বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সোহাগ তাঁর চিত্র পরিসরে রং ও তুলিকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে রাখেন। দেখেন তুলি ও রং গড়িয়ে–ছড়িয়ে কী রূপ ধারণ করে। অন্যদিকে তাঁর কালার প্যালেটের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলে মনে হবে, নানাবিধ রঙের রঙিন প্লাবন শুরু হয়েছে। সবকিছুর সমন্বয়ে সৃষ্টির উদ্যান নির্মাণ করেন তিনি।

সেই তুলিগুলো অজস্র আঁচড়সমেত গন্তব্যহীন রওনা দিয়ে আরও নতুন অচেনা গন্তব্যের সন্ধান পায়। তাঁর ছবির গায়ে অজস্র কাটাছেঁড়া টোন, ডট, লাইন সর্বদা বিরাজমান। তাঁর চিত্রপটে আঁকার সময় শুরুতে অনেক সময় ছবির দেখা মেলে না, কেননা ছবিগুলো পুরো জমিনে লুকিয়ে থাকে বা হারিয়ে যায়। আবার কীভাবে যেন সোহাগ প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো সেই সব ছবি খনন করে উদ্ধার করেন। তিনি শিরোনামের মাথায় রেখে ছবি আঁকেন না। পৃথিবীতে এমন বহু বিখ্যাত সিনেমা রয়েছে, যেখানে ছবির নাম নির্বাচন না করেই শুটিং শুরু করেছে এবং শেষও করেছে। তেমনি সোহাগ পারভেজও আঁকতে আঁকতে শিরোনামের দিকে পৌঁছান। বা বলা চলে, ছবি নিজেই তার শিরোনাম অর্জন করে।

সোহাগ তাঁর চিত্র পরিসরে রং ও তুলিকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে রাখেন। দেখেন তুলি ও রং গড়িয়ে ছড়িয়ে কী রূপ ধারণ করে। অন্যদিকে তাঁর কালার প্যালেটের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলে মনে হবে নানাবিধ রঙের রঙিন প্লাবন শুরু হয়েছে। সবকিছুর সমন্বয়ে সৃষ্টির উদ্যান নির্মাণ করেন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলতে হয়, সোহাগকে আমি কাছ থেকে দেখেছি, দেখেছি কীভাবে তিনি শিল্প সৃষ্টি করেন। ছাত্রজীবন থেকেই বনবাদাড়, গ্রামগঞ্জ, শহরে প্রচুর আউটডোরে ছবি আঁকতেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আউটডোরে গিয়ে প্রকৃতির কোনো একটি অংশবিশেষকে তিনি সরাসরি প্রকৃতি থেকে কেটে-ছেঁটে নিয়ে এসে ক্যানভাসে বসিয়ে দিচ্ছেন, তা কিন্তু নয়; আউটডোরে গিয়ে আগের কোনো ছবির খোঁজ তিনি করেন না—এমনকি প্রকৃতির কাছে গিয়ে করজোড়ে আত্মসমর্পণও করেন না, তাঁর কৌশল অন্য রকম—বাস্তবের অনুধ্যান ও কল্পলোকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সোহাগ পারভেজের ছবি। এ দুটি ভাব-উপাদানকে গুলিয়ে নিয়ে নিজস্ব শিল্পশৈলী নির্মাণেই তাঁর নিবিষ্টতা পরিদৃষ্ট হয়।

default-image

পাশ্চাত্য শিল্পীরা দৃশ্যমান প্রকৃতির খুঁটিনাটি রংতুলির মধ্য দিয়ে বিম্বিত করেন চিত্রপরিসরে, পক্ষান্তরে শান্তিনিকেতনের শিল্পরীতি পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির অন্য পিঠ। যেমন নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী, রামকিঙ্কর, রমেন্দ্রনাথ প্রমুখ শিল্পীর মূল ধ্যানই ছিল আউটডোরে গিয়ে বাইরের আলো–হাওয়ার সঙ্গে নিজেদের আত্মার সংযোগ স্থাপন করা। হুবহু প্রকৃতি দেখে আঁকতে হবে এমন নয়; বরং দৃশ্যমান প্রকৃতির আত্মাকে স্পর্শ করতে পারাটাই শিল্প নির্মাণের মুখ্য শক্তি। সোহাগও সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।

সোহাগের ছবি বরাবরই আউটলাইননির্ভর। তিনি তাঁর ছবির বিষয়বস্তু ছবির ফর্ম বা গড়নকে সব সময় বহিঃরেখা দিয়ে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন। পাশ্চাত্য বস্তুবাদী চিত্র যেমন আলোছায়ানির্ভর, তেমনি চীন, জাপান, ভারতবর্ষের ছবি আউটলাইননির্ভর। এটি হচ্ছে বস্তুবাদীর বিপরীত মেরু—ভাববাদী ধারা। সেই ভাববাদী শব্দটির শরীর মুখ্যত বহিঃরেখা বা সীমারেখা দ্বারা সুরক্ষিত। যদিও এসব প্রাচীন ভাবধারা এখন সব ধরনের কাজ পৃথিবীর সব জায়গায় চলছে।

সোহাগের এই প্রদর্শনীতে মোট ৪২টি শিল্পকর্ম রয়েছে। এখানে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন জলরং, অ্যাক্রিলিক, কালি ও কলম এবং চারকোল। চিত্রের বিষয় হিসেবে হাজির করিয়েছেন সাঁওতাল পরিবার, বুড়িগঙ্গা, ঝিল ও বাংলার প্রকৃতি ইত্যাদি।

default-image

চারকোলে আঁকা ছবিগুলোতে চিত্রকৃতির বৈভব রয়েছে। সত্যিকারার্থে শিল্প উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহজলভ্য হচ্ছে চারকোল, যেটাকে আমরা সহজ ভাষায় বলি কয়লা। কথায় আছে, ‘কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না।’ এ কথা স্মরণ রেখে এ প্রশ্নও রাখা যায়, ময়লা গেলে কি সোহাগের ছবি হতো?

এই প্রদর্শনীতে সোহাগের শিল্পমুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত হলো। চারকোল মাধ্যমে আঁকা তাঁর জীবনের প্রথম ছবি। এমনকি সেই পালক অন্যান্য পালককেও ছাড়িয়ে গেছে। চারকোলে আঁকা অনেক ছবির মধ্যে ‘মাছ ধরা’ শিরোনামের ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি নৌকায় জেলেদের মাছ ধরার চিত্র। এটি উল্লম্ব কম্পোজিশনের ছবি। এখানে শিল্পী একটি জালকে ওপরে উঠিয়ে দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে ওপরে কিছু পাখি আছে। সেসব পাখিকে ওড়ার জন্য শিল্পীকে ওপরে একটি খোলা আকাশ বরাদ্দ করতে হয়েছে। আর তাতে করে তাঁকে উল্লম্ব কম্পোজিশনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে সচেতনভাবেই।

পাল তোলা ছবিটিতে কিছু নৌকা ঝড়ের ঘুটঘুটে অন্ধকার কাটিয়ে বীরদর্পে বেরিয়ে আসছে আলোর সন্ধানে। সামনে কিছু মহিষ লম্বা ঘাসের মধ্যে নিমজ্জিত। এতে করে অর্ধেক দেহ দেখা যাচ্ছে। এই ছবিতে কালবৈশাখীর বিভা বা সাবলাইম বিউটি রয়েছে।
শিল্প সব সময় স্রোতের বিপরীতে হেঁটে বেড়ায়।

default-image

পুরান ঢাকার গেটের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শিল্পী মনে হয় বহু পুরোনো স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টিয়ে এ ছবি এঁকেছেন। বর্তমানে পুরান ঢাকার দৃশ্যপট অন্য রকম। কিন্তু এ ছবি ১৮৪৩ সালে আঁকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়ের শিল্পী চার্লস ডয়েলিকে মনে করিয়ে দিয়েছে। ছবিতে জীর্ণশীর্ণ হাড্ডিসার বুড়িয়ে যাওয়া একটি গেট দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে গেটটি বয়সের ভারে নুয়ে পড়ছে। পেছনে নীল রঙের ব্যবহার ও গেটের গায়ে বিবর্ণ রং দেখে মনে হয় অন্তিম শয্যায় আছে এটি। সামনের ছোট ছোট নিরুত্তাপ দোকান শিল্পী এঁকেছেন হালকা ইয়েলো অকার দিয়ে। জলরঙের স্কেচধর্মী ছবিটিতে সেই সময়ের বুড়িয়ে যাওয়া বাস্তবতাকে বর্তমানে টেনে এনেছেন তিনি। এটাই সোহাগের পারঙ্গমতা।

এদিকে চট্টগ্রামের ‘দুঃখ’খ্যাত চাক্তাই নদী ময়লা, আবর্জনা, অবৈধ দখলদারদের ছোবলে ইতিমধ্যে নাব্যতা হারিয়েছে। সোহাগের ছবিতে সেই নদী নেই। এর বদলে আছে স্বচ্ছ জল, নৌকা, নদী ঘেঁষে ঘরবাড়ি ও শরতের নীল আকাশ, হলুদ মাঠ ইত্যাদি।

অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে আঁকা ছবির পটভূমিতে উষ্ণ রং ও শীতল রঙের যথাযথ কর্ষণ রয়েছে। সবকিছুর মূলে শিল্পী চাক্তাই নদীর খসে যাওয়া পুরোনো প্রচ্ছন্ন সৌন্দর্যকে বিধৃত করেছেন। তাই চাক্তাই নদীর দুর্গন্ধযুক্ত কালো ময়লা জল সাদা চিত্রপরিসরে ঢেলে দেননি তিনি।

প্রদর্শনীটি উত্তরার গ্যালারি কায়ায় চলেছিল ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

শিল্পকলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন