চারপেয়েদের দলে

অলংকরণ: আরাফাত করিম

আমার বয়স তখন ১০–১২ হবে। পুরান ঢাকার চকবাজারে আমার দাদুবাড়িতে থাকতাম। আমাদের পাড়ায় তখন অনেক বিড়াল দেখা যেত। বাড়ির ছাদে, অলিগলিতে, দেয়ালের কার্নিশে লাল, সাদা, কালো—হরেক রকমের বিড়ালের সমাবেশ ঘটত প্রতিদিন। পুরান ঢাকার বাসাগুলো একটা আরেকটার লাগোয়া। তাই বিড়ালগুলো সহজেই এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে আসা-যাওয়া করতে পারত।

আমি বিড়াল খুব পছন্দ করতাম। শখের বশে প্রায় প্রতিদিনই বিড়ালগুলোকে কিছু না কিছু খেতে দিতাম। ওরাও বেশ চালাক। রোজ বিকেলে বাড়ির ছাদে এসে জড়ো হতো আর ম্যাও ম্যাও শব্দে জানান দিত নিজেদের আগমনের খবর। আমিও দুপুরের খাবার থেকে বেঁচে যাওয়া মাছের কাঁটা, কখনো–বা আস্ত একটা মাছই তুলে দিয়ে দিতাম ওদের। বেশ কদিন মাকে না জানিয়ে বাটিতে করে দুধও দিয়েছিলাম। এমন করে ওদের সঙ্গে বেশ ভাব জমে গিয়েছিল। মোট আটটি বিড়াল ছিল। ওদের মধ্যে কোনোটা ছিল অলস, কোনোটা একটু চালাক, কোনোটা আবার মাস্তান-টাইপ।

এক রাতের কথা। কেমন একটা খসখস শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ শুনেই বুঝতে পারলাম, ছাদ থেকে আসছে শব্দটা। প্রথমে কিছুটা ভয় লাগল। আবার কৌতূহলও হলো—কিসের শব্দ, তা জানার জন্য। শেষে কৌতূহলের জয় হলো। ছোট্ট একটা টর্চলাইট নিয়ে চুপিচুপি গিয়ে ছাদের দরজা খুললাম।

একে একে সব বিড়ালের দৃষ্টি আমার দিকে ঘুরে গেল। আমি তখন ভয়ে কাঠ। হঠাৎ বড় বিড়ালটিও ম্যাও ম্যাও করে উঠল, ‘এত দেরি করে মিটিংয়ে এলি কেন?’

পূর্ণিমার রাত। আকাশে ইয়া বড় চাঁদ। চাঁদের আলোর কাছে টর্চের আলো নেই হয়ে গেল। তাই টর্চটা পকেটে পুরে ছাদে পা রাখলাম। দুই কদম যেতেই চোখ ছানাবড়া। বিড়াল তো এক-দুটি নয়, শ খানেক! ছাদজুড়ে বসে আছে ওরা! ভিড়ের মধ্যে একটা কাঠের বাক্সের ওপর সাদা রঙের একটা বড়সড় বিড়াল বসে আছে। ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝলাম, বিড়ালটা আমাদের এলাকার নয়। এত বড় আর লোমশ বিড়াল আগে কখনোই আমার চোখে পড়েনি।

হঠাৎ দেখি, একটা বিড়াল আমার দিকেই চেয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই ম্যাও করে উঠল। অথচ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, বিড়ালটা বলছে, ‘এতক্ষণে এলি?’

একে একে সব বিড়ালের দৃষ্টি আমার দিকে ঘুরে গেল। আমি তখন ভয়ে কাঠ। হঠাৎ বড় বিড়ালটিও ম্যাও ম্যাও করে উঠল, ‘এত দেরি করে মিটিংয়ে এলি কেন?’

ওর কথা শেষ হতে না হতেই কানে প্রচণ্ড ব্যথা টের পেলাম। দেখি, একটা বিড়াল আমার কান কামড়ে ধরেছে। হাত দুটির দিকে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলাম। বিশাল নখ আর লোমশ এই হাত তো আমার নয়। ও মা! একটা লেজও দেখা যাচ্ছে! কিছু না ভেবেই লেজটা ধরে একটা টান মারলাম। প্রচণ্ড ব্যথায় মাথা ঘুরে গেল। তার মানে লেজটা আমারই! ততক্ষণে দেখি, আরও দুটি বিড়াল থাবা উঁচিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আর থাকতে পারলাম না। উল্টো ঘুরে ছুট লাগালাম চার পায়ে। একেবারে ঘরের ভেতর ঢুকে তবে থামলাম। মাথার ঘাম মুছতে গিয়ে দেখি, আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে হাত দুটি। যাক বাবা, বাঁচা গেল!

এখনো মাঝেমধ্যে আমাদের ছাদে বিড়ালদের সভা বসে। আমি কী করে যেন বুঝতে পারি। তবে গিয়ে দেখে আসার সাহস আর হয় না!