default-image

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে তৃতীয় স্ত্রী মার্থা গেলহর্নের সম্পর্ক কোনোভাবেই অন্য স্ত্রীদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। দুর্ধর্ষ সমর-সাংবাদিক মার্থা একজন মানসম্পন্ন লেখিকাও বটে, হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই একাধিক প্রকাশনা ছিল তাঁর। বিয়ের আগে তাঁদের পারস্পরিক মুগ্ধতা ও আকর্ষণের মূল অনুঘটক কী ছিল, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। এটা নিয়ে নানান মত রয়েছে, সাহিত্য ও হেমিংওয়ের পুরুষালি কর্তৃত্বব্যঞ্জক ব্যক্তিত্ব, উভয়ই কারণ হতে পারে। দ্বিতীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি প্রেমিক হিসেবে মার্থার মুগ্ধতা লাভ করলেও স্বামী হিসেবে সে ভূমিকাই হয়তো তাঁদের মধ্যকার বৈপরীত্যকে প্রকট করে তুলেছিল। কারণ, দাম্পত্য জীবনের খুব বেশি সময় তাঁরা একসঙ্গে কাটাননি। যখনই একসঙ্গে হয়েছেন, তাঁদের ভেতরকার পারস্পরিক বিকর্ষণ তত বেশি প্রকট হয়ে উঠছিল। প্রেমিকা ও পরবর্তী সময়ে স্ত্রী হওয়ার পরও মার্থার ব্যাপারে হেমিংওয়ের ছিল ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব। ফলে তাঁদের হয় ‘এক ঘরমে দো পীর’ অবস্থা। মার্থা হেমিংওয়ের অন্য স্ত্রীদের মতো স্বামী-অন্তঃপ্রাণও ছিলেন না। সুতরাং অন্যদের মতো কেবল হেমিংওয়ের স্ত্রী হয়ে থাকাটা ধাতে ছিল না তাঁর। হেমিংওয়ের দোষত্রুটিগুলো মেনে নেওয়ার ব্যাপারেও মার্থার ছিল চরম অসহিষ্ণুতা। প্রেমিকা থাকা অবস্থায় আদর করে যে হেমিংওয়েকে ‘হেমিংস্টেইন’ বলে ডাকতেন মার্থা, বিয়ের পর চলাফেরায় অগোছালো ও অপরিচ্ছন্ন থাকা সেই স্বামীকে ডাকতেন ‘শুয়োর’ বলে। হেমিংওয়ের অতিরিক্ত পানাসক্তি ও অবিশ্বস্ততা মার্থাকে ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিচ্ছিল। সে কারণেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনের বয়স ছিল অন্য তিনটির তুলনায় সংক্ষিপ্ততম।

বিয়ের পরপরই কোলিয়ার্স ম্যাগাজিনের পক্ষ হয়ে মার্থাকে যখন চীন রণাঙ্গনে যেতে হয়, তাঁকে দেখাশোনার জন্যই সঙ্গে গিয়েছিলেন হেমিংওয়ে। সে যাত্রায় বার্মা রোড দেখে রিপোর্ট করার জন্য মার্থাকে রেঙ্গুন পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। তাঁরা উঠেছিলেন বিখ্যাত স্ট্র্যান্ড হোটেলে, আগে বিভিন্ন সময়ে এই হোটেলে থেকেছেন সমারসেট মম, জর্জ অরওয়েলসহ আরও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠিত লেখক। হেমিংওয়ে-মার্থা দুজনেরই নানান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থাকার অভ্যেস আছে, কিন্তু রেঙ্গুনে তাঁদের সময়টা খুব খারাপ কেটেছিল, বিশেষ করে গরম ছিল দুর্বিষহ। সাংবাদিকতার তেমন কোনো কাজ হেমিংওয়ে করেননি সেখানে। তাঁর নিয়োগকর্তা কাগজটিরও অ্যাসাইনমেন্ট ছিল না বার্মায়। তাই লেখালেখি বলতে ছিল প্রকাশক স্ক্রিবনার্সের কাছে চিঠি লিখে নিজের বইয়ের কাটতি সম্পর্কে খোঁজখবর করা। আর মূল কাজের মধ্যে ছিল প্রায় সারা দিন মদ্যপান এবং রেঙ্গুনের বইয়ের দোকানগুলোতে ঘুরে তাঁর নতুন বইটা পাওয়া যায় কি না, যাচাই করে দেখা। বার্মা সফরের যেটুকু সময় তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন, তার বেশির ভাগ কেটেছে প্রকাশ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে। কর্তৃত্বপরায়ণ হেমিংওয়ের কাছে মার্থার এ রকম বহির্মুখী পেশা ছিল অপছন্দনীয়, মার্থাও হেমিংওয়ের মেজাজ ও অহংবোধ একেবারেই সহ্য করতে পারছিলেন না। হয়তো হেমিংওয়ে ঠাট্টাচ্ছলে মার্থাকে খোঁচা দিয়ে কাউকে বলছেন, ‘মার্থা মানবতাকে ভালোবাসে কিন্তু ঘৃণা করে মানুষকে।’ মার্থা সঙ্গে সঙ্গে ছোবল মেরে বলেছেন, ‘মালমসলা তুলে আনার জন্য আমাকে বের হতে হয়। আর্নেস্ট তো স্রেফ ঘরে বসে থাকে...ওর বেশির ভাগ আইডিয়া আসে বেশ্যাপাড়া থেকে।’ (ক্রিশ্চিয়ান গিলবার্টি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ইন রেঙ্গুন, মিয়ানমার, ১০ জুলাই ২০১৯)।

বিজ্ঞাপন

মার্থার মধ্যে হেমিংওয়ের প্রতি বিদ্বেষ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে স্বামীর এক সাংবাদিক বন্ধু উইলিয়াম ওয়ালটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন তিনি। ব্যাপারটা হেমিংওয়ে যে জানতেন না, তা নয়। এমনকি হেমিংওয়ের সন্তান গর্ভে এলে স্বামীর অজান্তে গর্ভপাত করিয়ে ফেলেছিলেন মার্থা। কারণ, তাঁদের দাম্পত্য জীবনের ভাঙনোন্মুখ সময়ে তাঁর সন্তানের মা হতে চাননি তিনি। একজন স্বামীবিচ্ছিন্ন নারীর পক্ষে সন্তানের মা হওয়ার পর নিজের পেশাজীবন বিড়ম্বিত হবে, নষ্ট হতে পারে শারীরিক সৌন্দর্যও—এসব ভবিষ্যৎ বিবেচনাও মার্থার মধ্যে ছিল। এখানে উল্লেখ করা দরকার, হেমিংওয়ের অনিচ্ছার কারণেই তাঁর প্রথম দুই স্ত্রীকে গর্ভপাত করাতে হয়েছিল, অথচ তৃতীয় স্ত্রী মার্থার বেলায় ঘটেছিল ঠিক তার উল্টোটা। ব্যাপারটা পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলেন হেমিংওয়ে, তাই বিচ্ছেদের পর এক বন্ধুকে তিনি বলেছিলেন যে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে মার্থার এতবার গর্ভপাত করাতে হয়েছিল যে ওর আর সন্তান ধারণের ক্ষমতা ছিল না। (সূত্র: জেফ্রি মেয়ার্স, ‘দ্য হেমিংওয়েজ: অ্যান আমেরিকান ট্র্যাজেডি’, ভার্জিনিয়া কোয়ার্টারলি রিভিউ, স্প্রিং ১৯৯৯)।

শারীরিক সম্পর্ক বিষয়ে মার্থার নিরাসক্তিও হেমিংওয়ের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবনের স্বল্পস্থায়িত্বের পেছনের কারণগুলোর একটা হতে পারে। তাঁর বন্ধুদের একজন মন্তব্য করেছেন যে হেমিংওয়ের প্রতি মার্থার ব্যক্তিগত আগ্রহের চেয়ে বেশি ছিল সাহিত্যিক আগ্রহ। তাই লেখক হেমিংওয়েকেই তিনি পছন্দ করেছিলেন, মানুষ হেমিংওয়েকে নয়। তাঁদের মধ্যকার বিয়েও ছিল মার্থার উচ্চাকাঙ্ক্ষার তাগিদে, আবেগের কারণে নয়। বিয়ের যে একটা শারীরিক দিকও আছে, সেটা মার্থার কাছে ছিল গৌণ বিষয়। (সূত্র: জেন হাওয়ার্ড, আ উইম্যান অব দ্য ওয়ার্ল্ড) কিউবাতে নিযুক্ত আমেরিকান কূটনীতিবিদ রবার্ট জয়েসের ধারণা, এইচ জি ওয়েলস কিংবা হেমিংওয়ের মতো বড় লেখকদের সঙ্গে মার্থা ঘনিষ্ঠ হতেন লেখক হিসেবে নিজের অবস্থান মজবুত করার জন্য। হেমিংওয়ের কাছেও পরবর্তী সময়ে মনে হয়েছে যে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা বোধ হয় ভালোবাসার জন্য করেননি মার্থা, করেছেন তাঁর পেশাগত সুবিধার জন্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে আসে হেমিংওয়ে-মার্থার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হওয়া দাম্পত্য সম্পর্ক। মার্থার ভাষায়, বিয়েটা ছিল একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর। পরবর্তী সময়ে লেখা আত্মজীবনীতে মার্থা সাবেক স্বামীর নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি, সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন ইউসি, অর্থাৎ ‘আনউইলিং কম্প্যানিয়ন’ হিসেবে। তাঁর মনে হয়, হেমিংওয়ের সঙ্গে বিয়েটা ছিল এক যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা, তিনি কষ্টই পেয়েছেন কেবল। তবে হেমিংওয়ের স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি মার্থার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পেশাভিলাষও তাঁদের স্বল্পস্থায়ী দাম্পত্য জীবনের জন্য কম দায়ী নয়। সাংবাদিক হিসেবে মার্থার দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারে প্রবল আপত্তি ছিল হেমিংওয়ের, সেসব ঠেকানোর জন্য তাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। অবশেষে ১৯৪৫ সালে তাঁদের বিচ্ছেদের পর মার্থা নিশ্চিত করেছিলেন, তাঁর উপস্থিতিতে হেমিংওয়ের নামটি যেন কখনোই উচ্চারিত না হয়। কারণ, অন্য কারও জীবনের পাদটীকা হিসেবে তিনি থাকতে চান না।’ (পলা ম্যাকলেইন, লাভ অ্যান্ড রুইন)।

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন