শঙ্খ ঘোষ
শঙ্খ ঘোষছবি : সংগৃহীত

সারাটা দিন, ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে, যেন কেমন কেমন গেল! শঙ্খ ঘোষ মারা গেছেন জানার পর একটা বুকফাঁকা অনুভূতি হলো। এমনটা হয়েছিল হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর খবর জানার পর। শঙ্খবাবু আমার কেউ নন। আমার দেশের কবিও নন। হলে তিনি একটা কথা অন্তত বলতেন। তিনি কথা বলা লোক। ভারতে, পশ্চিমবঙ্গে কোথাও কেরোসিনের দাম চার আনা বাড়লে যিনি কথা বলতেন, হিন্দু-মুসলিম বিবাদ হলে কথা বলতেন। তাঁর কথা মানে কবিতা নয়, ফেসবুক স্ট্যাটাস নয়, দাপ্তরিক বিবৃতি নয়, তিনি রা করলেই কাজ হতো।

ধরা যাক, দেশ নানা অনাচারে ডুবে আছে। এ নিয়ে কে কথা বলে? যেন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, পাখিরা গান করছে, মাছেরা সাঁতার কাটছে। চাঁদপুরে জন্মেছিলেন কিংবা বাপের বাড়ি বরিশাল বলে শঙ্খবাবুর কথা বলতে বয়েই গেছে! তিনি তো ভারতের কবি, পশ্চিম বাংলার কবি, বাংলার নন। রবীন্দ্রনাথের নাহয় কুঠিবাড়ি আছে, কাছারিবাড়ি আছে, শ্বশুরবাড়ি আছে। শঙ্খবাবুর কিচ্ছু নেই এখানে। তবু শঙ্খ ঘোষ মারা গেছে জেনে বুকের ভেতর শূন্যতা দপদপ করে ওঠে।

বিজ্ঞাপন
কবির পছন্দ ছিল না বলে সম্মানকে ছেঁটে ‘খাটো’ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা গেল, সমালোচনা করলেও রাষ্ট্র পারে, চাইলে সমালোচককেও সম্মান দেওয়া যায়। নিয়ম ভেঙেও সম্মান দেওয়া যায়

শঙ্খবাবুর বাংলাদেশে কিছু নেই, কিন্তু শত, হাজার মানুষের বুকের ভেতর শঙ্খবাবুর কলমের আঁচড় লেগে আছে। বালিশের কাছে তাঁর লেখা বই নিয়ে ঘুমায় এমন অনেক তরুণ-যুবক-বৃদ্ধ বাংলাদেশে আছেন। আমাদের বাংলা ভাষাকে ওঁর মতো আদর করত কে আর? বাংলায় লিখত বলে আমরা তাঁর, তিনি আমাদের আত্মীয় হয়ে গিয়েছিলেন, কিংবা আরও নানা কারণে। তাঁর অন্যতম কারণ, না বলতেও তিনি ভারতের জন্য যা বলতেন, তা আমাদের হয়ে যেত। যেমন তিনি একবার বলেছিলেন, ‘দেখ খুলে তোর তিন নয়ন/ রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।’ মহামারিতে সেই আত্মীয়টিকে আমরা হারিয়ে ফেললাম।

শঙ্খবাবুর অ্যারেস্ট হওয়ার ভয় ছিল না। তিনি দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধও করেননি। কিন্তু আজ তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। সেই সম্মানের অংশ ছিল তোপধ্বনি। কবির পছন্দ ছিল না বলে সম্মানকে ছেঁটে ‘খাটো’ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা গেল, সমালোচনা করলেও রাষ্ট্র পারে, চাইলে সমালোচককেও সম্মান দেওয়া যায়। নিয়ম ভেঙেও সম্মান দেওয়া যায়। তখন মনে রাখতে নেই যে কবি লিখেছিলেন, ‘পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না/ তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ’। রাষ্ট্র!! স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকেও তো তিনি বলেছিলেন, ‘এত যদি ব্যূহ চক্র তীর তীরন্দাজ/ তবে কেন শরীর দিয়েছ শুধু/ বর্মখানি ভুলে গেছ দিতে…’

default-image

যারা দুকলম লিখে খাই, তাদের অনেকের শঙ্খের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর ভাষা আমাদের দুদণ্ড শান্তি দেয়, তাঁর চোখে দেখা রবীন্দ্রনাথ আমাদের অন্য রকম আলো দেয়। ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ-ইনস্টার যুগে একজন কবি যেভাবে একজন সন্ন্যাসীর জীবন কাটিয়ে যেতে পারেন, সেই শিক্ষাও দেয়। তাঁর পঙ্‌ক্তি, ‘কেননা বিনাশ সেও কোষে কোষে উৎস রেখে যায়/ আমাদেরও বুকে আজ জমেছে আগুনভরা জল’, আমাদের মনে করিয়ে দেয় গত শতকের বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের কথা, যখন আমাদের বুকের ভেতর আগুনভরা জল ছলকে উঠত। পরের শতকে জাগরণ ছিনতাই হতে দেখে আমরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। আমরা দেখি, নতুন এক সময় এসেছে পৃথিবীতে। সেখানে মিথ্যার গায়ে সত্যের জামা, যেখানে সাদাকে সাদা বলতে মানা, ধর্ম যেখানে শান্তির বড়ি, ধর্ম সেখানে আনছে কড়ি। বিজ্ঞাপন দিয়ে মিথ্যাকে মিথ করে তোলা হচ্ছে এই সময়টাতে। বেশ আগে শঙ্খবাবু তাঁর লেখায় বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম সেই পঙ্‌ক্তি, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে…’।

এসব দেখে আর কত সহ্য করা যায়? ‘ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ’গুলো আমাদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি তাই চলে গেলেন এই মহামারিতে। তবে আশ্বস্ত করে গেছেন, ‘আমার জন্মের কোন শেষ নেই।’ আজ বাঙালির শঙ্খশোকের দিন। আজ দিনটা শঙ্খনাদের।

বিজ্ঞাপন
শিল্পকলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন