default-image
করোনাকাল বদলে দিয়েছে আমাদের চেনা দৃশ্যপটগুলো। করোনাকালে শহরবাসী অনেকে হয়তো গ্রামে গিয়ে আটকা পড়েছেন, ফিরতে পারেননি আর শহরে। তেমনই একজন নাজিফা তাসনিম খানম তিশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এই তরুণ লেখক কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের নোয়াপাড়া থেকে লিখেছেন করোনার সময়ে তাঁর গ্রামে থাকার অভিজ্ঞতা।



উনিশ-বিশ বছরের জীবনে আমি যে কয়টা স্বপ্ন দেখেছি তার মধ্যে অন্যতম ছিল ঘরে না ফেরার স্বপ্ন। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে বাসা ছেড়েছিলাম, তখনই ভেবে নিয়েছিলাম ঘরে আর ফিরব না। কোভিড-১৯ অন্য অনেকের মতো আমার এই ছোট এবং আপাতদৃষ্টিতে অগুরুত্বপূর্ণ ছেলেমানুষী স্বপ্নটা ভেঙে দিয়েছে।

দীর্ঘ সময়ের জন্য যেদিন ঘরে ফিরতে হয়েছিল, সেদিন মনে হচ্ছিল আমি বর্তমান রেখে দিয়ে অতীতে ফেরত যাচ্ছি। এখনো তা-ই বিশ্বাস করি। এই চিন্তাটা আমার খুব প্যারাডক্সিক্যাল মনে হয়। আমার মাথায় বর্তমানের একটা আইডিয়া ছিল—অর্থাৎ প্রতিটা আগামীকালের একটা পরিষ্কার চিত্রায়ণ ছিল। তেমনটা ঘটেনি বলে আমার মনে হচ্ছে যে আমি অতীতে আছি। আবার এটাও আমার কাছে সত্যি, আড়াই বছর আগে ঘর ছেড়ে যাওয়া মানুষটা আর ফিরে আসা মানুষটা এক না। কাজেই আমি চাইলেই অতীতে বাঁচতে পারি না। স্থানটাই শুধু একই; কাল আর পাত্র দুটোই বদলে গেছে। তবু অতীতে বসবাসের চিন্তাটা বারবার আসে, ঘুরেফিরে আসে; এই চিন্তা থেকে আমি বের হতে পারি না।

দুই মাস হলো আমি আমাদের গ্রামের বাড়িতে, অর্থাৎ আমার দাদুবাড়িতে আটকা পড়ে আছি। ‘আটকা পড়ে আছি’ জাতীয় অনুভূতি না থাকলে বোধ করি সময়টা খুব আনন্দদায়ক হতো। তবে আটকা না পড়লে এত লম্বা সময় আমি অবশ্যই গ্রামে থাকতাম না। কোথাও দীর্ঘক্ষণ থাকা আমার পোষায় না।

একটা জায়গা, যেখানে আমি সব সময় ৭ থেকে ১০ দিনের জন্য বেড়াতে এসেছি, সেখানে দুই মাস থেকে বুঝতে পারছি এখানে আমি এর আগে কখনোই ঠিক ‘থাকি’নি। এর আগে আমি কখনো জানতাম না একটা বড় পরিবারের সঙ্গে থাকার বিষয়টা আসলে কেমন; কত দ্বন্দ্ব আর মায়া সেখানে যুগপৎভাবে বসবাস করে। একটা বাচ্চার সঙ্গে সময় কাটানোর আসলে কী মানে; তাদের পর্যবেক্ষণ আর সাহস কীভাবে তাদের বড় করে তোলে—এসব জানতাম না। অনুকরণ আর অনুসরণ আমাদের সবার জীবনে কত ভীষণভাবে ব্যাপৃত থাকে, সেটা আমি গত দুই মাসে একটা বাচ্চাকে দেখে শিখেছি। জেনেছি, শুধু কর্মজীবী মায়ের সন্তানেরা মায়ের সান্নিধ্য পায় না, এই ধারণা ভুল; একটা সংসার চালানোর বিশাল কর্তব্য সম্পাদন করার পর গৃহিণী মাকেও সন্তান সন্ধ্যার পরই পায়।

সব সময় দেখেছি, আমাদের বাড়িতে গোলাভর্তি ধান থাকে। নতুন বিয়ে করিয়ে আনা বউকে দিয়ে সেই গোলায় এক মুঠো ধান দেওয়ানো হয়, যেন এমনই ভরভরন্ত থাকে সম্ভার। কিন্তু এর পেছনে কত পরিশ্রম আর তপস্যা লাগে, সেটা আমি শেষ দুই মাসে জেনেছি। গ্রামে জিনিসপত্রের প্রচুর পুনরুৎপাদন হয়। খুব কম বস্তুসামগ্রী এখানে ফেলা যায়। একদিন শুনলাম ঝাড়ুর দরকার। পরদিনই দেখলাম নারকেল পাতা থেকে শলা নিয়ে দাদিমা বসে বসে ঝাড়ু বানাচ্ছেন। তারপর শুনলাম নতুন ঘরের জন্য কাঠ দরকার। দেখলাম পুরোনো খাটিয়া নামিয়ে সেখান থেকে যত দূর সম্ভব কাজে লাগানো হচ্ছে। কলাগাছ মরে গেছে কেটে ফেলতে হবে; দাদু ভাইয়া এসে বললেন, ‘বাচ্চাদের জন্য ভেলা বানিয়ে দিই; সবাই বাড়িতে আছে, মজা পাবে।’ চাচিরা যে হারে প্রতিদিন নতুন নতুন শাকপাতা কাটেন, আমি খুবই ভয়ে আছি, কোনো দিন ঘাস বা কাঁঠাল পাতা টেবিলে দেখতে পাব। ধানের খড় গোয়াল আর খামারে চলে যাচ্ছে, অবশিষ্টাংশ চুলায়। বাসি ভাত হাঁস-মুরগির খাবার হয়ে যাচ্ছে, হাড়গোড়, কাঁটা কুকুর-বিড়ালের। বিষয়টা আমার খুবই চমকপ্রদ লাগে।

এইতো সেদিন সন্ধ্যায় বিছানায় অনেকক্ষণ গড়াগড়ি করার পরও উঠে বের হয়ে একটু হেঁটে আসার উদ্যম পাচ্ছিলাম না। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘরের ভেতর অসহ্য গরম। বিছানা থেকে উঠে ছাদে গেলাম। দরজা দিয়ে ঢুকতেই একটা নীল আর একটা সবুজ তারা দেখলাম। আকাশে এত ঘন মেঘ যে পূর্ণিমার চাঁদটাও দেখা যায় না। নীল আর সবুজ তারা দুটো আসলে ঘুড়ি। সন্ধ্যা নামলেই ছেলেরা নিজেদের ঘুড়িতে আলো জ্বেলে সেটিকে আকাশে ছেড়ে দেয়।

তবুও বারবার মনে হয়, আমি বর্তমানে না, অতীতে বসবাস করছি।
এইতো সেদিন সন্ধ্যায় বিছানায় অনেকক্ষণ গড়াগড়ি করার পরও উঠে বের হয়ে একটু হেঁটে আসার উদ্যম পাচ্ছিলাম না। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘরের ভেতর অসহ্য গরম। বিছানা থেকে উঠে ছাদে গেলাম। দরজা দিয়ে ঢুকতেই একটা নীল আর একটা সবুজ তারা দেখলাম। আকাশে এত ঘন মেঘ যে পূর্ণিমার চাঁদটাও দেখা যায় না। নীল আর সবুজ তারা দুটো আসলে ঘুড়ি। সন্ধ্যা নামলেই ছেলেরা নিজেদের ঘুড়িতে আলো জ্বেলে সেটিকে আকাশে ছেড়ে দেয়। রঙিন আলোকবিন্দুটুকু দেখে তারা ভীষণ তৃপ্তি পায়। আমার বোন বলেছে, ঘুড়ি যতক্ষণ আকাশে থাকে ততক্ষণ নাকি সেটাকে নিজের বাচ্চার মতো মনে হয়। সুতার টান হাতে রেখে বিশাল আকাশে নিজেকে একটুখানি খুঁজে পাওয়ার আনন্দ নাকি অতুলনীয়। আমি এসব ঠিক বুঝতে পারি না। কখনো ঘুড়ি ওড়াইনি তাই। ইদানীং যে একটু-আধটু ইচ্ছা করে না, তা না। কিন্তু একবার কেউ কোনো কিছুর উত্তর না ধরে নিলে আবার হ্যাঁ বলা মুশকিল।

একসময় নীল ঘুড়িটা আর দেখতে পেলাম না। বৃষ্টি আসন্ন। সবুজ ঘুড়িটার কী হবে, তা নিয়ে বড্ড চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার চাচাতো বোন নিশী হঠাৎ ছাদে এসে বলল, ‘তিশাফু, আন্নের জোতা।’ আমি বললাম, ‘তুই এগুলা কই পাইছিস? আমি তো হারায়ে ফেলছিলাম।’ ও বলল, ‘আন্নে উডানে খুলি থুই চলি আইছেন। আন্নের কিচ্ছু মনে থাকে না, ক্যান?’

আমি বললাম, ‘হুম। আচ্ছা নিশি, আমি তো তোদের কোনো কাজে আসি না। রান্নায় তোর মাকে সাহায্য করতে পারি না, তোকে ঘুড়ি বানায়ে দিতে পারি না, নারিকেল পাতা দিয়ে পাখা বানিয়ে দিতে পারি না, ঘুড়ি উড়ায়ে দিতেও পারি না, তার পরও আমাকে এত মায়া করোস কেন?’ নিশি পাঁচ সেকেন্ড ভেবে বলল, ‘কইতাম হারি না।’ ওর দিকে তাকিয়ে আমার তখন মনে হলো, আমি এখন থেকে একটু একটু করে ওদের কাজে লাগা শুরু করব কি না। তারপর আবার মনে হলো, নিজেকে একভাবে একবার নির্মাণ করে ফেললে সেটা ভাঙা কঠিন। আপাতত বাদ থাক।

default-image

প্রায়ই আমার ইচ্ছে হয় বেরিয়ে পড়ি। ক্যাম্পাসটা একবার ঘুরে দেখে আসি, ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়ে হেঁটে আসি একপাক। হলের মাঠে মাথার ওপরে করইগাছটা নিয়ে আধঘণ্টা বসে থাকি। অথবা সোহানার সাইকেলটা নিয়ে চক্কর দিই একটুখানি। যে মানুষগুলার সঙ্গে বহুদিন দেখা নেই, তাদের দূর থেকে একবার শুধু দেখে আসি। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে বলে আসি, মন খারাপ হলে ফোন দিস। ঢাকার ফুটপাতগুলো আমাকে ভীষণ রকম টানে। গ্রামে আসার পর আমি রোজ রাস্তা দিয়ে হাঁটি, হাঁটতে হাঁটতেই শাহবাগ থেকে লালমাটিয়ার ফুটপাত ভীষণ মিস করি। আমি জানি, যদি কখনো বর্তমানে ফিরতে পারি, গ্রামের পথে হেঁটে বেড়ানো আমি মিস করব না, অতীত মিস করার সময় অনেক আগে ফেলে রেখে এসেছি।

তবুও যদি কখনো আমার এই বর্তমানে অতীত জীবন শেষ হয়, আমি হয়তো যেকোনো বোরকা পরা মধ্যবয়সী মানুষকে আরেকটু কম জাজ করব এই ভেবে, মানুষটা নিশ্চয়ই আমার বউমণির মতো একজন হবেন, যিনি যথেষ্ট আধুনিক; যিনি প্রচণ্ড ভালোবাসা, দাপট আর বুদ্ধির সঙ্গে একটা বিশাল সংসারের গৃহস্থালি চালান। আমি হয়তো উদোম গায়ের একজন কৃষককে দেখলে মনে করব না, লোকটা অশিক্ষিত, আমি জানব, তাঁর প্রকৃতিজ জ্ঞান কত বিস্তর। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কেউ যদি আমার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে বা পেছন ফিরে দেখে, আমি নিশ্চয়ই এখন একটু কম বিরক্ত হব। কারণ, সে তার এত বছরের জীবনে বা নিজের এলাকার সংস্কৃতিতে একজন ছোট চুলের ‘মেয়েমানুষ’ দেখে অভ্যস্ত না। এই যাত্রায় পার পেয়ে গেলে আমি হয়তো অন্য একটা মানুষের প্রতি আরেকটু সহমর্মী হব এই কারণে যে, সে কোভিড মহামারির দিনগুলো বেঁচে এসেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন