বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
হাসান আজিজুল হক আগে তাঁর লেখার ঘরেই বেশি বসতেন। ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর ড্রয়িংরুমের একটি খাটে শুধু শুয়ে থাকতেন। প্রিয় লেখার ঘরে তিনি আর বসতে পারতেন না। তুলে বসালেও শোয়ার জন্য চিৎকার করতেন।

হাসান আজিজুল হক বাসায় থাকলে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে তিনি তাঁর সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য আসতেন। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী পাওয়ার পর পরিবার থেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে একটু সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। এরপর তিনি প্রতিদিন যাওয়া ছেড়ে দিয়ে সপ্তাহে এক দিন যাওয়া শুরু করেন। করোনা বেশি হলে তিনি ১০ দিন পরপর দেখা করতে যেতেন।

default-image

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হাসান আজিজুল হক তাঁকে বলতেন, ‘ওসব “ড্যাম কেয়ার” করে প্রতিদিন আসুন।’ মহেন্দ্রনাথের ভাষায়, এ অবস্থায় হাসান আজিজুল হক ঠায় বসে থাকতেন। তাঁর ছিল বিষণ্নতার অসুখ। এভাবে একা একা বসে থাকতে থাকতে তাঁর বিষণ্নতার অসুখটি বেড়ে যেতে থাকল। অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও দেখা দিল।

পরে গত ২১ আগস্ট হাসান আজিুজল হককে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলো। সেখানে চিকিৎসা শেষে ৯ সেপ্টেম্বর তিনি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। এরপর কেমন ছিলেন এই কিংবদন্তি কথাশিল্পী?

মহেন্দ্রনাথ অধিকারীসহ তাঁর অন্যান্য স্বজনের কাছে প্রশ্ন করে জানা গেল, শেষের দিকে হাসান আজিজুল হক চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতেন। তিনি স্বল্পাহারী ছিলেন। এ সময় একেবারে খাওয়া ছেড়ে দিলেন। দুই চামচ সাবু, এক কাপ ডাবের পানি আর ওষুধ খাওয়ার জন্য যতটুকু পানি প্রয়োজন, সেটুকুই খেতেন। কথায় কথায় মহেন্দ্রনাথকে একদিন বললেন, আর বেঁচে থাকা...।

ঢাকা থেকে আসার পর হাসান আজিজুল হকের একান্ত প্রতিবেশী লেখক নিরমেল শিমেল তাঁর সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে যেতেন। কেমন আছেন—বলতেই মাথা নেড়ে আগের মতোই হেসে হাসান আজিজুল হক বলতেন, ‘হ্যাঁ, ভালো আছি।’ একদিন পাশ থেকে তাঁর ছেলে মৌলি (ইমতিয়াজ হাসান) বললেন, ‘বাবা, চিনতে পেরেছেন? উনি মিসেস রঞ্জু।’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিনেছি।’ পরে মৌলি আরও বললেন, ‘উনি লেখালেখি করেন। ওনার নাম নিরমেল শিমেল।’ তখন তিনি বললেন, ‘ওহ, এবার চিনতে পেরেছি। ও গল্প–উপন্যাস লেখে।’

নিরমেল শিমেল বললেন, ‘আমি তাঁর একান্ত প্রতিবেশী। মুখ দেখেই কথা বলতে শুরু করতেন। এখন তাঁকে পরিচয় করে দিতে হচ্ছে। তারপর তিনি চিনতে পারছেন। আসলে করোনার এই নিঃসঙ্গতা তাঁর ক্ষতি করে ফেলেছে।’

হাসান আজিজুল হক আগে তাঁর লেখার ঘরেই বেশি বসতেন। ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর ড্রয়িংরুমের একটি খাটে শুধু শুয়ে থাকতেন। প্রিয় লেখার ঘরে তিনি আর বসতে পারতেন না। তুলে বসালেও শোয়ার জন্য চিৎকার করতেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সাজ্জাদ বকুল নিয়মিত হাসান আজিজুল হককে সঙ্গ দিতেন। বাইরে গেলে সঙ্গে যেতেন। ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা পুরস্কার পান এই লেখক। ঢাকায় সেই পুরস্কার নিতে তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন সাজ্জাদ বকুল। তিনি বললেন, ‘এটা হাসান স্যারের ঢাকায় কোনো অনুষ্ঠানে শেষ যাওয়া।’

default-image

তবে করোনার কারণে সাজ্জাদ বকুলও আর নিয়মিত তাঁর বাসায় যেতে পারতেন না। তখন হাসান আজিজুল হক তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘তুমি গেটে এসে আমাকে ফোন দেবে। কেউ ঢুকতে না দিলে আমি নিজে উঠে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসব।’ সাজ্জাদ বকুল বললেন, মানুষের সঙ্গ তিনি খুব করে চাইছিলেন। সব সময় হাসি–আড্ডায় সময় কাটাতেন। এটাতেই ছেদ পড়েছিল। এটা খুব ক্ষতি করে ফেলেছিল।

২০১৪ সালে জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার পর রাজশাহীর কবি ও লেখকদের সংগঠন কবিকুঞ্জের পক্ষ থেকে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে কথা বলার একপর্যায়ে মৃত্যু প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন কিছুতেই মরব না।’ কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে এভাবেই মজা করে কথা বলতেন তিনি। রাজশাহীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। মানুষটি করোনার পরিস্থিতির কারণে দেড় বছর ধরে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি।

কবিকুঞ্জের সাধারণ সম্পাদক কবি আরিফুল হক বললেন, তাঁর ছিল বিষণ্নতার অসুখ। একাকিত্বের কারণে এই বিষণ্নতা তাঁকে পেয়ে বসেছিল।

মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন