default-image

প্রেমিকার গালের কালো তিলের বিনিময়ে বুখারা আর সমরকন্দ নামে দুই শহর লিখে দিতে চেয়েছিলেন পারস্যের কবি হাফিজ। এ ক্ষেত্রে বাঙালি লেখকেরাও কি কম! শুধু শুধু অন্যের রাজ্যের শহর লিখে না দিলেও প্রেয়সীর জন্য কেউ বিরহযাপন করেছেন, কেউ–বা পড়ন্ত বেলায় প্রেমিকার ডাকে সাড়া দিয়েছেন, প্রণয়াবদ্ধ হয়েছেন। বাঙালি লেখকদের প্রেমের দুয়েকটি সত্য গল্প নিয়ে এ লেখা।

মাত্র দশ বছর বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে পাঁচ বছর বয়সী মোহিনীর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের বড়ভাই শ্যামাচরণ। দশ বছর বয়সী বঙ্কিম বিয়ের ব্যাপার-স্যাপার কীই–বা বোঝে! তবু অল্প দিনেই প্রেম হয়ে যায় তাদের মধ্যে। সেই টান এমনই ছিল যে প্রায়ই স্কুল ছুটির পর চার কিলোমিটার দূরের পথ পায়ে হেঁটে তিনি চলে যেতেন মোহিনীকে দেখবেন বলে। ‘বঙ্কিম–জীবনে দুই নারী’ নামে এক লেখায় অনিরুদ্ধ সরকার উল্লেখ করেন, স্কুলের বৃত্তির টাকা পেয়ে মোহিনীর জন্য উপহার কিনে নিয়ে যেতেন বঙ্কিম। বলাই বাহুল্য, কিশোর বয়সে দারুণ প্রেম জমেছিল তাদের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

শুধু বঙ্কিম নয়, বাঙালির প্রেমের অমর ধারাভাষ্যকার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনেও হানা দিয়েছিল প্রেম। বার্মার রেঙ্গুন থেকে যে প্রণয়ের সূচনা, সেই প্রেম আজীবন মনে রেখেছিলেন শরৎবাবু। রেঙ্গুনে এক দুইতলা বাড়ির ওপরতলায় থাকতেন শরৎ আর নিচতলায় থাকতেন এক মদ্যপ মিস্ত্রি। ঘরে ছিলেন মিস্ত্রির মাতৃহারা কন্যা। মিস্ত্রি তাঁর মেয়েকে খুব গালিগালাজ ও নির্যাতন করতেন। দূর থেকে ওই মেয়ের অশ্রুসজল চোখ দুটো পরখ করতেন শরৎ, তাঁর খুব মায়া হতো। একরাতে মেয়েটি দোতলায় এসে তাঁর দরজায় কড়া নাড়লেন। আশ্রয় চাইলে তাঁকে আশ্রয় দিলেন শরৎ, পরে তাঁকে বিয়েও করলেন। সেই মেয়েই শান্তি দেবী। শরৎ খুব ভালোবাসতেন তাঁকে। শরৎচন্দ্রের রেঙ্গুনের বন্ধু লেখক গিরীন্দ্রনাথ সরকার ব্রহ্মদেশে শরৎচন্দ্র গ্রন্থে শরৎকে অভিহিত করেছিলেন ‘মহাস্ত্রৈণ’ বলে। তাঁর ভাষায়, ‘স্বপ্নবিলাসী শরৎচন্দ্রের প্রাণে ছিল অপূর্ব প্রেমের ভান্ডার, তিনি তাঁহার সমস্ত খুলিয়া দান করিয়াছিলেন স্ত্রী শান্তি দেবীকে।’

শরৎচন্দ্র ও শান্তির সংসারের পুত্রসন্তানের জন্ম হয়েছিল। বেশ সুখের সংসার ছিল তাঁদের। হুট করে এক ঝড় এসে সবকিছু তছনছ করে দেয়। প্লেগে দুই দিনেই মারা যান শান্তি ও তাঁর ছেলে। দুটি প্রাণ শরৎচন্দ্রকে বিধ্বস্ত করে ঝরে পড়ে। তাঁর গান গাওয়া, ছবি আঁকা—সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রাণোচ্ছল চেনা শরৎচন্দ্র একেবারেই অচেনা হয়ে গেলেন। পরবর্তীকালে হিরন্ময় দেবীর সঙ্গে বাকি জীবন কাটালেও শান্তিকে তিনি কখনো ভুলতে পারেননি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবী মারা যান অল্প বয়সেই। স্ত্রীর অকালমৃত্যুতে ভীষণ মুষড়ে পড়েন বিভূতিভূষণ। স্ত্রীর মৃত্যুর কুড়ি বছর পর কৈশোরোত্তীর্ণ এক পাঠিকা রমা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। জানাশোনার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বিভূতিভূষণের প্রেমে পড়েন রমা। হুট করে একদিন বিয়ের প্রস্তাব করে বসেন। তখন বিভূতিভূষণ শার্ট খুলে তাঁর কাঁচাপাকা লোম দেখিয়ে বলেন, ‘দেখো, আমার অনেক বয়স হয়েছে, আর কদিনই বা বাঁচব?’ জবাবে রমা অবলীলায় বলেন, ‘আপনি যদি আর মাত্র একটা বছরও বাঁচেন, তাহলেও আমি আপনাকেই বিয়ে করব।’ এরপর বিভূতিভূষণ আর ‘না’ করতে পারেননি। ১৯৪০ সালের ৩ ডিসেম্বর রমার সঙ্গে আবারও বাঁধা পড়েন সাত পাঁকে। রমা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের সম্পাদিত আমাদের বিভূতিভূষণ বইয়ে এ ঘটনার উল্লেখ করেন।

কথাশিল্পী বিভূতিভূষণের প্রেম পূর্ণতা পেলেও প্রায় তাঁর সমসাময়িক কবি জীবনানন্দ দাশের প্রেম পূর্ণতা পায়নি বলে মনে করেন গবেষকেরা। তাঁর কবিতার মতো তাঁর প্রেমও ছিল রহস্যময় ও আঁধারঘেরা। জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ জীবনানন্দের জীবনে স্ত্রী লাবণ্য ছাড়াও যে গুটিকয় নারীকে আবিষ্কার করেছিলেন, তার মধ্যে মুনিয়া, শচি ও শোভনা অন্যতম। এঁদের মধ্যে শোভনা ছিলেন জীবনানন্দের প্রথম প্রেম। জীবনানন্দ তাঁকে কখনো ভুলতে পারেননি। নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক-এর উৎসর্গপত্রে জীবনানন্দ যে শুধু ‘কল্যাণীয়েষু’ লিখেছিলেন, গবেষকদের মতে তা শোভনাকেই উদ্দেশ করেই। দিনলিপিতে জীবনানন্দ শোভনার নাম লিখতেন ‘বি-ওয়াই’ সংকেতে। প্রথমে সায় দিলেও পরে জীবনানন্দের জীবন থেকে সরে পড়েন শোভনা।

বাঙালি লেখকদের প্রেম আদতেই বৈচিত্র্যময়, যেমনটি দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের বেলায়ও। প্রেমের ক্ষেত্রে তাঁরা দূরে থেকেও কাছে থাকতেন, আবার কাছে থেকেও সরে থাকতেন দূরে। প্রেম তো এমনই রহস্যঘেরা, তাই না!

বিজ্ঞাপন
অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন