default-image

দোতলা ছোট বাড়ি, মাঝখানে একটা সরু উঠান। ঘরগুলো সব অচেনা লাগে, নিচতলার শেষ মাথায় গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি নদী, থিকথিকে তেল, কালো পানিতে মাছির মতো ভিড় করে নৌকা। একটা ছোট লঞ্চ পানিতে উল্টানো, ভাসছে। ১, ২, ৩...করে ৩৪টা তাজা লাশ গুনি! কলিংবেল বেজে ওঠে। ছুটে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি, বেডরুমে স্যুটকেস গুছিয়ে বসে আছে প্রেমিকা, বিদায়ের চাইতে অসহ্য কোনো মুহূর্ত আছে নাকি! একটা ফোঁটা পড়ে চোখ থেকে...টুপ, অ্যানিমেটেড বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।

বিছানা ছেড়ে স্যুটকেস হাতে উঠে দাঁড়ায় সে। বলে, ‘ভালো থেকো’। আমি আঁকড়ে ধরতে যাই, হাত খুলে চলে আসে আমারই আরেক হাতে। পুরোনো বন্ধুরা বিদায় নিতে আসে একে একে। সিঁড়ি বেয়ে ছুটে যাই নিচতলায়। আবার খুঁজি নদীটাকে। দরজা খুলতেই দেখি অনেক দিনের চেনা বয়াতি ভাই দাঁড়িয়ে পাশে, পল্টুনের মতো আস্ত বাড়িটা হঠাৎই ঘুরে যায় টাগবোটের মতো। ছুটে যায় রাস্তা, শহর, অনেক দূরে। পানিতে ঝপাস শব্দ, ফিরে দেখি বয়াতি ভাই নেই...পানির এক হাত নিচে তাঁর ক্লান্ত শরীর প্রাণান্তকর ছুটছে ছেড়ে যাওয়া শহরটা ধরতে। দরজা ফেলে দৌড়ে উঠে যাই সিঁড়ির দিকে, দেখি মায়াবী ভেজা শরীরে ‘রাজার ঝি’ কবরী। অলস পায়ে কলস হাতে তিতাসের পাড়ে, যেন কোনো তাড়া নেই আর, ওপরে ওঠার! ফজরের আজান ভেসে আসে, আস্তে আস্তে জানালায় শ্লেটের মতো ছাই হয়ে আসছে আকাশ; ঘুমচোখেই ফোন করি বয়াতি ভাইকে। নিরস শব্দ ফিরে আসে, ‘দুঃখিত, কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ শঙ্কা জাগে মনে, আগেও হয়েছিল এ রকম আরেকবার। যাঁকে ফোন করেছিলাম, তিনি আর কোনো দিন ফোন ধরবেন না এই পৃথিবীতে।

বিজ্ঞাপন

ঘুম ঘুম চোখে সম্পাদনার টেবিলে গিয়ে বসি। চুরানব্বই বছর বয়সী দাদুর চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের ভরাট রেকর্ডিং বাজে কানে, ‘আমাদের একেকজন সুহৃদের মৃত্যুতে আমাদেরও একেকটা অধ্যায়ের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু আমরা যখন বেঁচে থাকি, এমনভাবে বাঁচি...যেন চিরকালই বেঁচে থাকব! অথচ মৃত্যু কী সহজ! নিঃশব্দে আসে, আমাদের কোনো প্রস্তুতি না দিয়েই।’ চোখের সামনে খোলা শিকলবাহার স্ক্রিপ্ট, মাথায় ঘোরে মিষ্টি মুখের রাজার ঝি। কসাইয়ের মতো কাচি চালাই কি–বোর্ডে, ‘মৃত্যু তো জীবনেরই এক অনন্য উদ্ভাবন। মৃত্যু তো একদিন সূর্যেরও হবে, তোমরা আমাদের মৃত্যুকে না, আমাদের জীবনকে উদ্​যাপন করো…নতুন আসবে বলেই জীবন জীবিত থাকে, মৃত্যু মারা যায়…।’ কাচির ছাঁটে ছিটকে পড়ে প্রিয় কণিকা। আরেকবার পড়ি, ‘তপন উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়/ তবু প্রভাতের চাঁদ শান্ত মুখে কয়/ অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে/ প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে।’ কিন্তু এ কেমন উদ্​যাপনহীন মৃত্যু বিশ্বজুড়ে, হাজারে–হাজার, এ কার মহিমা! লাতিন উপন্যাসের মতো দেশে দেশে এ কোন ঘোরলাগা সময়; নাম–গোত্রহীন সংখ্যা শুধু, আলো-অন্ধকারে অস্থির পত্রিকার পাতায়, এ কোন অপেক্ষাহীন উদ্​যাপন নিঃশব্দ বিদায়ের কাফেলায়, এ কোন কারবালা!

মার্কেজের ১০০ বছরের নিঃসঙ্গতা ঝেঁপে আসে। মগজের কেমিক্যাল লোচায়, বাঁশখালীতে, সালথায়; মগজের ডান-বাম সব একাকার হয়ে যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে একফালি রক্ত এসে পড়ে ফেসবুকের উপত্যকায়। বসার ঘর পার হয়ে টাইমলাইন স্ক্রল করে চলে যায় ক্লান্ত রাস্তায়, একটা লাল দাগ হয়ে চলে যায় সারি সারি রিকশা, আর উঁচু–নিচু ফুটপাত ছাড়িয়ে। প্রোফাইল-প্রোফাইল খেলায় রং ছিটাই, কাভার থেকে বচসা চত্বর ঘুরে আমিও আবাহনী-মোহামেডান ভুলে এখন ট্রেন্ডিং ইউরোপিয়ান ফুটবল লিগ দেখি। এই ফাঁকে লাল রক্তের দাগ চৌরাস্তা পার হয়ে যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে হাটহাজারী, এক ডজন লাশ ডানে ফাঁস হয়ে প্রাক্তন বামের ঘর ঘুরে ঢোকে আমাদের ‘মাকোন্দো’র কোনো ‘বুয়েন্দিয়া হাউস’-এ। ভারী বার্মাটিক দরজার তলা দিয়ে, হাল ফ্যাশনের প্রসাধনকক্ষের ছায়া মাড়িয়ে দেওয়াল ধরে এমনভাবে দাগ টেনে চলে মিডিয়াপাড়া, যেন কোনোভাবেই পঞ্চাশ বছরের পুরোনো এই দামি শতরঞ্জিতে দাগ না লাগে। সব অবজ্ঞা করে লাল রক্ত চলে যায় কোনো ডাইনিং টেবিলে। তারপর কারও গাড়ি-বারান্দার ওপর বাগানবিলাসের ঝাড়ে, পুরোনো আরামকেদারার আড়ালে অঙ্ক করার ফাঁকে খাবার ঘরের ভেতর দিয়ে আইকিয়ার রান্নাঘরে, যেখানে কেক-রুটি রেসিপি হাতে কোনো উর্বশী বসে আছে সেজেগুজে, তিন ডজন ডিম আর একটা সেলফি স্টিক হাতে, আমাদেরই নিঃসঙ্গতার পঞ্চাশ বছরে।

এই যে আমাদের শিরোনামহীন সংখ্যার শবরাত্রি, এরা কি কোনো দিন অতীত হবে না, নাকি! ‘অতীত মানেই মৃত নয়। সত্যি বলতে কি, অতীত বলে কিছু নেই’ বলেছিলেন মার্কেজের গুরু উইলিয়াম ফকনার। নোবেলের মঞ্চে মার্কেজ বলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে একদিন আমার গুরু বলেছিলেন, ‘‘মানুষ ধ্বংস হবে, আমি বিশ্বাস করি না।’’ কিন্তু আমি তাঁর সেই একই জায়গায় দাঁড়ানোর যোগ্যতা হারাব, যদি না মেনে নিই যে ৩২ বছর আগে যে মর্মান্তিক মহাসত্য তিনি মানতে অস্বীকার করেছিলেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আজ সেটা একটা সরল বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনামাত্র।

এই কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে, যা কিনা এত দিন অসম্ভব মনে হতো। আমরা গ্রন্থিকেরা, যারা প্রায় সবকিছুই বিশ্বাস করি, সেই বিশ্বাসের দায় থেকেই মনে করি যে এখন একটা নতুন গল্প বলার সময়, একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরির সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। একটা নতুন জীবনের জয়গান, যেখানে অন্য কেউ ঠিক করবে না, আমরা কীভাবে মারা যাব। যেখানে ভালোবাসা সত্যিকারের ভালোবাসা হবে, আনন্দ হবে আর যেখানে নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ১০০ বছর হারিয়ে ফেলা পৃথিবীর সব দুঃখী মানুষেরা অন্তত একবারের জন্য হলেও আরেকটা সুযোগ পাবে, এই পৃথিবীতেই।’

বিজ্ঞাপন
অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন