default-image

বাঙালির সংস্কৃতির চর্চা ও প্রতিষ্ঠায় অন্যতম লড়াকু ব্যক্তিত্ব হলেন সন্​জীদা খাতুন। বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও প্রসারে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও নান্দনিক। এটাই একমাত্র পরিচয় নয় যে তিনি ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠানের অধিষ্ঠাত্রী, তিনি একজন শিক্ষাবিদ ও লেখকও। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। এটি বিপুলাকায় এক গ্রন্থ, যেখানে সংগৃহীত হয়েছে এযাবৎ লিখিত-প্রকাশিত তাঁর রচনার নির্বাচিত প্রবন্ধাবলি।

এর অন্তর্গত রচনাগুলোর বিন্যাসে আছে চারটি ধারা—এক. সাহিত্য-সাহিত্যিক; দুই. সংস্কৃতি; তিন. দেশকাল; চার. আ মরি বাংলা ভাষা। এই বিন্যাসধারাই উপস্থাপন করে সন্​জীদা খাতুনের চিন্তামনন ও সাংস্কৃতিক-সত্তার বহুলতা। সাহিত্য-সাহিত্যিক পর্বে রয়েছে আমাদের বাংলা সাহিত্যসেবী কয়েকজন প্রধান-অপ্রধান লেখকের গড়ে ওঠা, জীবনদর্শন, তাঁদের সাহিত্যভাবনা ও রচনাকৃতির সঙ্গে রচয়িতার আপন জীবনের নিভৃত সংযোগ। সন্​জীদা খাতুনের এ ধরনের বিবেচনা তুলে ধরে যেমন তাঁর স্বকীয় দৃষ্টিদর্শন, পাঠের গভীরতা ও মননবুদ্ধির সঙ্গে জড়িত নান্দনিকবোধ, তেমনি প্রতিবিম্বিত হয় তিনি কোন ধারার সাহিত্য-সমালোচক। প্রবন্ধগুলো আমাদের জানান দেয় যে তিনি সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রতিফলনতত্ত্বের অনুগামী।

বিজ্ঞাপন
default-image

শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ

সন্​জীদা খাতুন

প্রকাশক: কথাপ্রকাশ, ঢাকা, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৬৪৮ পৃষ্ঠা, দাম: ৬০০ টাকা।

সাহিত্য সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার জীবন-প্রতিবেশ ও দেশকাল যে ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত, সেটি প্রতিভাত হয় বিশেষত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধে। এগুলোয় আমরা পাই রবীন্দ্রনাথের নানা পরিচয়ে গাঁথা একটি বিচিত্র নকশা। প্রবন্ধগুলো একই সঙ্গে ‘ইমপ্রেশনিস্টিক’ হয়েও নৈর্ব্যক্তিকও বটে।

শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধতে আছেন নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ, জসীমউদ্​দীন, কাজী মোতাহার হোসেন ও সত্যেন সেন। অর্থাৎ কবি, চিন্তাবিদ ও ঔপন্যাসিক—এই ত্রয়ী ব্যক্তিত্বই সন্​জীদা খাতুনের আধেয়। তাঁদের নিয়ে লেখালেখিতেও পরিস্ফুট হয়েছে ওই কবি-সাহিত্যিকদের বৈশিষ্ট্য, চিন্তাশীলতা ও দৃষ্টিদর্শন।

সন্​জীদা খাতুনের প্রবন্ধের ব্যাপক ও বিশিষ্ট এলাকা হচ্ছে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রবন্ধগুলো। বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজনৈতিক-সামাজিক লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে নিজের বিজড়ন ও অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা যে তাঁকে ধৃতি দিয়েছে, সেটাই ব্যক্ত করেছেন। বাঙালি সংস্কৃতির বিবর্তন এই বঙ্গীয় ভূভাগে কত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে, তার ইতিহাসটা এসব প্রবন্ধে অন্তর্বয়িত।

সন্​জীদা খাতুনের আরেকটি চিন্তার জায়গা হলো সংগীত। তিনি নিজে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, রসজ্ঞ ও বিজ্ঞ বিশ্লেষক। একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংস্কৃতি-সংগীতের ভূমিকা নিয়ে অভিজ্ঞতা-মননের বয়ান করেন, তেমনি অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গানের নানা দিক নিয়ে তাঁর ভাবনাটিও পাখা মেলে দিয়েছে। রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, স্বরলিপি, তাঁর সংগীতের ছন্দরূপ, নজরুলসংগীত—এসব সংগীতভাবনা শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ-এর আকর্ষণ বাড়িয়েছে, বইটিকে ঋদ্ধ করেছে। নিছক আত্মভাবুক হয়ে নয়, নিজের চর্চা ও সংগীত-পাণ্ডিত্য নিয়েই সন্​জীদা খাতুন প্রবন্ধগুলো রচনা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সাহিত্য-সংস্কৃতি দেশকালের পটেই বিন্যস্ত শুধু নয়, তা থেকে উৎসারিতও। ফলে ‘দেশকাল’ এই শিরোনামে যে চারটি রচনা সংকলিত হয়েছে, সেগুলোতেও আছে রবীন্দ্রনাথের ধর্মদর্শনের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা, আছে আমাদের মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও তাৎপর্য এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে নিজের আত্মবয়ান। এর মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিসত্তা গঠনে রবীন্দ্রনাথের অনিবার্য অস্তিত্বকে তিনি যেমন চিহ্নিত করেছেন, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকেও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যক্ত করেছেন। সন্​জীদা খাতুনের এসব প্রবন্ধের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সারল্য অথচ বিজ্ঞতার পরিচিহ্নে শক্তিবন্ত। ভাষার প্রাঞ্জলতা প্রসাদগুণে বিমণ্ডিত।

সন্​জীদা খাতুনের পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানচর্চার বিশেষ রূপটি ফুটে উঠেছে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ শীর্ষক ধারায় গ্রন্থিত দুটি প্রবন্ধে—‘বাংলা ভাষার ধ্বনিচরিত্র’ ও ‘বাংলা বর্ণমালা আর প্রমিত বাংলা উচ্চারণের ধ্বনিমালা’।

বস্তুত, সন্​জীদা খাতুনের মেধা-মনন ও নান্দনিক প্রজ্ঞার বহুমুখিতাই আমরা এ বইয়ে পাই। সবচেয়ে বেশি পাই ‘একজন আদ্যোপান্ত বাঙালি ও পূর্ণাঙ্গ মানবের সন্ধানকামী’ অনুধ্যানী লেখকসত্তাকে। এই মানবসংস্কৃতির সাধনাই এই লেখকের জীবনদর্শন, যা অনেকটাই ‘রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে’ পথ কেটে চলেছে নিজস্বতা অক্ষুণ্ন রেখে লেখনীর ব্যক্তিত্বকে অন্তর্দীপ্ত করে।

বহুমাত্রিক প্রতিভান্বিত সন্​জীদা খাতুনের এই শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারা ও বিকাশের ইতিহাসকে মননচর্চার গভীরতায় সমৃদ্ধ করেছে।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন