বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

সৈয়দ হক মোটামুটি একটা পূর্ণ জীবনই পেয়েছিলেন। শেষটায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ফুসফুস ক্যানসারে। তাঁর জীবনের অন্তিম দিনগুলো কেটেছে হাসপাতালের শয্যায়। এ অবস্থাতেই শেক্​সপিয়ারের হ্যামলেট নাটক বাংলায় অনুবাদ করেছেন। প্রিয় নাট্যকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এর চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে। ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি ছিলেন ৪০৬ নম্বর কেবিনে। জীবনের নানা পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে জড়িত মানুষেরা সেখানে একে একে দেখা করে যাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে গল্প, আড্ডা, স্মৃতিচারণায় মেতে উঠছেন সৈয়দ হক। চিত্রনায়িকা কবরী তাঁকে দেখতে এসেছেন। তাঁকে দেখেই সৈয়দ হক গেয়ে উঠলেন নিজের রচিত, ‘তুমি আসবে বলে, কাছে ডাকবে বলে, ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে...।’ কবরীও পাল্টা গেয়ে উত্তর দিচ্ছেন। কে বলবে হাসপাতালের কেবিন সেটা। আইসিইউতে যাওয়ার আগে আট দিনে লিখলেন আটটি ছোটগল্প। মৃত্যুশয্যায় বসে জীবনের কী অনবদ্য উদ্​যাপন।

সৈয়দ শামসুল হকের জীবনের অন্তিম দিনগুলোর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন লেখকের জীবনসঙ্গী আনোয়ারা সৈয়দ হক। সৈয়দ হকের জীবনের সেই উদ্​যাপন ঔপন্যাসিক আনোয়ারা সৈয়দ হক দুই মলাটে লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর বাসিত জীবন বইয়ে। মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘বইটি মূলত সৈয়দ হকের জীবনের শেষ দিনগুলোর রোজনামচা। এবং সেই সঙ্গে আমাদের দুজনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সংকটের কথাও। তবে আমিই এখানে মূল বক্তা।...এই ইতিবৃত্ত তার বাসিত জীবনেরই আলেখ্যমাত্র, যে বাসিত জীবনের অর্থ হয় সুরভিত সৌগন্ধময় একটি মানবজীবন।’

বইটি শুরুর সময় ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাস। সৈয়দ হকের ৮০তম জয়ন্তী উদ্​যাপনের জোর প্রস্তুতি চলছে। এদিকে বাড়ির পোষা কুকুর পেরি সারা রাত অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বাড়ির মালিকের ভয়াবহ অসুখের খবর কি আগে থেকেই জেনে গেছে পেরি?

মানুষের জীবনকে জোড়া দিলে সেটি হয়ে ওঠে মহাভারতের মতো গল্পের ভান্ডার। সেই গল্প কি লিখে শেষ করা যায়, নাকি মানুষের মৃত্যু হলে গল্পেরও শেষ হয়ে যায়? জীবনের শেষ কটা দিনে সৈয়দ হক তাঁর জীবনের অজস্র গল্পের ভান্ডার মেলে ধরেছিলেন আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে। ‘এক সেকেন্ডে এক শতাব্দী’র অবসানের আগে, ‘আরও কত গল্প, আরও কত উপন্যাস, আরও কত কবিতা, আরও কত নাটক, আরও কত-কত-কত ঘুরপাক খাচ্ছিল’ তাঁর মাথায়। লালনের মতো ১১৬ বছরের আয়ু চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্যানসার আগেই থামিয়ে দিল তাঁর জীবন।

বাসিত জীবন: সৈয়দ হকের সঙ্গে শেষ দিনগুলো আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল, প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২০, ২৬৪ পৃষ্ঠা, দাম: ৫০০ টাকা। বইটি পাওয়া যাচ্ছে prothoma.com এবং মানসম্মত সব বইয়ের দোকানে।

আনোয়ারা সৈয়দ হক লিখেছেন, ‘শেক্​সপিয়ারের ৪৫২তম জন্মবর্ষ এবং ৪০০তম প্রয়াণবর্ষে তিনি ভয়াবহভাবে রোগাক্রান্ত অবস্থাতেও হ্যামলেট অনুবাদ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ২০১৬ সাল ছিল শেক্​সপিয়ারের জন্মের ৪৫২তম ও মৃত্যুর ৪০০ বছর পূর্তি। আর এ বছরেই সৈয়দ হক তাঁর নিজের প্রয়াণদিবসও যেন মনে মনে কামনা করে রেখেছিলেন।

‘২৭ তারিখটিও তার জীবনের একটি মাইলস্টোন হিসেবে ছাপ ফেলেছিল। ইংরেজি ২৭ ডিসেম্বর তার জন্ম, মাহে রমজানের ২৭ তারিখেও তার জন্ম। এই ২৭ ডিসেম্বরে তার প্রিয় কবি মির্জা গালিবেরও জন্ম। আবার এই ২৭ তারিখেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে জীবনের পূর্ণতা দান করেছিলেন।’

সৈয়দ হকের জীবনসায়াহ্নের শেষ কটা দিনের রোজনামচা হলেও বাসিত জীবন আনোয়ারা সৈয়দ হকের অনবদ্য এক স্মৃতিকথা। তাঁর দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, আশা, হতাশা, স্বপ্ন, উৎকণ্ঠার এক কাব্যিক দলিল।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন