বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এরপর তাঁর অভিযান গাবতলীতে। সাহ্​রি করেই চললেন গাবতলী। কোনো না কোনোভাবে টিকিট জোগাড় হলো। চললাম আমরা রংপুরের গাড়িতে। সকাল সাতটার বাস পৌঁছাল রাত একটায়। তবু অতঃপর বাড়ি পৌঁছাতে পরলাম। তবে এই পথের বিড়ম্বনার কথা আর কী বলব! আরিচা ঘাটে গিয়ে দেখা গেল, ফেরি নেই। সেই ফেরি কোনো দিন আসবে কি না, কেউ জানে না। রোদের ভেতর পুড়ছি, বৃষ্টিতে ভিজছি। কিন্তু সমস্যা ছিল বাথরুম। পুরো ঘাটে কোনো ভালো ওয়াশরুম ছিল না। আজিকার শিশু, তোমরা যখন এই কাহিনি পড়িবে, তখন আমাদের দুঃখের বিন্দুবিসর্গও বুঝিবে না। এমনও হইত, আমরা নৈশকোচে উঠিয়া আরিচা বা নগরবাড়ি ঘাটে সারা রাত বসিয়া আছি, খোলা আকাশের নিচে; ফেরির কোনো খবর নাই। খাওয়া নাহয় ঘাটের হোটেলে সারিলাম, কিন্তু প্রকৃতির ডাকে যাইব কোথায়! পুরুষেরা তবুও জঙ্গলে-ধানখেতে কিছু একটা উপায় করিয়া লইলেন, নারীকুল কী করিবেন? এই জন্যই মনে হয়, ডায়াপার পরে বের হলে ভালো। ২৪ ঘণ্টার অবর্ণনীয় কষ্ট—বাস একটু এগোয়, তারপর আর এগোয় না, ইফতার হলো পথেই কোথাও। যে সময়ের কথা লিখছি, তখন মুঠোফোনের যুগ নয় যে বাসায় আগে থেকে খবর দেব; আম্মা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন! ‘টুটুন–লিটুন–মিটুন (আমাদের ডাকনাম) কি এবার ঈদে আসতে পারল না!’ ২৯ রোজার সকালে রওনা দিয়েছি। বাসেই খবর পাওয়া গেল, পবিত্র শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেছে! কাল ঈদ! ঈদের নামাজ কি এবার তাহলে পথেই পড়তে হবে?

রাত একটার সময় বাস রংপুরে পৌঁছাল। রিকশা নিয়ে দুই ভাই বাড়িতে যাচ্ছি। পরিচিত পথঘাট। কিন্তু সুনসান। সেই জিএল রায় রোড, জাহাজ কোম্পানির মোড়, পৌরবাজার, পুলিশ লাইন, কালেকটরিয়েট ময়দান, কাচারিবাজার, জিলা স্কুল, ডিসির বাড়ি, সার্কিট হাউস, এসপির বাড়ি, বিএড কলেজ, ধাপ লালকুঠির মোড়, কটকিপাড়া। পথে কুকুর ছুটছে। একটা–দুটো রিকশার টুংটাং চলছে। আমাদের সেই বাড়ি ফেরার পথের দুধারে বাংলো আকারের বাড়ি, প্রতিটি বাড়ির সামনে বাগান, বাগানে কামিনী ফুল কিংবা গন্ধরাজ ফুটে বাতাসে ছড়াচ্ছে সুবাসের মদিরা। শ্যামাসুন্দরী খালের কচ্ছপের পিঠের মতো পুল পেরিয়ে কাঁঠালগাছের নিচে টিনে ছাওয়া আমাদের বাসা। দোরঘণ্টি বাজাতেই আম্মা শাড়ি সামলাতে সামলাতে এসে দরজা খুললেন, ‘লিটুন–মিটুন আসছিস? আয়, হাতমুখ ধো। ভাত টেবিলে দেওয়া আছে!’

আব্বাও উঠে এলেন। তখন তাঁর বয়স ষাট।

আমাদের কালে আব্বা আর আম্মার মুখ দেখাই যথেষ্ট ছিল। এখনকার মতো তাঁদেরকে আমরা আলিঙ্গন করতাম না, কিন্তু ওই মধ্যরাতে ঘুমভাঙা চোখ নিয়ে আম্মা, বড় আম্মা আর আব্বা যে মৃদু হাসি দিতেন, আজ এক কোটি টাকা দিয়েও তো সেই হাসি আমরা আর কোথাও পাব না।

তখনো জানতাম না, পরের ঈদেই আব্বা আর থাকবেন না, আমার প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে আব্বা মারা যাবেন, মামার সঙ্গে বিআরটিসি বাসের শেষের সিটে বসে আবারও রংপুরে আসতে হবে আমাকে, আসতে পারবেন না মেজ ভাই। তাঁর পরের দিনই পরীক্ষা।

এর পর থেকে রংপুরে ঈদের দিনে নামাজ সেরে আমাদের প্রথম কর্তব্য ছিল মুন্সিপাড়া কবরস্থানে যাওয়া। আব্বার কবর জিয়ারত করা।

আম্মা যত দিন বেঁচে ছিলেন, (তিন বছর আগে তিনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন), আমরা প্রতিবছর অন্তত একটা ঈদে সব ভাই-ভাবি, বোন-দুলাভাই, বউ-ছেলেমেয়ে—সবাই মিলে রংপুর যেতাম। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রংপুরে যাওয়া—প্রথম দিকে একই রকমের কষ্টকর ছিল সেই যাত্রা। ট্রেনে গেলে বাহাদুরাবাদ ঘাটে দৌড়, গিয়ে দেখো ইস্টিমার নেই; বাসে গেলে চন্দ্রা কালিয়াকৈরের যানজট। বাচ্চাদের ডায়াপার ফেলাটাও তখন একটা কাজ হয়ে দাঁড়াত।

এখন আম্মা নেই। আব্বা নেই। বড় আম্মা নেই। মুন্সিপাড়া কবরস্থানে রয়েছে তাঁদের কবর। আমাদের আর অনেক দিন একসঙ্গে রংপুর যাওয়া হয় না।

এখনকার ছেলেমেয়েরা কি সেই কষ্ট বুঝবে? ঈদযাত্রায় বাড়ি ফেরার পথে এখনো যানজট আছে, কিন্তু রাস্তার ধারে হাইওয়ে রেস্তোরাঁ আর রিসোর্ট হয়েছে, যমুনা সেতু হয়েছে। সৈয়দপুরে সব এয়ারলাইন্সেরই রোজ দুটো করে ফ্লাইট।

আর এখনকার ছেলেমেয়েরা—তারা হয়তো বুঝবে না সেই আনন্দটুকুও। অনেক কষ্টের পর মধ্যরাতে দোরঘণ্টিতে হাত দিয়ে ডেকে ওঠা: আম্মা আম্মা...

ঘুমভাঙা গলায় আম্মার সেই চিরাচরিত সংলাপ, ‘লিটুন–মিটুন আসছিস! হাতমুখ ধুয়া খাইতে বস।’

সবই আজ স্মৃতি, আহা রে!

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন