কথাটা অর্তেগা-ই-গাসেৎ-এর। অনেকটা এ রকম: যে সাহিত্য যাপিত-বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায় তা কখনো বিমানবিক-সাহিত্য হয় না। মীনাকুমারীর কবিতা পড়তে বসলে এ কথাটা সবার আগে মনে পড়ে। তাঁর একমাত্র কাব্য-সংকলন মীনাকুমারী কি শায়েরি, এ নায়িকার মৃত্যুর পর ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা তাঁর কবিতাগুলো সংগ্রহ করে বইটি প্রকাশ করেছিলেন গুলজার। অভিনয় নয়: মীনা কুমারীর কবিতা নামে বাংলায় অনূদিত হয়ে সেই বই বেরিয়েছে সম্প্রতি। অনুবাদক সফিকুন্নবী সামাদী।

মীনা কুমারী ছিলেন হিন্দি সিনেমার জননন্দিত নায়িকা। পেয়েছিলেন মাত্র ৩৯ বছরের জীবন। এই কালখণ্ডের মধ্যে সিনেমার বর্ণাঢ্য রূপময় জগৎ তো তাঁর ছিলই, তবে এর বাইরে তিনি ছিলেন এক দুঃখবতী, অসামান্য নারী। চার বছর বয়স থেকে অভিনয় করে আয় করতে শুরু করেন। সে আয়ে চলেছে বাবার সংসার। গাইতে–নাচতে পারতেন আর অভিনয় যে তিনি পারতেন, সে তো সবাই জানেন।

বাবার অমতে বিয়ে আর সিনেমা করতে গিয়ে তিনি পিতৃ–আশ্রয়হারা হন। স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হয়েও সন্দেহ, শারীরিক নির্যাতন আর অতিরিক্ত নজরদারির শিকার হয়েছেন নির্মমভাবে। মেকআপ রুমে কবি ও পরিচালক গুলজারের প্রবেশের অভিযোগে স্বামী কর্তৃক নিয়োগ করা কর্মচারীর ‘থাপ্পড়’ খেয়ে স্বামীর ঘর ছেড়েছিলেন। এরপর তাঁর জীবন থেকে বিদায় নিয়েছিল ঘুম। বইয়ের ভূমিকায় মীনাকুমারীর জীবনের এসব বিষাদময় প্রসঙ্গ সবিস্তার তুলে ধরেছেন কথা অনুবাদক সফিকুন্নবী। এই নায়িকাকে আমরা যেভাবে জানি, অনুবাদক তার অন্তরালের গল্পটাই বলেছেন।

বোধকরি চেয়েছেন ভূমিকাটি পড়ে পাঠক যেন তাঁর জীবনটা জানতে পারেন। আর অনূদিত কবিতাগুলো দিয়ে যেন সে জীবনে প্রবেশ করতে পারেন।

জীবনের শেষ দিকে বেদনাময় কষ্টের দিনগুলোতে মীনাকুমারী কবিতা লিখেছেন। তাঁর কাছে বিরহের রূপটা কেমন ছিল, কবিতায় খুব সহজ করে তিনি বলেছেন সেসব কথা: ‘তোমার দীর্ঘশ্বাস, তোমার জখম, তোমার সমস্ত বেদনা/ তার সাথে সম্পর্ক আমার, আজ এর সবই আমার।’ আরেকটি শের-এ মীনাকুমারীর ভাষ্য: ‘জীবন চোখ থেকে বেরিয়ে আসা বর্ণহীন ফোঁটা/ তোমার আঁচলের আশ্রয় পেলে অশ্রু হয়ে যেত।’ আবার নিজের জন্য যে এপিটাফ তিনি লিখেছিলেন, তাতে তাঁর যে বক্তব্য প্রকাশিত তা যেন তাঁর কবিতারই অন্যরূপ: ‘তার জীবন শেষ হয়েছিল ভগ্ন বীণা নিয়ে/ ভগ্ন সংগীত নিয়ে/ ভগ্ন হৃদয় নিয়ে/ কিন্তু ছিল না কোনো আক্ষেপ।’

মীনা কুমারীর কবিতা পড়লে বোঝা যায় কী নিদারুণ বেদনা তিনি সয়েছেন, কিন্তু কখনো উচ্চকণ্ঠ হননি। কবিতা দিয়ে কাউকে আঘাত করেননি। রূপক কিংবা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ভাষায়ও নয়; বরং সরল ভাষায় নিজের বেদনার কথা বলেছেন। এ বইয়ের ভূমিকা থেকে জানতে পারছি, তিনি উর্দু কবিতার দুজনকে পড়তেন নিবিড়ভাবে। একজন মীর অন্যজন ফয়েজ আহমদ ফয়েজ। দুজন দুই ঘরানার।

তবে মীনা কুমারীর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, তিনি মীরের মতো ধ্রুপদি উর্দু ঘরানার কবি। কবিতায় নিজের জীবনকে প্রকাশ করতে কোনো অলংকার তিনি পরেননি। পুরুষতন্ত্রের যে বলিষ্ঠ থাবার নিচে তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র চার দশকেরও কম, তার প্রতি কোনো ক্ষোভ বা খেদ প্রকাশ করেননি; বরং নিজের বয়ে চলা বেদনাই তুলে ধরেছেন কবিতায়। তাই হয়তো তিনি মনে করেছেন সারা জীবন তিনি ‘একাই বেঁচেছিলেন’।

মূল উর্দু থেকে আলোচ্য বইয়ের কবিতাগুলোর খুব চমৎকার বাংলা ভাষান্তর করেছেন সফিকুন্নবী সামাদী। তাই দুহাত নয়, উর্দু ও বাংলা ভাষার এক দক্ষ হাত ঘুরে মীনাকুমারী আমাদের কাছে হাজির হয়েছে। এটাই এ বইয়ের প্রধান পাওনা।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন