বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মওলানা জালালউদ্দিন রুমি অস্থিরতার রাজ্যে প্রেম আর মরমিবাদের অসাধারণ সমন্বয় করার চেষ্টা করে গেছেন। জাভেদ হুসেনের চমৎকার অনুবাদে রুমি বলছেন, ‘শান্তির পেছনে ঘুরে মরো, তাই অশান্তি এত/ অস্থির প্রেমিক হও যদি, শান্তি ঘুরবে তোমার পিছে।’

রুমি বালখ, খোরাসান ও নিশাপুর অঞ্চলে দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খান বাহিনীর বীভৎস হামলা, নৃশংসতা ও বর্বরতা দেখে বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করেছেন। তাঁর সময়ের মর্মন্তুদ বেদনাদায়ক ঘটনা ছিল প্রখ্যাত সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের মোঙ্গলদের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া।

ফারসি সাহিত্যের কবিতাগুলো সাধারণত দুই ধরনের প্রেক্ষাপট নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়। প্রথমত, জাগতিক বা ইহলৌকিক প্রেম; দ্বিতীয়ত, মরমিবাদ বা আধ্যাত্মিক প্রেম। রুমির কবিতায় প্রতিটি প্রেম যেন আধ্যাত্মিকতা ও মরমিবাদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এ ক্ষেত্রে কবির বিনয় সুফিতত্ত্বকে বা মরমিবাদের জয়গানও বলা যেতে পারে। রুমি বলেন, ‘আত্তার যদি আত্মা হয়, সানায়ি সেই আত্মার দুটি চোখ/ আমি শুধু সানায়ি ও আত্তারের পথেই হাঁটছি।’

মওলানা রুমির কবিতা অনুবাদ: জাভেদ হুসেন প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকাৎ প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম প্রকাশকাল: জুন ২০২১, ১৬৭ পৃষ্ঠা দাম: ৩০০ টাকা। পাওয়া যাবে: www.prothoma.com এবং মানসম্মত সব বইয়ের দোকানে।

জাভেদ তাঁর অনুবাদের মাধ্যমে রুমির অনন্তকালের সেই সুরকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। অনুবাদক মূল ফারসি থেকে ভাষান্তরের ফলে সুফি দর্শনের রূপ-রস-গন্ধ আধুনিক মননশীলতায় সমৃদ্ধ পাঠকের অন্তরে প্রোথিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে এখানে কবিতাগুলো পড়তে পড়তে পাঠক অবচেতনে অনুবাদ কথাটি ভুলেও যেতে পারেন। অনুবাদক প্রতিটি শব্দের ভাবার্থ এমনভাবে তুলে ধরেছেন, মনে হবে রুমি সরাসরি কথা বলছেন পাঠকের সঙ্গে।

বিশেষত প্রথম দিককার কাব্যিক অনুবাদগুলোতে জাভেদ হুসেনকৃত অসাধারণ ছন্দমিল পাঠককে বিমোহিত করবে। তবে নির্বাচিত ‘মসনভি থেকে পঙ্​ক্তিমালা’, ‘দিওয়ানে শামস তাবরেজ থেকে’, ‘গজল’ ও ‘রুবাই’ অংশে তিনি কেন ছন্দ বাদ দিলেন বুঝলাম না। যদিও ভূমিকায় তিনি একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বটে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এর মাধ্যমে পাঠককে অনবদ্য কাব্যিক ছন্দ থেকে বঞ্চিত করেছেন অনুবাদক। কেননা বাংলা ভাষায় এত সাবলীল মসনভির অনুবাদ দুর্লভ। বাংলা ভাষার ফারসি জানা অধিকাংশ অনুবাদক মসনভিটি মূলত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনুবাদ করেছেন। ফলে তাঁদের অনুবাদে এমন কিছু শব্দ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা খুঁজে পাওয়া যাবে, যার সঙ্গে আধুনিক পাঠক পরিচিত নন। এসব অনুবাদে তাঁরা রুমিকে নিতান্ত একটি নির্দিষ্ট তরিকার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলতে পারেন। কিন্তু জাভেদের অনুবাদে মসনভি দারুণ সাবলীল, ‘সমুদ্রকে পেয়ালায় ঢেলে কতটা আর পাবে, বড়জোর এক দিনের খোরাক তোমার হবে।’

শেষে বলি, বইটির পরবর্তী সংস্করণে ফারসি উচ্চারণগুলোতে আধুনিক ঘরানার উচ্চারণরীতি অনুসরণ করা যেতে পারে বলে মনে হয়।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন