পাঠকেরা বইয়ে দুটো বিপরীতমুখী শিল্পকীর্তিকে পাশাপাশি পাবেন। ‘সারা দিনমান ঝরনার গান’ আপনার কাছে বড্ড একরৈখিক বা ঋতুঘেঁষা মনে হলে আপনি আবুল মনসুরের সৃষ্ট পঙ্‌ক্তি ‘দিনমান অশ্রু আর ঘামের দাপট’ কিংবা ‘রাস্তাঘাটে এলোমেলো মাস্তানি জট’–এ আশ্রয় খুঁজতে পারেন। আশ্রয় নিতেই পারেন শিল্পীর রেখায়নের ছায়াতলে। নামহীন দৃশ্য ও কাব্যের যুগল স্রোতে আছে সময়ের অস্থিরতা আর বীভৎসতা। পাশাপাশি কবিশিল্পী এতে অন্বেষণ করেছেন নিবিড় শান্তি:

‘কোথাও কি যাওয়া যায় যেখানে খেলে না ধ্বস্ত দালানের খোপে স্বর্গীয় শিশুদল

বোমা–গুলি–ধোঁয়ার কুণ্ডলী নেই, আছে শুধু ঝরনার টলটলে নির্মল জল’।

আবার অন্য কারও অনুগামী না হয়ে যুগপৎ চিত্রে–কাব্যে পরাবাস্তবতাকে রঙিন করে তুলেছেন অনেকটা নিজের মতো করে:

‘তারপর চলে যাও অন্তর্লীন মহাবিশ্বে, অন্য কোথা অন্য কোনোখানে

পদচ্ছাপ কিছু রেখে যেয়ো বিস্মৃতির আঁধারে যেন বিদ্যুৎ–বল্লম হানে।’

তবে শুধু পরাবাস্তবতা নয়, মনসুরের কবিতায় বাস্তব ও পরাবাস্তব একই কাতারে হাঁটে। একটা কথা প্রসঙ্গিকভাবেই বলা দরকার, গোটা কবিতা ছবিতায় আবুল মনসুরের লেখা (পড়ুন: কবিতা) যতটা মূর্ত ও সরল, তাঁর রেখা ততটাই বিমূর্ত। এ ক্ষেত্রে মূর্ত ও বিমূর্তের একটা ভারসাম্য যেন তৈরি করেছেন তিনি।

কবিতা ছবিতা– আবুল মনসুর, প্রকাশক: সাহিত্য নিকেতন প্রকাশন, চট্টগ্রাম প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২১ ৮৭ পৃষ্ঠা; দাম: ৩০০ টাকা।

বইটিতে একই সঙ্গে দুটি শিল্পকে সন্নিবেশিত করেছেন আবুল মনসুর। একদিকে তিনি কাব্যের সুষমায় কিছু অমোঘ পঙ্‌ক্তি সৃষ্টি করেছেন। পাশাপাশি এঁকেছেন বিমুগ্ধ চিত্রমালা। একে কি আমরা কবিতা লিখতে গিয়ে আঁকিবুঁকি কাটার অভ্যাস বলব, যাঁর ইংরেজি নাম ‘ডুডলিং’? কবির অধিকাংশ কবিতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, অন্ত্যমিলের আশ্রয় নিয়েছেন কবি। দৃষ্টান্তস্বরূপ ওপরের পঙ্‌ক্তিগুলোয় চোখ বোলালেই এর প্রমাণ মিলবে। কথা হলো, এই গ্রন্থের পাতায় পাতায় সচেতনভাবেই যিনি বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন, সেই একই মানুষ যখন কবিতা লিখছেন, তখন তিনি কেবল সারল্যপ্লাবিতই হচ্ছেন না, তা যেন পাঠকের অন্তরে গেঁথে থাকে, সে জন্য পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে অন্ত্যমিলও খাড়া করছেন। ফলে কবিতাগুলোও হয়ে উঠেছে মনোগ্রাহী। আর তাঁর ছবি তো আগে থেকেই মনোলোভা। তাই মনোগ্রাহী আর মনোলোভার যুগলবন্দীতে যা ঘটে, তা খুব অনুপমই বটে!

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন