default-image

ইদানীং ‘জুম মিটিং’ বলে একটা ব্যাপার এসেছে। বিভিন্নজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, আলোচনা, বৈঠকাদি আমরা ভার্চ্যুয়াল জগতেই সেরে নিচ্ছি। যাঁরা এসব বৈঠকে অংশ নেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করেন। তাতে ফ্রেমে লোকগুলোর মুখাবয়ব ছাড়াও আমরা আরেকটি বাড়তি জিনিস দেখতে পাই—লোকজনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক পরিসর।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ফ্রেমের পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকে বইয়ের তাক—এক বা একাধিক, তাতে থরে থরে সাজানো বইপত্র। বোঝা যায়, লোকজন তাঁদের পাঠরুচিকেই সবচেয়ে উপস্থাপনযোগ্য পশ্চাৎপট বিবেচনা করে। এটা কেন ঘটে, কেন লোকেরা তাঁদের ওয়ার্ডরোব বা ডিনার ওয়াগনকে উপস্থাপনযোগ্য গণ্য করে না, সেটার সমাজ-মনস্তত্ত্ব দুরধিগম্য নয়। আপাতত এটা স্পষ্ট যে শহুরে মানুষ বইপাঠকে অন্তরালের গোপন কর্ম হিসেবে না দেখে এটাকে বরং একটা প্রশংসনীয় সামাজিক কর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন এবং অহর্নিশ নিজের পাঠরুচি ঘোষণা করার চেষ্টা করেন। সবাই যেন অস্ফুটভাবে বলতে চান, ‘আমাকে দেখো, আমি সেই লোক, যার পশ্চাৎপটে আছে অ্যাডাম স্মিথ বা রবীন্দ্রনাথ বা দস্তয়েভস্কি বা মুরাকামি।’

এখন কেউ যদি একজন গবেষকের নিবিষ্টতায় এসব জুমফ্রেমের দিকে বা ফ্রেমের পেছনের বুকশেলফের দিকে বা বুকশেলফে খাঁড়া হয়ে থাকা বইয়ের স্পাইনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, তালিকা করে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে আমাদের ঢাকা শহরের এ সময়ের গড় নাগরিক পাঠরুচির একটা সাধারণ মানচিত্র তৈরি করে ফেলতে পারবে। তাতে আমরা শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ‘রেগুলার’ নাগরিকেরা কী পড়ে থাকি, সেটা যতটা না জানা যাবে, তার চেয়ে বেশি জানা যাবে, সমকালে কী কী পড়া উচিত বলে আমরা গণ্য করছি, তার ভূগোল।

বিজ্ঞাপন

আমি নিশ্চিত, এ রকম একটি তালিকায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ বইপত্র ‘কমন’ পড়বে। আমি এটাকে বলি সামাজিক পাঠ। আমরা যা পড়ি, তার বড় একটি অংশ ‘ডিকটেট’ করে দেয় সমাজ বা পাঠকসমাজ। এই সামাজিক বইগুলো আমরা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে পাঠ করি, অনেকটা গির্জায় সমস্বরে গাওয়া প্রার্থনাসংগীতের মতো, তাতে যে এক-দুজন গাইছে না, তারও গাওয়া হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক বইগুলোর অন্য একটা চালু নাম হলো ‘ক্লাসিক’ বা ‘ধ্রুপদি’ বই। এগুলো কেউ না পড়লেও পড়া হয়ে যায়। যেমন কার্ল মার্ক্সের ‘ডাস ক্যাপিটাল’ বা আমাদের বাংলার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’। আমি দেখেছি, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পটি কোনোকালে না পড়লেও চিরকাল আমি এই দেজা ভ্যুতে ভুগেছি যে আমি গল্পটি পড়েছি। আমার আশপাশের বন্ধুবান্ধব গল্পটি পড়ে পড়ে আর আমাকে বলে বলে এই দশা করেছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’র ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা।

আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বইয়ের তাকের এই নব্বই শতাংশ সামাজিক বইপুস্তকের বাইরে যে ১০ শতাংশ বই অবশিষ্ট থাকে, বাসাভেদে যে ১০ শতাংশ বই অপ্রতিসম, বিসদৃশ ও বেমিল—সেই বইগুলোই আমাদের নিজ নিজ ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। ওইখানে আমরা ব্যক্তিপাঠক। ওইখানে কারও শেলফে আমি অতিচর্চিত কাহলিল জিবরান অথবা মিলান কুন্ডেরার পাশে হয়তো পেয়ে যাব কলম্বিয়ান লেখক সান্তিয়াগো গামবোয়ার ‘নেক্রোপলিস’, আবার কারও শেলফের পেছন থেকে উঁকি দেবে জাপানি লেখক ইয়োকো ওগাওয়ার ‘মেমোরি পুলিশ’। সেখানে কারও কাছে প্রুস্তের চেয়েও বড় লেখক হয়ে উঠতে পারেন কার্ল ওভা ক্নাউসগার্ড।

এই ১০ শতাংশ অসামাজিক বইগুলোই আমার কৌতূহলের বিষয়।

যে লেখকদের আমরা চিনি না, যাঁদের লেখা কোনোকালে পড়িনি, সমাজ যাঁদের নাম আমাদের কানে কানে বাতলে দিচ্ছে না, তাঁদের সঙ্গে তাহলে কীভাবে আমাদের পরিচয় ঘটে? কীভাবে হাজার হাজার লেখকের তালিকা থেকে আমরা, বিশেষ করে, সমকালীন কোনো লেখকের বই বেছে নিই? কীভাবে নির্বাচন করি তাদের? আমরা কি বইয়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে একটা-দুটো পৃষ্ঠা পড়ে পড়ে, অনেকটা ভাত টিপে টিপে, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি এই অচেনা কোরিয়ান লেখক বা ওই আধচেনা ইতালিয়ান লেখকের পেছনে আমি আগামী একটি সপ্তাহ ব্যয় করব? নাকি পত্রপত্রিকায় পড়া রিভিউ আমাদের প্রভাবিত করে? বাছাইপ্রক্রিয়াটি কি র​্যান্ডম ও আকস্মিক, যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ক্যানটিনে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে?

প্রত্যেক পাঠকের ব্যক্তিগত পছন্দের লেখকতালিকা আসলে তাঁর নিজস্ব সৌরজগৎ। পাঠক ওই ব্যক্তিগত ভূগোলে বিচরণ করেন, সেখানে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।

তবে ভালো করে দেখলে, ব্যক্তিগত এই জগতের নির্মাণ ততটা ব্যক্তিগত নয়। আমার মনে হয়, এখানে সামাজিকায়নের আরেকটা স্তর কাজ করে। আমাদের পছন্দের লেখকের পছন্দের লেখকেরা আমাদেরও পছন্দের তালিকায় উঠে আসতে শুরু করেন। সালমান রুশদির প্রতি অনুরাগের কারণে কেউ হয়তো আয়ান ম্যাকএওয়ান হাতে তুলে নেন, আবার ম্যাকএওয়ানে মন বসে গেলে তাঁর প্ররোচনায় জন আপডাইক উল্টেপাল্টে দেখার ইচ্ছা জাগতে পারে। এই জন আপডাইক আপনাকে ঠেলে দিতে পারে মার্টিন আমিসের দিকে, যিনি আবার তাঁর পিতা কিংসলে আমিস পাঠে আপনাকে আগ্রহী করে তুলতে পারেন। মাসরুর আরেফিনের প্রবল উপস্থিতির কারণে আপনি অমিয়ভূষণ মজুমদার হাতে তুলে নিতে পারেন। ফলে যে প্রকারে আমাদের বন্ধু ও পরিচিত মানুষের বৃত্ত গড়ে ওঠে, অনেকটা সেই আদলেই গড়ে ওঠে আমাদের পাঠ-পরিসর।

বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথ তাঁর আমলের সবচেয়ে অগ্রসর পাঠক ছিলেন না মোটেই। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিসরে ছিল সমবয়সী প্রিয়নাথ সেন, শ্রীশ মজুমদার ও অক্ষয় চৌধুরী। তাঁদের পাঠরুচি সমকালীন ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগ ঘটিয়ে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ কিছু লিখলে তাঁদের পড়ে শোনাতেন।

পাঠতালিকা তৈরিতে আমাদের ‘মেন্টর’ যে সব সময় অক্ষয় চৌধুরীর মতো রক্ত–মাংসের হবেন, এমন না-ও হতে পারে। অর্ধশতাব্দী আগের ‘স্বর্গীয়’ কোনো ব্যক্তিও সেই ভূমিকা নিতে পারেন। যেমন আর্জেন্টাইন লেখক ও পণ্ডিত হোর্হে লুইস বোর্হেসের শক্ত সুপারিশের কারণে চেস্টারটন ও স্টিভেনসনের বইগুলো আপনার শেলফের সামনের তাকে চলে আসতে পারে, অন্য সময় ডিকেন্স আর জেন অস্টিনের আড়ালে যাঁদের চাপা পড়ে যাওয়ার কথা ছিল।

এভাবে আপনার বইয়ের তাক ক্রমাগত সজ্জিত ও পুনঃসজ্জিত হতে থাকে। নতুন নতুন লেখকেরা ঢোকেন পুরোনো লেখকদের দূতিয়ালির সূত্র ধরে।

তবে আবারও বলি, আপনার পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরির মাত্র ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে এটা ঘটে। বাকি ৯০ শতাংশ এক অতিকায় অনড় শিলাখণ্ডের মতো, যা আপনি আসলে পড়েননি, কিন্তু চিরকাল পড়েছেন বলে মনে হতে থাকবে।

মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন