default-image

বইমেলা এলেই কিছু চিরায়ত ঘটনা ঘটে—দৈনিক পত্রিকার ভেতরে কিংবা শেষ পাতায় স্টল নির্মাণ কার্যক্রমের ছবি থাকে, ক্যাপশনে লেখা হয় ‘মেলা প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি’। স্টলের কাঠের ওপর হাতুড়ি ঠোকার খটখট শব্দের সঙ্গে ‘আর কদিন পরই শুরু হচ্ছে প্রাণের মেলা বইমেলা’—এ রকম কথার মাধ্যমে প্রতিবেদন শুরু করে টিভি চ্যানেলগুলো। মেলা শুরু হয়ে গেলে অনুষ্ঠানশূন্যতায় ভোগা টিভি চ্যানেলগুলোর বিকেলের চাঙ্ক পূরণ করতে প্রতিদিন চলে ‘বইমেলা লাইভ’। ছুটির দিনে পত্রিকার প্রথম পাতায় ছবি—বইয়ের পাতার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে শিশু। সব দেখে মনে হয়, জাতীয় জীবনে আমাদের অর্থাৎ বইদের গুরুত্ব অপরিসীম। যদিও আমার ধারণা ভিন্ন। আমাদের গুরুত্ব, আলোচনা—সবই আছে, তবে এক মাসের জন্য। বইমেলা শেষ তো আমাদের নিয়ে আলোচনাও শেষ। বুকশেলফের তাকে বসে বসে আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি, নতুন চলচ্চিত্র, নতুন গান মুক্তি পেলে ড্রয়িংরুমের দেয়ালে ঝোলানো টিভির সংবাদে সেটা স্থান পায়। কিন্তু আমাদের কোনো নতুন সদস্য বাজারে এলে কোনো খবরই থাকে না।

দিনের পর দিন বুকশেলফেই বন্দী আমরা, কেউ ধরে বাইরে এনে নেড়েচেড়েও দেখে না। সময় কাটাতে তাই শুরু করলাম আন্তবুকশেলফ বিতর্ক। শুরুতেই আমার পাশের মুরব্বি প্রবন্ধের বই আক্ষেপ করে বললেন, ‘আজকাল আর আমাদের সেই কদর নাই। আগের মতো আমাদের আর কেউ পড়ে না।’ সঙ্গে সঙ্গে ডানে-বাঁয়ে নড়ে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করল তরুণ উদীয়মান উপন্যাস। উপন্যাস আর প্রবন্ধের চাপে পিষ্ট আমি হাঁসফাঁস করতে লাগলাম। এ দুটো খুব যন্ত্রণা করে। এরা আমার পাশে আসার আগে আমি ছিলাম সৈয়দ মুজতবা আলীর একটা বইয়ের সঙ্গে। খুব শান্তিতে ছিলাম তখন। যা হাসাতে পারত বইটা! তো, তার কাছ থেকেই জেনেছিলাম, আগেও আমাদের খুব বেশি কদর ছিল না। বাঙালি আগেও বই পড়ত না। সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেও বই পড়ানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হতাশার সুরে লিখেছেন, ‘আর কত বলব? বাঙালির কি চেতনা হবে?’ লেখকের তুমুল বিরক্তি প্রকাশ পায় দু–এক লাইন পরেই, ‘এ রকম অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমি ভূ-ভারতের কোথাও দেখিনি। জ্ঞানের তৃষ্ণা তার প্রবল, কিন্তু কেনার বেলায় সে অবলা। আবার কোনো কোনো বেশরম বলে যে “বাঙালির পয়সার অভাব।” বটে? তা কোথায় দাঁড়িয়ে বলছে লোকটা এ কথা? ফুটবল মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে? না সিনেমার টিকিট কাটার “কিউ”থেকে?’

বিজ্ঞাপন

কথাগুলো আজও মনে পড়ে। ইশ্‌! সেকালে এত এত গুণী লেখক থাকার পরও লোকে আমাদের পড়ত না। এখন তো দেশে আগের মতো লেখকই নেই, পাঠক আসবে কোত্থেকে? সেটা বলার চেষ্টা করলাম কোনোমতে, ‘যখন ফেসবুক-টেসবুক কিছুই ছিল না, তখনই আমাদের কিনত না মানুষ, এখন কিনবে কোন দুঃখে?’

‘না কেনাই ভালো।’ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল একটা কবিতার বই, ‘এমনিতেই খুব চাপের মধ্যে আছি। উপন্যাসটা যা মোটা, একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়েছে। আমি একটা কবিতার বই, আমি থাকব খোলামেলা জায়গায়! এত চাপের মধ্যে কাব্যচর্চা হয় নাকি?’

‘এখনো উপহার হিসেবে ডিনার সেট আর শোপিসের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারলাম না। এ জীবন রেখে কী লাভ?’ হতাশ হয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ার চেষ্টা করল একটা মোটিভেশনাল বই।

‘এই খবরদার!’ ধমকে উঠল ভ্রমণকাহিনি, ‘তুই প্রায়ই বুকশেলফ থেকে মাটিতে পড়ে যাস। এতে কিছু হয় না, শুধু বাঁধাইটাই ঢিলা হয়ে যায়। বাঁধাই ঢিলা বই আমার একদম পছন্দ না। মানুষ বই কিনলে কিনুক, না কিনলে না কিনুক, তোর কী? তুই চুপচাপ থাক।’

‘তবে এত কিছুর পরও তো মানুষ বই কিনছে।’ পাশ থেকে কথাটা বলে একটু নড়েচড়ে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করল প্রবন্ধের বইটা, ‘প্রতিবছরই বাড়ছে বইয়ের বিক্রি।’ ‘বাড়বেই তো।’ বলল উপন্যাস। ‘কেন বাড়বে না? নতুন নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হচ্ছে। সেসব বাড়িতে উঠছে নতুন নতুন বুকশেলফ-শোকেস। সেগুলো ভরানোর জন্য বই তো কিনতেই হয়। একবার বুকশেলফ ভরে গেলে পরে
বইমেলায় গিয়ে বই নেড়েচেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা যায়, “কিনতাম, কিন্তু বাসায় আর জায়গা নেই, থাক।”’

‘তবে যাই বলো’, সমাপনী বক্তব্য দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম আমি, ‘বই পড়ুক আর না পড়ুক, মানুষ বই কিনবেই। অন্তত ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে লাভ পেতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগের পাশে রাখার জন্য হলেও তো একটা–দুটো বই প্রয়োজন। কী বলো?’

কোনো জবাব পেলাম না। চারপাশটা কেমন শূন্য লাগছে। কাউকেই তো অনুভব করতে পারছি না। ব্যাপারটা কী? কেমন যেন একটা নরম জায়গায় এসেছি মনে হচ্ছে। বিছানা নাকি? এখন কি ছবি তুলবে আমার? বাহ! নিশ্চয়ই অনেক লাইক পাবে ছবিটা।

হঠাৎ আমার ওপর চড়ে বসল কে যেন! চিৎকার করে উঠলাম! ‘আরে থাম থাম, আমি!’ বলে উঠল উপন্যাস। ‘তুমি?’ আমি তো অবাক। ‘সঙ্গে প্রবন্ধ, কবিতাও আছে।’

‘তাই নাকি? আমরা কোথায়?’

‘সেটাই বুঝতে পারছি না।’

বিজ্ঞাপন

বোকার মতো চুপচাপ মলাট খুলে পড়ে রইলাম আমরা। অনেক দিন পর রোদ পড়ল গায়ে। ভালোই লাগছিল। হঠাৎ শুনলাম বিকট গলায় ‘পুরান বইখাতা বিক্রি কাগোইজ!’ বলে চিৎকার করে উঠল কে যেন।

‘সেকি!’ চিৎকার করে উঠল উপন্যাস, ‘আমাদের তো বেচে দিয়েছে!’

‘আগেই বলেছিলাম! মুরব্বির কথা বাসি হইলেও ফলে।’ বলল প্রবন্ধ।

আমি আর নিতে পারলাম না। এত দিন যে শেলফে ছিলাম, এভাবে সেখান থেকে বিনা নোটিশে বের করে দিল আমাদের! সেখানে হয়তো আসবে নতুন কোনো বই। কিন্তু আমাদের কী হবে?

কবিতার দেখি এসব ভাবনা নেই। সে সূর্যের আলো পেয়েই খুশিতে ‘আলো আমার আলো’ টাইপের কী কী যেন বলছে বিড়বিড় করে। ঝালমুড়ির ঠোঙা হলেও বোধ হয় ওর কোনো দুঃখ নেই!

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন