বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কী সেই নতুন হুমায়ূন? জনপ্রিয়তা লেখক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রকাশিত অংশ। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার কারণ কী? প্রথম প্রস্তাবে মোহাম্মদ আজমের ভাষ্য, ‘নিজ অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দৈনন্দিনতাকে আবিষ্কার করতে পারার বিপুল সাফল্যই হুমায়ূনের নজিরবিহীন জনপ্রিয়তার কারণ।’

মূলত ঢাকার নগর যাপনের অন্তরঙ্গ বয়ান হুমায়ূনের লেখনীতে অনন্য দক্ষতায় ফুটে উঠেছে। সত্তর-আশির দশকের ঢাকার বেকার তরুণদের জীবন-জিজ্ঞাসা, কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ-তরুণীদের মনোজগতের খবরাখবর সরল গদ্যে বর্ণিত হয়েছে তাঁর লেখায়। তরুণ-তরুণীদের থরোথরো আবেগ প্রকাশে যে মুনশিয়ানা হুমায়ূন দেখিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যে তা প্রায় বিরল। জনপ্রিয় লেখকের প্রায় প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই এ লেখকের ছিল। বরং দু-একটি বৈশিষ্ট্য বেশিই ছিল।

কিন্তু জনপ্রিয়তার প্রবাহমান স্রোতে হুমায়ূনের লেখনীর সাহিত্যমূল্য কি উপেক্ষিত থেকেছে? এ প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আজমের মত, ‘হুমায়ূন রচনাবলি থেকে একগুচ্ছ টেক্সট আলাদা করে বাছাই করা সম্ভব, যেগুলো প্রভাবশালী সাহিত্যপাঠরীতি মোতাবেক পঠিত হতে পারে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি হুমায়ূনের জনপ্রিয় উপন্যাস আমার আছে জল-এর প্রসঙ্গ টেনেছেন।

পাঠক পছন্দ করেন ফ্যান্টাসি। আর সেই ফ্যান্টাসির মায়াময় পথ ধরে হুমায়ূন একধরনের রহস্যময় দিনদুনিয়া আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাই বলে জীবন ও ফর্মের নান্দনিক মেলবন্ধন তাঁর লেখায় উপেক্ষিত থাকেনি। উপরন্তু, তাঁর কথাসাহিত্যের ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছে।

‘কথাশিল্পী হুমায়ূন’ পর্বে মোহাম্মদ আজম পাঠককে সঙ্গে নিয়ে তিনটি উপন্যাস—গৌরীপুর জংশন, প্রিয়তমেষু, এই বসন্তে পড়ার চেষ্টা করেছেন। আজমের উপলব্ধি, ‘সাহিত্যের মাপকাঠিতে হুমায়ূনের সফল উপন্যাস ও গল্পের সংখ্যা বাংলাদেশের বেশির ভাগ সফল লেখকের চেয়ে বেশি।’ আবার অন্য আরেকটি পর্বে তাঁর মত, ‘জীবনের সামগ্রিকতার যে বোধ উপন্যাসের মাহাত্ম্যের মূলে, সে ধরনের প্রকল্প নিয়ে তিনি খুব কমই কাজ করেছেন।…সম্ভবত ক্ল্যাসিক লেখকের বৈশিষ্ট্য হুমায়ূনে নেই।’

হুমায়ূন আহমেদ নাগরিক মধ্যবিত্তের লেখক। কিন্তু তাঁর রচনায় গ্রামবাংলা উপেক্ষিত থাকেনি, বরং তিনি ‘বিশুদ্ধ’ গ্রামের রূপকল্প আঁকার চেষ্টা করেছেন। মোহাম্মদ আজম বিভূতিভূষণের সঙ্গে হুমায়ূনের গ্রামদর্শনের অন্ত্যমিল খুঁজে পেয়েছেন। যাতে ভর করে ঢাকার হুমায়ূন অনায়াসে প্রবেশ করতে পেরেছেন ভাটিবাংলার গভীরে।

হুমায়ূনীয় লেখকসত্তার বহুমাত্রিক বাস্তবতা অনুসন্ধানের একটি নিবিড় পাটাতন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আজম এ ক্ষেত্রে কুশলী দক্ষতায় এক অন্য হুমায়ূনকে আবিষ্কার করেছেন। ১৯৭১ উপন্যাসে হুমায়ূন নান্দনিক ব্যঞ্জনায় যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধের পৃথক সত্তায় আবিষ্কার করেন। আবার আগুনের পরশমণিতে গেরিলা অপারেশনকে খানিক বিরতি দিয়ে লেখক ঢুকে পড়েন যুদ্ধ না করা কিছু মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতায়। হুমায়ূন আহমেদ পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য বইয়ের লেখকের অনুসন্ধিৎসু চোখে ধরা পড়েছে তা। তাঁর বিস্ময়কর উপলব্ধি, ‘তাতে কি যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ বা সিরিয়াসনেস বাদ পড়ল? না, বরং বেড়েছে।’

হুমায়ূনের লেখায় আমরা মুক্ত পৃথিবীর পরিচয় পাই। কিন্তু এর পরিসর রচনায় তিনি পারিবারিক ঘেরাটোপেই আশ্রয় খুঁজেছেন। সেই অলিন্দে চরিত্রগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করে। কিন্তু হুমায়ূনের নারী চরিত্রের ক্ষেত্রে মোহাম্মদ আজম তাঁর সুলিখিত বইটিতে এক অদ্ভুত সীমার কথা উল্লেখ করেছেন। যেই সীমার বাইরে হুমায়ূন নারীকে দেখতে পারেন না বা দেখতে চান না।

সাহিত্যের কুলীন পাঠকেরাও হুমায়ূনকে ‘জনপ্রিয় লেখক’ নামের এক অদ্ভুত ঘেরাটোপে বন্দী করতে চান। মোহাম্মদ আজম তাঁর বইয়ে সেই সীমারেখাকে ভেঙে ফেলার ডাক দিয়েছেন। আমরা কি তাঁর সহযাত্রী হব?

হুমায়ূন আহমেদ: পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য

মোহাম্মদ আজম

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল

২৫৫ পৃষ্ঠা, দাম: ৫০০ টাকা।

বইটি পাওয়া যাবে

prothoma.com এবং মানসম্মত সব বইয়ের দোকানে।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন