স্মৃতি ধারাবাহিক

অল্পস্বল্প দীর্ঘজীবন

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো ডটকমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে লেখক-অভিনেতা-চিত্রকর আফজাল হোসেনের স্মৃতি ধারাবাহিক ‘অল্পস্বল্প দীর্ঘ জীবন’। বিচিত্র এক জীবন পাড়ি দিয়েছেন আফজাল হোসেন। সাতক্ষীরার গণ্ডগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে চারুকলায় পড়েছেন, পত্রিকায় কাজ করেছেন, মঞ্চ কাঁপিয়েছেন একসময়। আর টেলিভিশনে তাঁর জনপ্রিয়তার কথা তো বলাই বাহুল্য। বিজ্ঞাপনের জগতেও আছে তাঁর নিবিড় পদচারণ। আবার লেখক ও চিত্রশিল্পী হওয়ার কারণে লেখক-চিত্রকরদের অনেকের সঙ্গেই রয়েছে অন্তরঙ্গ সখ্য। জীবনের এই সব নানা বর্ণের গল্পগুলো আফজালের কলমে উঠে আসবে এখানে। ৯ জুন প্রথম কিস্তিতে একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল দুটি পর্ব। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় কিস্তি।

তিন

আমি ঢাকায় এসেছিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি হব বলে। আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চাওয়া মানে যে কেউ ভেবে নেবে, ছেলে শিল্পী হতে চায়। তা মোটেও নয়।

ছবি আঁকতে ভালো লাগত খুব। বনে-জঙ্গলে পাখির খোঁজে ঘুরে বেড়ানো, পুকুরে–নদীতে ঝাঁপানো, নৌকা বাওয়া, শিয়াল তাড়ানো—আরও অসংখ্য পছন্দের বিষয় ছিল। লেখাপড়ায় মোটেও মন ছিল না। ছেলেবেলাতে বহু মানুষের এমন স্বভাব থাকে। অনেকে আবার উল্টো স্বভাবেরও হয়।

ছোট ভাইটা আমার চার বছরের ছোট। সে ছিল পড়ুয়া টাইপের। তাকে নিয়ে পরিবারের কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তার চুল আঁচড়ানো থাকত, সব সময় ইস্ত্রির ভাঁজ থাকত কাপড়ে, হাঁটু বা কনুইয়ে ধুলো লেগে থাকত না। তার গায়ের রং ফর্সা। দাদার আভিজাত্যে ঘা লাগতে পারে এমনদের সঙ্গে ওঠাবসা, খেলাধুলাতেও ছিল না সে। তার বইখাতার পাতা থাকত পরিপাটি। সময়মতো স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি থাকত সে। কেবল আমি, আমিই ছিলাম সবার দুশ্চিন্তা, যাতনার কারণ।

আমাকে স্কুলে পাঠানো ছিল সবার জন্য রোজকার কঠিন এক কর্ম। বই নিয়ে বসানো, পড়ানো ছিল আর এক মহাসংগ্রাম। আমার দাদা ছিলেন নামী ডাক্তার। নাম শুনে বাঘ ও গরুকে এক ঘাটে পানি খেতে হয়—এমন গরম মেজাজের মানুষ। কিন্তু আমাকে সেই জনাব কাবু করতে পারছিলেন না।

ইজ্জত রক্ষার জন্য কলকাতা থেকে তিনি কুকুর বেঁধে রাখার ছয়টা শিকল আনালেন। বিশেষ দরকারি কোনো জিনিস কিনতে হলে আমাদের গ্রাম থেকে কলকাতাই কাছের শহর। সকালে চাইলে বিকেল বা সন্ধ্যায় জিনিস বাড়িতে পৌঁছে যায়। শিকল এসে গেল। জোড়া লাগিয়ে ভালোই লম্বা হলো সেই শিকল। তার এক মাথায় আমার পা বাঁধার ব্যবস্থা, শিকলের অন্য মাথা বাঁধা থাকবে দাদার চেম্বারে—যে চেয়ারে তিনি বসতেন, তার হাতলে।

আমি পাশের ঘরে। বড় একটা চৌকিতে। শব্দ করে পড়তে হবে, হুকুম। শব্দ না পেলে দাদা শিকল ধরে হ্যাঁচকা টান মারবেন। সেই টান হচ্ছে প্রশ্ন, তার জবাব দিতে হবে জোরেশোরে পড়ার শব্দে।

আব্বা ছিলেন দাদার উল্টো, খুব ঠান্ডা, চুপচাপ ধরনের মানুষ। গোলাম রব্বানী ডাক্তারের দুই পুত্রের প্রথম তিনি। ষোলো আনা পিতার অনুগত, বাধ্য সন্তান ছিলেন। ভালো মানুষ আব্বা বোধ হয় কুকুর বাঁধা শিকলে ছেলেকে বেঁধে পড়াশোনা করানোর কায়দাটা মেনে নিতে পারেননি। সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে স্কুল বদলে দেবেন। আর আমাকে বাড়িতেও রাখা হবে না। পাঠিয়ে দেওয়া হবে হোস্টেলে।

default-image
ইজ্জত রক্ষার জন্য কলকাতা থেকে তিনি কুকুর বেঁধে রাখার ছয়টা শিকল আনালেন। বিশেষ দরকারি কোনো জিনিস কিনতে হলে আমাদের গ্রাম থেকে কলকাতাই কাছের শহর। সকালে চাইলে বিকেল বা সন্ধ্যায় জিনিস বাড়িতে পৌঁছে যায়। শিকল এসে গেল। জোড়া লাগিয়ে ভালোই লম্বা হলো সেই শিকল। তার এক মাথায় আমার পা বাঁধার ব্যবস্থা, শিকলের অন্য মাথা বাঁধা থাকবে দাদার চেম্বারে—যে চেয়ারে তিনি বসতেন, তার হাতলে। আমি পাশের ঘরে। বড় একটা চৌকিতে। শব্দ করে পড়তে হবে, হুকুম। শব্দ না পেলে দাদা শিকল ধরে হ্যাঁচকা টান মারবেন। সেই টান হচ্ছে প্রশ্ন, তার জবাব দিতে হবে জোরেশোরে পড়ার শব্দে।

যে স্কুলে ভর্তি করানো হলো, সেটা আমাদের বাড়ি থেকে সাত-আট মাইল দূরে। নলতা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়। যশোর বোর্ডের সবচেয়ে নামডাকওয়ালা স্কুল সেটা। সে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তমঘা ই খিদমত খেতাবে ভূষিত করেছিলেন।

অভিভাবকদের ধারণা, সে স্কুলে গাধা পিটিয়ে মানুষ বানানো হয়। লেখাপড়া করে যারা বিশেষ হতে পারবে, এমন মেধাবীরা সেখানে ভর্তি হতো—এই আশায় তারা স্কুল ও পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। পাশাপাশি বাবা-মা যাদের নিয়ে যাতনায়, যাদের নিয়ে হতাশায়, বিপর্যস্ত, শেষ ভরসা হিসেবে তাদের নলতা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হতো।

কাঁচাপাকা দাড়িতে ধর্মগুরুর মতো শান্ত ও শীতল চেহারার হেডমাস্টার সাহেব, ছাইচাপা আগুন স্বভাবী—ছিলেন অতিশয় কঠোর। পাজামা-পাঞ্জাবি, তার ওপর সারা বছর সাদা চাদর ও মাথায় সাদা টুপি—এই ছিল তাঁর পোশাক। চোখের নিচের পাতা স্পর্শ না করা তাঁর ভাসমান দৃষ্টির সামনে অভিভাবকেরাও কথা গুছিয়ে বলতে পারতেন না।

জেলখানা সম্পর্কে বিস্তারিত না জানা থাকলেও সেই স্কুল, হোস্টেলজীবনের প্রতিটি দিন বুঝিয়ে দিয়েছিল কারাবাস কাকে বলে।

আমি এখনো দেখতে পাই, হেডস্যার স্কুলের টানা লম্বা বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছেন বা আমাদের শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেন। তাঁর হাতে রয়েছে সাড়ে তিন ফুট দৈর্ঘ্যের বিখ্যাত বেতখানা। বেতখানা বললে ভুল হবে, সেটি ছিল চিকনাকৃতির চারটে বেত—সরু তার দিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা।
সেই আমলে সেই স্পেশাল ফোর ইন ওয়ান বেতের বাড়ি খেতে হয়নি—এমন সৌভাগ্যবান কেউ ছিল, জানা যায়নি।

বাঘ মার্কা দাদার হাত থেকে বাঁচাতে আব্বা আমাকে রেখে গেলেন সিংহের খাঁচায়। প্রথম কয়েকটা দিন কেঁদেকেটে, নাকের জল, চোখের পানি একাকার করে পার হয়ে যায়। ভালো ছবি আঁকতে পারি—কথাটা জেনে যাওয়াতে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে সময় লাগল না।

মুসলিম হোস্টেলে থাকি। ভোরবেলায় হোস্টেল সুপার ধর্মশিক্ষক হাঁক ছাড়েন, ‘এই গুফ্‌ফার (গফফারকে ‘উ-কার’ লাগিয়ে ডাকতেন) আজান দিউ।’

আজান হওয়ামাত্র উঠে ছোট পুকুরে। অজু করে মসজিদে নামাজ পড়তে যাও, তারপর পড়তে বসো। স্কুলের সময় হলে ঝটপট তৈরি হয়ে দৌড়াও ক্লাসে।

এমন জীবন মানা আমার জন্য কঠিন। আমার মধ্যে বিদ্রোহী কবি বাস করেন। তাঁর সঙ্গে কত মিল খুঁজে পাই। তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে রুটির কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন। মনে হলো, সামনে সেই পথই খোলা—আমাকে পালাতে হবে।


(চলবে)

অন্য আলো অনলাইনে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন