বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অবিভক্ত

হাসান ফেরদৌস

প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২১

১২৮ পৃষ্ঠা, দাম: ২৬০ টাকা।

সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যৌথ পরিবারের ভাঙনকেই বাস্তবতা মেনে মানসরা উদীয়মান এক সমাজের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু ছন্দপতন। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সাম্প্রদায়িক সত্তার ভিত্তিতে দেশভাগ তাদের পরিণত করছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে। সংখ্যাগুরুর আঁচড় লাগে মালিবাগের ছোট পাড়ায়। সাম্প্রদায়িক বিষে মুহূর্তেই আশ্রয়হীন, বন্ধুহীন ও বাস্তুচ্যুত এক জীবনের চলচ্ছবি আঁকছেন ঔপন্যাসিক। ‘...মালিবাগের ভস্মীভূত বাড়ি...চিৎকার করে বলতে চাইছে আমি তোমাদের লোক, এই পাড়া আমার, এই শহর আমার...গলা দিয়ে একটা শব্দও বেরোয় না।...পালাতে থাকে মানস।’

ঘটনা পরম্পরায় মানস কলকাতা হয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছায়। কিন্তু উন্মূল জীবনের হাহাকার যায় না তাঁর কণ্ঠ থেকে, ‘...মাটির গহনে প্রবেশ না করলে গাছের মতো জীবনেরও নির্যাস লাভের সুযোগ হয় না।’ পুরো উপন্যাসে রাকা, মুসা, বিহান রায়, রেবতীরা জীবনের সেই নির্যাসকেই খুঁজে ফিরেছে। এই অন্বেষণই শিকড়চ্যুত প্রত্যেককে একবিন্দুতে মিলিয়েছে।

অবিভক্ত কোনো প্রথাগত উপন্যাস নয়। এটি ঐতিহাসিক ঘটনার আশ্রয়ে লিখিত হলেও ঐতিহাসিক নয়। আবার প্রধান চরিত্র মানসের জীবনচরিত বর্ণিত হলেও এটি আত্মজীবনীমূলক নয়। বরং একে ফিকশন ও নন–ফিকশনের অনেকটা মিশেল বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে এক ছায়া-রণক্ষেত্রের নাম জাতিসংঘ। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে উত্তাল একাত্তরে জতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারণ পরিষদে আলোচনা-বিতর্ক, প্রস্তাব পাস, সর্বোপরি স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রদান ইত্যাদি ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল । উপন্যাসে সেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ভারত ও আরব বিশ্বের আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চরিত্র বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, তৎকালীন জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত সমর সেন, হেনরি কিসিঞ্জার প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছেন। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিপক্ষে বিশ্বে জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী। বাঙালিসত্তাকে ধর্মের নামে, সম্প্রদায়ের নামে বারবার বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের অদ্ভুত সমাপতন—মুক্তিযুদ্ধ সেই বাঙালিকে অবিভাজ্য সত্তায় আবার যূথবদ্ধ করেছে। সম্ভবত এ কারণেই লেখক উপন্যাসের নাম রেখেছেন অবিভক্ত।

হাসান ফেরদৌসের উপন্যাসটি প্রবহমান সমকালীনতায় দারুণভাবে ঋদ্ধ। এর শুরুতেই আমারা মানসকে প্রাণপণে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে দেখি। সেই জ্ঞানশূন্য দৌড়ের পরম্পরা আজও প্রবহমান—কুমিল্লা, নোয়াখালী ও রংপুরের পীরগঞ্জে ধর্মান্ধ পাশবিকতা বাঙালিসত্তাকে আজও রগড়ে দেয়। ছি!

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন