ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার এখনকার চিত্র। মধ্যযুগে এখানকার ফ্রাঙ্কফুর্টার মেস এলাকায় শুরু হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম বইমেলা
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার এখনকার চিত্র। মধ্যযুগে এখানকার ফ্রাঙ্কফুর্টার মেস এলাকায় শুরু হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম বইমেলাছবি: সংগৃহীত

পুরোনো বইয়ের গন্ধে, হলুদ হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠায় কত স্মৃতি মিশে থাকে! সেসব স্মৃতি কখনো–বা নানা রকম প্রশ্নও জাগায় মনে, পৃথিবীতে কবে প্রথম শুরু হয়েছিল বইমেলা?

আমি প্রথম যখন বইমেলায় গিয়েছিলাম, বোধ হয় তখন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম; ছোট মামা আর আম্মার সঙ্গে। মনে হয়েছিল, অন্য একটা দুনিয়ায় ঢুকে গেছি। মামা সেবার একটা কাঠের পাজল কিনে দিয়েছিলেন আমাকে, জোড়া লাগালে বাংলাদেশের মানচিত্র হয়। একটা বইও কিনে দিয়েছিলেন। সেই বই আর লেখকের নাম, এখন কিছুই মনে নেই। তবে মনে আছে, সেটা ছিল চীনা কোনো বইয়ের অনুবাদ। পৃষ্ঠাজুড়ে ছবি আর নিচে একটা করে লাইন। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছবিগুলো দেখতাম। পেন্সিল স্কেচে অনবদ্য একেকটা মুহূর্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, কে যে এঁকেছিলেন সেসব!

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামও প্রথম জেনেছি এই বইমেলার সূত্রেই। আম্মা তাঁর জন্য চারটে বই কিনেছিলেন আর সবাই বলাবলি করছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের দাঁতভাঙা ভাষার কথা। আম্মা অবশ্য দুপুরবেলায় গভীর মনোযোগে সেসব বই পড়তেন। একটা উপন্যাসের নাম ছিল রজনী। এক অন্ধ মেয়ের বয়ানে বইটা লেখা। একদিন একটা লাইন পড়লাম, ‘অনেকবার পদচারীর ঘাড়ে পড়িয়াছি বটে, তাহার কারণ কেহ কেহ অন্ধ যুবতী দেখিয়া সাড়া দেয় না, বরং বলে “আ মলো, দেখতে পাসনে? কানা নাকি?” আমি ভাবিতাম, উভয়ত!’ খুব হেসেছিলাম পড়ে। এটা যে একটা হাসির কথা এবং সেটা যে আমি বুঝতে পেরেছি, অর্থাৎ আমিও যে অনেক কিছু বুঝি, সেই আবিষ্কার আমাকে আরও বেশি খুশি করেছিল।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বইমেলায় শেষবার গিয়েছিলাম ১৯৯৪ সালে। তত দিনে আমরা মেলবোর্নপ্রবাসী, দেশে গিয়েছি বেড়াতে। সেবার হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছিলাম, ভক্তরা ঘিরে রেখেছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি পাঠকের কারাগারে বন্দী, ওই চক্রব্যূহ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। আমি তাই ইচ্ছা থাকলেও আর কথা বলতে যাইনি। তখনকার সময় লেখকরা ধরাছোঁয়ার বাইরের মানুষ ছিলেন। তাই বইমেলায় বা হঠাৎ রাস্তায় একঝলক দেখা গেলে সেটা বলার মতো বিষয় হতো। এখনকার ডিজিটাল দুনিয়ায় সবকিছুই তো নাগালের ভেতর মনে হয়। এর সুবিধার দিক অনেক থাকলেও আগেকার সেই রহস্যময় উত্তেজনাটা হারিয়ে গেছে।

আমার সমস্যা হলো, যেকোনো কিছুর শুরু জানতে ইচ্ছা করে। ধরেন, আলুভাজি খাচ্ছি। আমার তখন মনে হবে, আচ্ছা মানুষ কবে প্রথম আলু চিনল? এত রকমের আলু যে হয়, মানুষ জানল কীভাবে? প্রথমে তো নিশ্চয়ই কাঁচা আলু খেয়েছে, এটা ভাজলে যে দারুণ এক স্বাদ হয়, কে প্রথম জানল? ইশ, আলুভাজায় কামড় দেওয়ার পর তার চেহারাটা যদি দেখতে পেতাম!

এখন যেমন মনে হচ্ছে, দুনিয়ার প্রথম বইটা কে লিখেছিলেন অথবা প্রথম বইমেলাই–বা কোথায় হয়েছিল? ভাগ্য ভালো যে অস্ট্রেলিয়ান সরকারের সঙ্গে সামান্য মান–অভিমানের পরও গুগল সাহেব এখনো আমাদের ছেড়ে যাননি। আমার এসব কৌতূহল নিবারণের প্রাথমিক ভরসা তো তিনিই।

default-image

জানা গেল, পৃথিবীর প্রথম উপন্যাসের নাম গিলগামেশ, যা প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় লেখা হয়েছিল অর্থাৎ বর্তমানের ইরাক আর সিরিয়া যেখানে। লেখকের নাম জানা যায়নি। বইটা কেন লেখা হয়েছিল, কে তার পাঠক ছিল, সেসবও কেউ জানে না। বইটা ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে মাটির ফলকে। পৃথিবীর প্রাচীনতম বর্ণমালা কিউনিফর্মে (কীলকাকার) লেখা হয়েছিল বইটা। এই নাম এসেছে অক্ষরগুলোর আকার থেকে। তখনকার লিপিকারেরা কাদামাটির ওপর নলখাগড়া দিয়ে কীলক খোদাই করে লিখতেন।

হাজার হাজার বছর ধরে কেউ এই লেখা পড়তে পারেনি। ১৮৭০ সালে জর্জ স্মিথ নামে লন্ডনের এক শ্রমজীবী মানুষ ব্রিটিশ জাদুঘরের এই মাটির ফলক দেখতে দেখতে তার পাঠোদ্ধার করেন। ফলে গিলমামেশ–এর গল্পটা আমরা জানতে পারি।

গিলগামেশ ছিলেন উড়ুকের (বর্তমানে ইরাকের দক্ষিণে অবস্থিত শহর) রাজা। তাঁর মা ছিলেন একজন দেবী। গিলগামেশে একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন। গ্লেজ করা ইট দিয়ে তিনি এক অসাধারণ সুন্দর শহর তৈরি করেছিলেন, যা ছিল অভিনব প্রযুক্তি। অথচ তিনি ছিলেন নারীলিপ্সু ও অত্যাচারী। বিয়ের আসর থেকে মেয়েদের তুলে নিয়ে আসতেন। এ কারণে দেবতারা মিলে এনকিডু নামের এক বন্য মানুষ তৈরি করেন উড়ুকের বাসিন্দাদের নিপীড়ন থেকে উদ্ধারের জন্য। এনকিডু ছিলেন দেবীর হাত থেকে ঝেড়ে ফেলা মাটি দিয়ে তৈরি আধা মানুষ, আধা পশু, যাঁর সারা শরীর লোমে ভরা আর যিনি গাজেলাদের সঙ্গে ঘাস খেয়ে বড় হন। পরে কীভাবে তিনি পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠেন, গিলগামেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিস্তার এবং তার কারণে গিলগামেশের মানসিক পরিবর্তন, পৃথিবীর সুরক্ষার জন্য তাঁদের একসঙ্গে যুদ্ধের কথা আছে এই উপন্যাসে। আর আছে শেষ পর্যন্ত গিলগামেশের উপলব্ধি—যিনি যত বড় বীরই হোন না কেন, মৃত্যুকে জয় করতে পারেন না। এখানেই অন্য সব মানুষের সঙ্গে তিনি এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান। সম্প্রতি ২০১১ সালে গিলগামেশ–এর দ্বিতীয় একটা ফলক উদ্ধার হয়েছে। এখন সেটা আছে ইরাকের সুলায়মানিয়া জাদুঘরে।

প্রথম বইমেলার ইতিহাস অবশ্য সে তুলনায় অনেক নতুন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা এখন যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, জানামতে, জার্মানির সেই ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরেই পৃথিবীর প্রথম বইমেলা হয়েছিল। হ্যাঁ, ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের বইমেলাই পৃথিবীর প্রথম। এর ইতিহাস ৫০০ বছর পুরোনো। ভেন্যু হলো ফ্রাঙ্কফুর্টার মেসে। বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপের বাণিজ্য ও ব্যাংকিংয়ের কেন্দ্রে ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর। সেই সুবাদে ফ্রাঙ্কফুর্টাস মেসের কথা সেই দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই শোনা যায়। বেশ কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সেই ১৪৭৮ সাল থেকেই এখানে বইমেলা হতো এবং তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পিটার ওয়েডহাস এই মেলার একজন পরিচালক ছিলেন ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত। তাঁর একটা বই আছে, আ হিস্টি অব দ্য ফ্রাঙ্কফুর্ট বুকফেয়ার (ফাঙ্কফুর্ট বইমেলার ইতিহাস) নামে। সেখানে তিনি লিখেছেন, রাজা অষ্টম হেনরি নাকি স্যার টমাস বোডলিকে এই বইমেলায় পাঠিয়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন লাইব্রেরির জন্য বই কিনতে।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীকালে, সম্ভবত রানি মেরির রাজত্বকালে (ধর্মের নামে নিধনের কারণে যাঁর ডাকনাম হয়েছে ব্লাডি মেরি) যখন নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা বানানো হলো, মেলার বহু বই ছিল সেই তালিকায়। এ কারণে ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রকাশনা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্তও হয়। ১৭ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, প্রটেসন্ট্যান্ট শাসনামলে ফ্রাঙ্কফুর্টকে ম্লান করে দিয়ে লেইপজিগ শহর প্রকাশনা বাণিজ্যের কেন্দ্রে চলে আসে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ১৯৪৯ সালে ২০৫টি জার্মান প্রকাশনীকে নিয়ে নতুন উদ্যমে চালু হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলা। সেই মেলাই এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল আকারে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর অক্টোবর মাসে। আলবেনিয়া থেকে জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত প্রায় ১০০টি দেশ থেকে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ প্রকাশনী এতে অংশগ্রহণ করে। যদি বেঁচে থাকি এবং আবার কখনো অস্ট্রেলিয়ার বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়, একবার এই বইমেলায় যেতে হবে।

১৯৭৩ সালে আটলান্টিক পত্রিকায় গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন উইলিয়াম কেনেডি। একটা বই উৎসবের দিন দেখা হয়েছিল তাঁদের। এখানে বই উৎসবের একটু আভাস ছিল এ রকম:

‘আমরা ভিড়ের রাম্বলাস ধরে আবছা হাঁটছিলাম, চারপাশে ফুলের ছড়াছড়ি, আরেকটা প্রশ্ন করলেন গার্সিয়া, “যখন বই কিনলেন, তখন একটা ফুল কিনেছিলেন?”

আমার স্ত্রী ডানা ফুল কেনার প্রমাণ হিসেবে হাতে ধরা গোলাপটা দেখালেন তাঁকে। বইয়ের দিনের এই মেলার প্রথা অনুযায়ী, সব প্রকাশক আর বইয়ের দোকানগুলো বড় রাস্তার ওপর অস্থায়ী কাঠের স্টল থেকে বই বিক্রি করে। ঐতিহ্য অনুসারে পুরুষেরা তাঁদের স্ত্রী, প্রেমিকা, বান্ধবী অথবা নারী আত্মীয়কে ফুল কিনে দেন। আর বিনিময়ে নারীরা তাঁদের একটা বই উপহার দেন।’

এই সূত্রে জানতে পারলাম, বার্সেলোনার এই বই উৎসব বহু নামে পরিচিত। যেমন, সেন্ট জর্ডির দিন, সেন্ট জর্জের উৎসব, গোলাপের দিন, প্রেমিকের দিন ইত্যাদি। ১৫০৭ সালে সেন্ট জর্জের স্মরণে তাঁর মৃত্যুদিবস ২৩ এপ্রিলে শুরু হয়েছিল এই মেলা। তাঁকে নিয়ে একটা কিংবদন্তি আছে যে এক রাজকন্যাকে বাঁচানোর জন্য তিনি একটা ড্রাগন মেরেছিলেন। সেই ড্রাগনের রক্ত যেখানেই প্রবাহিত হয়েছে, সেখানেই গোলাপ ফুটেছে। এদিন তাই প্রেমিকেরা প্রেমিকাদের গোলাপ উপহার দেন। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেমিকারাও পাল্টা উপহার হিসেবে বই দিতে শুরু করেছিলেন। এখনকার সময় অবশ্য ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবাইকেই বই ও গোলাপ দেওয়া যায়।

default-image

ঐতিহাসিক বইমেলাগুলোর একটাতেও যাওয়া না হলেও অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের বেশ কিছু বইমেলায় গিয়েছি। এখানে অবশ্য বলা হয় রিডারস অ্যান্ড রাইটারস ফেস্টিভ্যাল (পাঠক ও লেখকের উৎসব)। এগুলো বিভিন্ন শহরে এবং বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। মেলবোর্নে সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, অকল্যান্ড শহরে এপ্রিল-মে মাসে। সারা পৃথিবী থেকে অনেক লেখক আসেন এখানে অংশ নিতে। বিভিন্ন সেমিনার, সাক্ষাৎকার, চা ও পাবের আড্ডা ইত্যাদির মাধ্যমে লেখক–পাঠকদের যোগাযোগ ঘটে। কিছু কিছু অনুষ্ঠানের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা থাকে।

গত বছর কোভিডের কারণে বহু বইমেলাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টিকিট কাটতে হয়নি। আমার বেশ ভালো সময় কেটেছে। কত দেশ–বিদেশের লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো ঘরে বসে। আবার তাঁদের ঘর, লেখার জায়গাও মুফতে দেখা হলো। যেসব মেলায় কোনোদিন যাওয়া হতো না, সেখানে হাজির থাকা গেল। হে ফেস্টিভ্যাল থেকে শুরু করে বুকার প্রাইজ, ডাবলিন বইমেলা সবই আমি দেখেছি অনলাইনে। শুনলাম অস্ট্রেলিয়ায় এবার বইয়ের বিক্রি অন্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। ঘরবন্দী মানুষ বইয়ের ভেতর হারিয়ে অ্যাডভেঞ্চার খুঁজেছে। আমার ধারণা, অন্য সব বিভাগের মতো বই ও প্রকাশনাশিল্পকে ঘিরেও বেশ বড় একটা পরিবর্তন হবে আমরা যখন কোভিডপরবর্তী নরমালে ফিরব।

বাংলাদেশেও তো এবার প্রথমবারের মতো ফেব্রুয়ারির বইমেলা মার্চ মাসে হচ্ছে। এর সঙ্গে একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হলে বেশ ভালো হয়। সশরীর হাজির থাকার, প্রিয় লেখকের সঙ্গে বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার উত্তেজনা না থাকলেও কিছু তো থাকে। দিন শেষে কোথায় আর ফেরা যায়? আবার জীবনানন্দ দাশ মনে আসেন, ‘পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন...’।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন