default-image
>কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক শাহ্‌নাজ মুন্নীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ঘটনাটি খুবই চমকপ্রদ। আজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম জন্মদিনে নিজের সেই ভর্তি-বৃত্তান্তই লিখেছেন তিনি।

ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট হওয়ার পর আব্বা বললেন, ‘ইউনিভার্সিটিতে এত সেশনজট, পাস করে বের হতে অনেক দেরি হয়। তারচে বরং তুমি পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে যাও। বিএ পাস করে ব্যাংকে ঢুকে যাবে।’

আব্বা নিজে সারা জীবন ব্যাংকে চাকরি করেছেন। তাঁর কাছে ব্যাংকের চাকরিই সবচে অমল উত্তম জীবিকা। আব্বার কথা মেনে লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাড়ির কাছে সরকারি তিতুমীর কলেজে বিএ পড়তে ভর্তি হয়ে গেলাম। আসলে না হয়ে উপায় ছিল না। আইএ পাস করেছি শুনেই আমাদের গ্রামের আত্মীয়স্বজন আমার জন্য বিয়ের সম্বন্ধ দেখা শুরু করে দিয়েছিল। এ নিয়ে আম্মার কাছে অভিযোগ করায় আম্মা বললেন, ‘গাছে ফল পাকলে মানুষ ঢিল দেবেই। আর বিয়ের সম্বন্ধ দেখা মানে তো বিয়ে হয়ে যাওয়া না। ওদের কাজ ওরা করছে, তোমার কাজ তুমি করো।’

কী আর করা, দ্রুত তিতুমীর কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী হয়ে ক্লাস শুরু করে দিলাম। থাকি শাহজাদপুরে। গুলশান-২-এ এসে ৬ নম্বর বাসে চেপে মহাখালীতে কলেজে যাই। একদিন ক্লাস হলে আরেক দিন হয় না। আর আমার স্বভাব এত গোটানো টাইপের যে তেমন বন্ধুবান্ধবও জোগাড় করতে পারি না। এরই মধ্যে পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির নোটিশ ছাপা হলো। ভয়ে ভয়ে আব্বাকে বললাম, ভর্তি পরীক্ষাটা দিয়েই দেখি, পাস না করলে তো নাই।

আব্বা অতঃপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভ্রু কুঁচকে রাজি হলেন।

কোনো কোচিং-ফোচিংয়ের বালাই নেই। বিশেষ পড়াশোনাও করিনি। একা একাই বনানী থেকে এয়ারপোর্ট রুটের মিনিবাসে চড়ে শাহবাগ এসে নামলাম। বাকিটা পথ হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলাভবনের তৃতীয় তলায়, ওখানেই পরীক্ষার সিট পড়েছে। লিখতে গিয়ে মাথায় হাত। ব্যাগে রাখা বলপেন উল্টে কখন যেন সব কালি বেরিয়ে গেছে, টেরও পাইনি। এখন শিস ঘষেও কাগজে দাগ পড়ছে না। এদিকে হু হু করে সময় চলে যাচ্ছে। আশপাশে সবাই লিখতে শুরু করেছে। আমি কী করি? কী করি? কার কাছে কলম পাই? চোখ ফেটে পানি আসতে চাইছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যাও একটু চান্স ছিল, তা-ও বুঝি গেল। মরিয়া হয়ে, সাহস করে উঠে দাঁড়ালাম। গার্ড দিচ্ছিলেন যেই তরুণ গম্ভীর সুবেশী শিক্ষক, তিনি এগিয়ে এলেন। কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, কলম দিয়ে কালি বের হচ্ছে না।

তিনি দেখলেন, তারপর শান্ত ভঙ্গিতে নিজের বুকপকেট থেকে তাঁর কলমটি তুলে নিয়ে আমার হাতে দিলেন। বললেন, ‘যাওয়ার সময় মনে করে ফেরত দিয়ে যেও।’

ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলাম। এবার ভাইভা। মনের গভীরে খুব ইচ্ছা জার্নালিজমে পড়ি, নম্বরও আছে পড়ার মতো। কিন্তু আব্বা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এই সাবজেক্টে পড়ে তো চাকরি-বাকরি পাবা না। তারচে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা ফিলোসফি পড়ো।’

default-image

আব্বার দোষ নেই, কারণ তখন তো মেয়েদের জন্য সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। আর তিনি ভেবেছেন, আমার জন্য ব্যাংকে চাকরি করাটাই উত্তম হবে। সে সময় আসলে বাবারাই ঠিক করতেন, কন্যার জন্য কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। (সম্ভবত এই অভিজ্ঞতা থেকেই, পরে আমার মেয়েদের আমি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি নিজেদের পছন্দমতো পড়ার বিষয় ঠিক করে নিতে)।

এদিকে আমি দ্বিধাগ্রস্ত, কোন সাবজেক্টে পড়ব? ভাইবোনদের মধ্যে আমিই বড়। এমন কেউ নেই যার কাছ থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ নেব। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভাইবা বোর্ডে ডিন মোমিন চৌধুরীর মুখোমুখি হলাম। তিনি হুংকার দিলেন, ‘কী পড়তে চাও?’

আমি নীরব।

‘হুম নম্বর তো ভালোই পেয়েছ। কী, সমাজবিজ্ঞান পড়বে?’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন