যে বছরগুলোতে বইয়ের পসরা বসেনি

করোনা পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারিতে না হয়ে এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা হচ্ছে মার্চ মাসে—১৮ মার্চ থেকে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পরপরই বইয়ের বিকিকিনির মেলা শুরু হয়। একসময় বাংলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় আনুষ্ঠানিক সূচনার পর নতুনভাবে প্রাণ পেয়ে তা এখন জাতীয় বইমেলার রূপ পেয়েছে। তবে ১৯৭৫ সালে সপরিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর কয়েক বছর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল লেখক-প্রকাশকের আড্ডাহীন। রক্তাক্ত পঁচাত্তরের জঘন্য হত্যাযজ্ঞের পর দেশে যে অস্থিতিশীলতা শুরু হয়, তার রেশ ধরে ১৯৭৬ থেকে ’৮০ পর্যন্ত বইয়ের বিকিকিনির কোনো আসর বসেনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। যদিও তাতে বইমেলার দীপ্র চেতনা কখনো থেমে যায়নি।

এই লেখায় ইতিহাসের নিরিখে বইয়ের বেচাকেনা তথা বইমেলার পূর্বপ্রেক্ষাপটসহ ১৯৭৬ থেকে ’৮০ পর্যন্ত কেন বাংলা একাডেমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবেও বইয়ের পসরা বসেনি, অনালোচিত সে বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে প্রয়াসী হব।

বাংলাদেশের বইমেলার কোনো নির্ভরযোগ্য ও তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস বা বিবরণ এখনো লেখা হয়নি। এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস লেখার জন্য তথ্যনিষ্ঠ গবেষণা খুব জরুরি বলে মনে করি। বইপত্র নিয়ে আড্ডা কিছুটা হয়েছে বিগত শতকের পাঁচের দশকে। তখন সাহিত্যের জমজমাট আড্ডা হতো পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর মাসিক সাহিত্য পত্রিকা সওগাত ও সাপ্তাহিক বেগম অফিসে। এই দুই পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ও সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বনামধন্য পৃষ্ঠপোষক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন আড্ডাপ্রিয় লেখকদের আহারাদি ও চা-বিস্কুটও জোগাতেন। কিন্তু তখনো বইমেলার ধারণাটি আমাদের এই পূর্ব বাংলায় আসেনি। এলে সাহিত্য-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ এই উদ্যোক্তা কাজটি করতেন বলে মনে করি। তবে ঘরে ঘরে যাতে বই পৌঁছে যায়, সে জন্য কী করা যেতে পারে—এমন আলোচনা করতে শুনেছি। এটি প্রথমে কোথায়, কীভাবে শুনতে পেয়েছিলাম, সে কথা এখানে বিবৃত করা যাক। আর এর সূত্র ধরেই হয়তো পাওয়া যাবে বইমেলার ইতিহাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটও।

বিজ্ঞাপন

তখন ১৯৬০ সাল। পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণের এক উন্মাতাল সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এর এক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি আমি। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র বলে বাংলা একাডেমি আয়োজিত সভা-সমিতিতে নিয়মিত যাই। আজ আর ঠিকঠাক দিন-তারিখ মনে নেই। তবে সাল তো বলেছি—১৯৬০। একাডেমির সভায় সেদিন সভাপতি ছিলেন প্রাবন্ধিক ড. কাজী মোতাহার হোসেন।

সভাপতির বক্তৃতায় তিনি দুটি বিষয়ে কথা বলেছিলেন: এক. ‘পূর্ব বাংলায় উৎকৃষ্ট বাংলা গদ্য সাহিত্যের অভাব আছে। আমরা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উন্নত মানের প্রবন্ধ পাই না।’ দ্বিতীয়টি বলেছিলেন, ‘লেখাপড়া জানা বাঙালি মুসলমান ঘরেও বই দেখা যায় না। বাঙালি মুসলমান ঘরে শুধু দুখানা বই মাঝেমধ্যে দেখা যায়। একখানা মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধু ও অন্যটি মোহাম্মদ নজিবর রহমানের আনোয়ারা। তবে আমার মনে হয়, সাহিত্যরস উপভোগের জন্য ধর্মীয় অনুষঙ্গে বই দুখানি ধর্মগ্রন্থের পাশেই থাকে। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ সাহিত্যগ্রন্থ বা ওই দুখানি বইয়ের সামাজিক তাৎপর্য বোঝানোর জন্য যদি কার্যকর অন্য কোনো উপায় বের করা যায়, তাহলেই শুধু গ্রন্থপাঠ আমাদের সমাজে বাড়তে পারে।’

এই বক্তব্যে মনীষী চিন্তাশীল লেখকের মনের পশ্চাতে অস্পষ্টভাবে যা সুপ্ত রয়েছে, সেটাই বুঝি বইমেলা।

default-image

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেই বইমেলা প্রথমে আয়োজনের উদ্যোগ নিতে দেখি ঢাকার সোভিয়েত দূতাবাসকে—১৯৫৭ সালে। মেলাটির উদ্বোধন করেছিলেন পূর্ব বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান। এ তথ্যটি লিখেছেন গবেষক খান মাহবুব। এরপরে শিশুদের লেখাপড়া এবং তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত পাঠোপকরণ নিয়ে তৎকালীন পাবলিক লাইব্রেরিতে বইমেলা হয় ১৯৬৪ সালে। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে শিশু গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সেই সময়ের পরিচালক, কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদ্দীন। এরপর তিনি বইমেলা করেন পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিল ভবনে (বর্তমান শিল্পকলা একাডেমি) ও নারায়ণগঞ্জে। ১৯৭০ সালে এই দুই মেলার পর ইউনেসকো ঘোষিত গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বইমেলারও সূচনা ঘটে সরদার জয়েনউদ্দীনের হাতে—১৯৭২ সালে। বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ২০-২৭ ডিসেম্বর সাত দিনব্যাপী এই বইমেলার আয়োজন করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। এটি ছিল আন্তর্জাতিক বইমেলা। বিখ্যাত হিন্দি লেখক মুলকরাজ আনন্দ ও পশ্চিম বাংলার মনীষী লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় এখানে অতিথি হিসেবে যোগ দেন। আর মেলাটি উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

১৯৭৩ সাল থেকে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা, স্ট্যান্ডার্ডস পাবলিশার্সের রহুল আমিন নিজামী ও বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পাটি বিছিয়ে বইয়ের পসরা নিয়ে বসতেন। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি যে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন করে, তাতে একাডেমি প্রকাশিত বইপুস্তক টেবিলে সাজিয়ে প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়।

তবে ১৯৭৫-এ বাংলা একাডেমিতে কোনো বইমেলা হয়নি। কিন্তু বাংলা নববর্ষে মুক্তধারা বইয়ের স্টল দিয়েছিল।

১৯৭৬ সালের ভাষার মাসে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ছয় দিনব্যাপী এক শিশু-কিশোর গ্রন্থমেলার আয়োজন করে বটে বাংলা একাডেমি, কিন্তু মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহাসহ অন্য প্রকাশকেরা একাডেমি প্রাঙ্গণে যে পাটি বিছিয়ে বইয়ের পসরা নিয়ে বসতেন, এ সময় থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তা আর হয়নি। শেখ মুজিবের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর গোটা দেশ ছিল অস্থির ও অস্থিতিশীল। সেই অর্থে তখন মানুষের মনে কোনো শান্তি ছিল না। সরবে ও নীরবে আঘাত এসেছিল প্রকাশক, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীদের ওপর। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসসহ অনেক লেখককে এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা দপ্তরে ডেকে নেওয়া হয় বেশ কিছু লেখককে। ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে লেখক-প্রকাশকেরা যে আড্ডা জমাতেন, সেই ধারায় ছেদ পড়ে কিছুদিন।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য ড. আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ার পর, সম্ভবত ১৯৮১ সালে, একুশে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানমালার মধ্যে এক পাশে টেবিল পেতে শুধু একাডেমির বই বেচাকেনার আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু এটাকে কোনোভাবেই বইমেলা অভিধা দেওয়া যায় না। সাতের দশকে লেখক-প্রকাশকদের বইয়ের পসরা নিয়ে বসার যে উদ্যোগ, তা ছিল অনানুষ্ঠানিক। তাই এই প্রচেষ্টাকে বড়জোর বাংলাদেশে বইমেলার আঁতুড়ঘর হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

বাংলা একাডেমিতে পরিকল্পিত বইমেলার সূচনা ঘটে ১৯৮৪ সালে, মনজুরে মাওলার সময়ে। আর আমি যখন মহাপরিচালক ছিলাম, ওই সময় বইমেলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়ে একুশ থেকে স্বাধীনতার চেতনায় বিস্তার লাভ করে।

বইমেলা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক। প্রায় এক বছর ধরে চলছে করোনার রাহুগ্রাস। তবু আমরা মেলা বন্ধ করিনি। বাঙালির জনসাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তার অভীষ্ট লক্ষ্য স্বাধীনতার মাসের দীপ্র চেতনার সঙ্গে, এ-ও বড় স্বস্তির ব্যাপার।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন