স্মৃতি ধারাবাহিক: ৪

অল্পস্বল্প দীর্ঘ জীবন

বিজ্ঞাপন
অন্যআলো ডটকমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে লেখক-অভিনেতা-চিত্রকর আফজাল হোসেনের স্মৃতি ধারাবাহিক ‘অল্পস্বল্প দীর্ঘ জীবন’। বিচিত্র এক জীবন পাড়ি দিয়েছেন আফজাল হোসেন। সাতক্ষীরার গণ্ডগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে চারুকলায় পড়েছেন, পত্রিকায় কাজ করেছেন, মঞ্চ কাঁপিয়েছেন একসময়। আর টেলিভিশনে তাঁর জনপ্রিয়তার কথা তো বলাই বাহুল্য। বিজ্ঞাপনের জগতেও আছে তাঁর নিবিড় পদচারণ। আবার লেখক ও চিত্রশিল্পী হওয়ার কারণে লেখক-চিত্রকরদের অনেকের সঙ্গেই রয়েছে অন্তরঙ্গ সখ্য। জীবনের এসব নানা বর্ণের গল্প আফজালের কলমে উঠে আসবে এখানে। আজ প্রকাশিত হলো চতুর্থ কিস্তি।

চার.

বহু বছর পর আলতাফ কাকা ছুটিতে বাড়িতে এলেন। বিলেতে গিয়েছিলেন ডাক্তারি পড়তে। লন্ডনে পড়া গ্রামের ছেলে গ্রামে ফিরেছে, হইহই রইরই করা ঘটনা তখন। আশপাশের গ্রাম থেকে বড় ডাক্তারের বাড়িতে বিলেতি ডাক্তার দেখতে দলে দলে মিছিলের মতো মানুষ আসে রোজ। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই কাকাকে দেখতে এসে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। কাকা বাংলায় কথা বলছেন শুনে অবাক হয়। সে অবাক হওয়া আরও বাড়িয়ে দেন তিনি, ভিড়ের মধ্যের কাউকে জিজ্ঞাসা করেন, কোন পাড়ায় বাড়ি, নাম কী?

কদিন ধরে এ রকমটা চলছে। বাড়ির বাইরে ভিড়, উঠানে মানুষ। সকাল হলেই দর্শনার্থী আসা শুরু হয়ে যায়। তারপর সারা দিন চলে আসা আর যাওয়া। দুপুরের দিকে মানুষ কমে, একেবারে নেই হয়ে যায় না। খাওয়ার সময়টা খুবই অস্বস্তিকর। বারান্দায় কাপড় ঝুলিয়ে আড়াল করার চেষ্টাতেও লাভ হয় না। কাপড় টেনেটুনে ফাঁক বের করে মুখের পাশে মুখ দলা পাকায়। চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে দেখে, কী খায় মানুষটা। কীভাবে খায়। প্লেট থেকে মুখ পর্যন্ত চোখের মণি উঠিয়ে নামিয়ে দেখতে থাকে, দেখতেই থাকে।

গ্রামের গেরস্ত বাড়ির ধরন সাধারণত যেমন হয়ে থাকে, আমাদেরটা সে রকমই ছিল। বড় একটা উঠান। সে উঠান ঘিরে অনেকগুলো ঘর। পশ্চিম দিকে বড় খোলা বারান্দাসহ একতলা একটা বিল্ডিং। তার বাম, ডান ও সামনের বিভিন্ন আকারের ঘরগুলো নিয়ে পুরো বাড়িটা। জানতাম, এটা আমাদের একটু একটু করে হওয়া বাড়ি, আসল বাড়ি এটা নয়।

এই পারুলিয়া গ্রাম থেকে ১১-১২ মাইল উত্তর-পশ্চিমে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত। সে গ্রামের নামটা ভারি চমৎকার, ভোমরা। ভোমরা যাওয়ার পথে, খানিকটা আগে, ডানে মোড় নিয়ে ভেতর দিকের ধুলোর রাস্তা বেয়ে এগিয়ে গেলে, মাহমুদপুর গ্রাম। সে গ্রামের সর্দারবাড়ি বললে পুরোনো নকশার সাদা রঙের দোতলা বাড়িটা সবাই চিনত। সেটাই আমাদের আদি গ্রামের বাড়ি। গ্রামের বাড়ি মানে যেখানে নিজেদের পুকুর, আম-কাঁঠালের বাগান থাকবে। থাকবে বাঁশবাগান, সবজি-ফসলের খেত, পারিবারিক কবরস্থান প্রভৃতি।

দাদার বাবার আমলের বাড়ি ও গ্রাম ছেড়ে পারুলিয়া গ্রামে দাদা এসেছিলেন পেশায় প্রতিষ্ঠালাভের জন্য, ডাক্তারি করবেন বলে। নতুন গ্রামে এসে গ্রামের প্রধান জায়গাতে, মূল রাস্তার পাশে প্রথমে একতলা বিল্ডিংটা তৈরি করে নেন। পরে ধীরে ধীরে অন্য ঘরগুলো দরকার অনুযায়ী বানানো হয়।

বিল্ডিংয়ের সামনের দিকে ফার্মেসি আর দাদার চেম্বার। পেছনের ঘর বসবাসের জন্য। ভেতর দিকের বারান্দা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামলে হাতের ডান দিকে রান্নাঘর। তার পেছনে কলতলা। রান্নাঘরের পূর্বদিকে একটা পেয়ারাগাছ, তার পাশে কোমরসমান পাকা দেয়ালের বড় একটা জলাধার। সেখানে নানা রকম মাছ ছাড়া থাকত।

জলাধারের খানিকটা পরই বড় সিংহদুয়ার, আমরা বলতাম সিংদরজা। সিংদরজা পার হয়ে গেলে বিরাট ফাঁকা চাতাল। ধানের সময় সেখানটায় জমির ধান কেটে এনে রাখা, মাড়াই করা হতো। চাতালের ডানদিকে রাইসমিল। সোজা হেঁটে গেলে পারুলিয়া বাজার।

পারুলিয়া গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ প্রান্ত ঘেঁষে পূর্ব দিকে বয়ে গেছে ইছামতীর শাখা নদী। নদীর ওই পারে সখীপুর, এপাশে পারুলিয়া। দুটো বড়সড় গ্রামের মাঝখানে নদী বেয়ে শহর থেকে আসত সামানবোঝাই বজরা নৌকা। বোঝাই যায়, সাতক্ষীরা ও দক্ষিণে কালীগঞ্জের মাঝখানে পারুলিয়া তখন ছিল ব্যবসাকেন্দ্র। সে কারণেই আদি বাড়ি ছেড়ে এ গ্রামে চিকিৎসা ও বসবাস করতে চলে আসেন দাদা ডা. গোলাম রব্বানী।

সিংদরজার কথা বলেছি, তার বাম পাশ ঘেঁষে ছিল বড় আকৃতির পোড়া মাটির টালিতে ছাওয়া একটা ঘর। সে ঘরে-বাইরে থেকে ঢোকার আলাদা দরজা ছিল, ব্যবহার করা হতো বাহির ঘর হিসেবে। আত্মীয়স্বজন এলে থাকার ঘর।

আব্বা রবি ময়রার দোকান থেকে কখনো গরম সন্দেশ, কখনো রসগোল্লা এনে টেবিলে রাখেন। গরম মিষ্টির স্বাদের বর্ণনা করে যান। রোগী দেখার মাঝখানে ঘর, বারান্দা ঘুরে দেখে যান কাকা মিষ্টি খেলেন কি না। মাহমুদপুর থেকে ঢাকা, লন্ডন—গল্পের পর গল্প প্রজাপতির মতো আমাদের দুই ভাইকে ঘিরে উড়তে থাকে। ফাঁকে ফাঁকে আমার আঁকার খাতা একটু একটু করে আটকাতে থাকে কাকাকে।

সে ঘরের ভেতর দিকে বারান্দায় দাঁড়ালে মুখোমুখি উঠানটা। উঠানের পূর্বদিকে সারা বছরের ধান তুলে রাখার জন্য দুটো গোলাঘর। গোলাঘরের দক্ষিণ পাশে হরিণের খাঁচা। উঠানের উত্তর দিকে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর লম্বা গোয়ালঘর। তার পাশে উঠান আর রান্নাঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো উঁচু বারান্দাঅলা আব্বা-আম্মার ঘর।

ঘরের পশ্চিম কোনায় বাড়ির পেছন দিকে যাওয়ার একটা দরজা। পেছনে গেলে বাগান, সবজিখেত। সরু একটা হাঁটা পথ গিয়ে ঠেকেছে পুকুরঘাটে। সেই দরজার পশ্চিম পাশে ছিল বাথরুম। তখন এমনই নিয়ম ছিল। শোয়ার ঘর থেকে বাথরুম থাকতে হবে দূরে। যে কারও সেখানে যাওয়ার দরকার পড়লে উঠান পাড়ি দিয়ে যেতে হবে।

লন্ডন, বিলেত থেকে ছুটিতে আসা কাকা আলতাফ হোসেন থাকেন সিংদরজার পাশের ঘরটাতে। বাইরের চত্বরের মানুষ জানালার পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে থাকে। ভেতরের বারান্দা ঘেরাও করে, বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে থাকে আর এক দল। পাঁচিলের বাইরের পুরোনো বড় পেয়ারাগাছে চড়ে ছোটরা ভেতরবাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। কী যে দেখে তারা, তারাই জানে। আব্বার কড়া নির্দেশ, সবাই সরল সোজা মানুষ, বাড়ির কারও বিরক্ত হওয়া চলবে না। কারও সঙ্গে জোরে কথাও বলা যাবে না।

গোয়াল, গরু আর হরিণ দেখভাল যে করে, তার নাম জব্বার। ছোটকাল থেকে সে এই বাড়িতে। বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে। একদিন খুবই অসহায় ভঙ্গিতে কাকার নিকটে এসে চাপা স্বরে বলে, ‘যদ্দিন বড় ডাক্তার বেঁচি ছিল, তার বাড়ির মদ্দি মাছি ঢুকতিও সাহস পাইনি।’

আলতাফ কাকা যে বিরক্ত হন, তা কখনো মনে হয়নি। তবে খুবই বিব্রতবোধ করতেন বাথরুমে যাওয়ার দরকার হলে। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে নামা মানে পেছনে সার বেঁধে মিছিল হয়ে যেত মানুষের। সে মিছিল কাকাকে অনুসরণ করে থামত গিয়ে বাথরুমের দরজার সিঁড়ির সামনে। তারপর অপেক্ষা। দরজা খুলে বের হলে যন্ত্রমানবের মতো আবার অনুসরণ।

আব্বা হলেন বাড়ির বড় ছেলে। সবাই বড়কে মান্য করবে, এমনই তখন নিয়ম। বড়দের সঙ্গে ছোটদের তখন সামনাসামনি কথা বলার রীতি নেই। কাকা উপায় না দেখে একদিন আম্মাকে বলেই ফেললেন অসুবিধার কথা। হাসতে হাসতেই বললেন,

‘ভাবি, বাথরুমে ঢুকে মনে হতে থাকে, দরজা খুলে ঢুকে পড়বে না তো কেউ! খুবই অস্বস্তিকর। মনে হয়, বাইরে দরজায় কেউ কান পেতে আছে কি না!’

আম্মা শুনলেন। আব্বার সঙ্গে কথা বলবেন, বলবেন আলতাফের অসুবিধা হচ্ছে কিছু একটা করা দরকার। না তা তিনি করলেন না। জব্বারকে দিয়ে পাঁচু মিস্ত্রিকে ডেকে আনালেন বাড়ির ভেতরে। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, এক দিনের মধ্যে উঠানের মাঝ বরাবর বাঁশের বেড়া তুলে দিতে হবে।

পরদিন উঠান ভাগ হয়ে গেল। বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি প্রায় বুকসমান উঁচু বেড়ার ওপারে আটকা পড়ে গেল মানুষ, মানুষের কৌতূহল। বাড়িতে খানিকটা স্বস্তি, স্বাভাবিকতা ফিরে এল। আমরা একসঙ্গে এপারে বসে লুডো খেলার অবসর পেয়ে যাই। আম্মা পিঠা বানিয়ে আনেন। সুখের হাসিমুখে ছোট ভাই বাবুলের পরীক্ষার খাতা দেখান কাকাকে। পিঠা খেতে খেতে মনে হয়ে যায়, কাকাকে আমি তো আমার আঁকাজোঁখার খাতা দেখাতে পারি।

আব্বা রবি ময়রার দোকান থেকে কখনো গরম সন্দেশ, কখনো রসগোল্লা এনে টেবিলে রাখেন। গরম মিষ্টির স্বাদের বর্ণনা করে যান। রোগী দেখার মাঝখানে ঘর, বারান্দা ঘুরে দেখে যান কাকা মিষ্টি খেলেন কি না। মাহমুদপুর থেকে ঢাকা, লন্ডন—গল্পের পর গল্প প্রজাপতির মতো আমাদের দুই ভাইকে ঘিরে উড়তে থাকে। ফাঁকে ফাঁকে আমার আঁকার খাতা একটু একটু করে আটকাতে থাকে কাকাকে।

আলতাফ কাকা এসেছিলেন অল্পদিনের জন্য। সেই অল্পদিনেই সূচনা করে গিয়েছিলেন আমার আগামী জীবনের গল্প। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, শুধু আমার নয়, একটা পরিবারের ভবিষ্যতের রূপ কেমন হবে, তার ছক যেন এঁকে দিয়েছিলেন সেবার ছুটি কাটাতে এসে।

অন্য আলোতে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন