো এত স্বচ্ছন্দ, ছন্দিত ও প্রাণময় রং ব্যবহার কম দেখা যায়। বিমূর্তের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর, ব্রাশের কারুকাজে বিমূর্তকে রহস্যময় করে তুলতেন, যেন ছবির একটু গভীরে উঁকি দিলে ছবির জীবনটা বোঝা যাবে। শেষ দিকে প্রকাশবাদী কিছু ছবি একেছেন রং এবং গাঢ়বদ্ধ ফর্মকে অবলম্বন করে, যা দেখলে বোঝা যায়, তিনি একটা মোড় ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, হয়তো অনিশ্চিত হয়ে আসা সময়টাকে একটু বাজিয়ে দেখার জন্য।

বিজ্ঞাপন
default-image

মবিনুলের যেসব ছবি করাচিতে বা অন্যত্র রয়ে গেছে, সেগুলো দেখা তো আর সম্ভব নয়। তবে তাঁর পরিবারের, বিশেষ করে তাঁর সহধর্মিণীর সংগ্রহে কিছু ফটোগ্রাফ আছে, কয়েকটি ছবিও আছে। সেগুলো দেখা হয়েছে। আরও কিছু ছবি কারও কারও ব্যক্তিগত মালিকানায় বা দু–এক গ্যালারিতে দেখেছি। আমার মনে হয়েছে, তাঁর ছবিগুলো প্রকাশে যত বলিষ্ঠ, মেজাজে তত উদার। একটা গভীরতার আহ্বান ছবিগুলোতে পাওয়া যায়। এমনকি তাঁর প্রকাশবাদী ছবিতেও। যেন তারা বলছে, সময়টা কঠিন, কিন্তু মানুষ যেন কঠিন না হয়, শিল্প যেন কঠিন না হয়ে যায়। তাঁর ছবিগুলো অন্য কারও মতো নয়। এই নিজস্বতা, এই স্বাতন্ত্র্য এবং এই উত্কর্ষ বুঝিয়ে দেয় তিনি আসলেই কত বড় মাপের শিল্পী ছিলেন।

মবিনুল আজিমকে আমি স্মরণ করি তাঁর মৃত্যুহীন অর্জনের জন্য। স্বল্প জীবনে যা রেখে গেছেন তাই আমাদের সম্পদ।

মন্তব্য পড়ুন 0