বৈরুত: জেগে থাকা শিল্পের শহর

খলিল জিবরানের কাছে বৈরুত ‘বসন্তে সজ্জিত নববধূ’র মতো। ঝরনার পাশে বসে থাকা রূপসী মৎস্যকন্যা যেন। সমুদ্র থেকে উঠে মিঠা রোদে যে তার মসৃণ ত্বক শুকাতে দিয়েছে (‘দ্য ব্রোকেন উইংস’, ১৯১২)। ‘দ্য প্রফেট’-এর জন্য বিশ্বসাহিত্যের সব পাঠকই তাঁকে চেনেন। যদিও খলিল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) আমাদের কাছে কাহলিল জিবরান নামে বেশি পরিচিত। আরবি ‘খলিল’ শব্দটি উচ্চারণের ফেরে ‘কাহলিল’ হয়ে গেছে ইংরেজি ও বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে। বিশ্বের বহুল পঠিত কবিদের মধ্যে খলিলের স্থানটি তৃতীয়তে। লেবাননের এই জাতীয় কবি তাঁর চিত্রকর্ম ও দার্শনিকতার জন্যও বিখ্যাত। বৈরুত তাঁর স্মৃতির শহর। ভালোবাসার শহর। কবিতার শহর।

এই শহর বহু কবি-লেখককে আপন করে আগলে রেখেছে নানা সময়ে। ফিলিস্তিনের বিপ্লবী কবি মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮) থেকে উপমহাদেশের ফয়েজ আহমদ ফয়েজ (১৯১১-১৯৮৪)—কাকে বুকে নেয়নি এ শহর। দখলদার ইসরায়েলি সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে দারবিশ ও তাঁর পরিবার রাতের অন্ধকারে পাড়ি দিয়েছিলেন লেবাননে। লেবানন হয় তাঁর আশ্রয়স্থল। সেবার ফিলিস্তিনে ফিরে গিয়ে নিজের দেশে আপন পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়তে হয়েছিল তাঁকে। হয়েছিলেন জেল-জুলুমের শিকার। তারপর সত্তরের দশকের শুরুতে আবারও বৈরুতে চলে আসেন দারবিশ।

জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে দমন-পীড়ন থেকে রেহাই পেতে ফয়েজ আহমদ ফয়েজ পাড়ি দেন বৈরুতে। দেশে ফেরার পর তরুণ কথাকার আসিফ ফাররুখিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যদিও বলেছিলেন এটি ছিল তাঁর স্বেচ্ছায় বিদেশ ভ্রমণ। পাকিস্তানে কোনো কাজ নেই বলেই দেশ-বিদেশে ঘুরে বেরিয়েছেন। কিন্তু সবাই জানত এটি সামরিক শাসক কর্তৃক নির্বাসন। এই স্বেচ্ছানির্বাসনকালেই বৈরুতে বসে ফয়েজ লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা—‘এক নাগমা কারবালায়ে বৈরুত কে লিয়ে’। কবিতায় তুলে এনেছেন তাঁর দেখা বৈরুতকে—‘আদিকাল থেকে প্রতিষ্ঠিত এ শহর/ অনন্তকাল টিকে থাকবে/ দুনিয়ার তাবৎ সৌন্দর্যের সমাবেশ বৈরুত/ স্বর্গের বিকল্প বাগান।’

বিজ্ঞাপন

নির্বাসিত দুই উর্দু কবিবন্ধু ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও ইকবাল আহমদের সঙ্গে যুদ্ধে বিধ্বস্ত বৈরুতের রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা দিতে দিতে সেদিন ফিলিস্তিনি চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ (১৯৩৫-২০০৩) বলেছিলেন, ‘জেনারেল, দেখে যান, এত রাতেও আমরা এইভাবে আড্ডা মারছি, কবিতা পড়ছি। সাহস থাকে তো আসুন, দেখে যান।’ (এডওয়ার্ড সাইদ, ‘রিফ্লেকশনস অন এগজাইল’) ফয়েজ, ইকবাল, দারবিশ ও সাইদের ভিনভাষা, ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের আড্ডায় বাধা দিতে পারেনি। শিল্পের এই হলো সৌন্দর্য। সে সময়টায় এ শহরে যেন কবিদের মেলা বসেছিল। নিজার কাব্বানি (১৯২৩-১৯৯৮), ফুয়াদ রিফকা (১৯৩০-২০১১), আদোনিস (জন্ম ১৯৩০) ও ইউসুফ আল খলের (১৯১৭-১৯৮৭) মতো প্রেম ও বিপ্লবের কবিরা জড়ো হয়েছিলেন এ শহরে।

লেবানিজ কবি ইউসুফ আল খলের সঙ্গে মিলেই আলি আহমদ সাইদ ইসবার বা আদোনিস এ শহরে সম্পাদনা করেছেন তাঁর বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘মাজাল্লাত আল শির’ (কবিতা পত্রিকা, ১৯৫৭, বৈরুত)। লেবানিজ বুদ্ধিজীবী ও কথাসাহিত্যিক ইলিয়াস খৌরি (১৯৪৮) এবং লেবানিজ ঐতিহাসিক ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওমর আল-মুখতার চেয়ার অধ্যাপক হিশাম শারাবি (১৯২৭-২০০৫) ও মাহমুদ দারবিশকে নিয়ে আদোনিস ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর বিখ্যাত পত্রিকা ‘আল-মাওয়াকিফ’। আদোনিসের সাহিত্যিক সুখ্যাতি বৈরুত থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। গৃহযুদ্ধ আর ইসরায়েলি আক্রমণ নিয়ে আদোনিস লিখেছেন ‘দ্য বুক অব সিইজ’।

লেবানিজ শিক্ষাবিদ সামির মাকদিসিকে বিয়ে করার পর ১৯৭২ সাল থেকে বৈরুতে বাস করা শুরু করেন জেইন সাইদ মাকদিসি (জন্ম ১৯৪০)। জেইন মাকদিসি এডওয়ার্ড সাইদের ছোট বোন। দেড় দশক ধরে চলা লেবাননের গৃহযুদ্ধের চাক্ষুষ সাক্ষী এই ফিলিস্তিনি লেখক, পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৮২ সালে লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলার সাক্ষীও তিনি। এ দুটি যুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘বৈরুত ফ্র্যাগমেন্টস: আ ওয়ার মেমোয়ার’ (১৯৮৯, নিউইয়র্ক)-এর জন্য তিনি বিখ্যাত। এ বইয়ে লিখিত তাঁর আত্মজৈবনিক বয়ান থেকে বৈরুতের ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়।

জেইন লিখেছেন, ‘বৈরুত একটি শিশু। বৈরুত একটি মা। বৈরুত একজন বারাঙ্গনা। বৈরুত এমন একটি শহর, যার ওপর বিশ শতকের অন্য যেকোনো রাজধানীর চেয়ে বেশি রক্ত ও কালি ব্যয় করা হয়েছে। বৈরুত এ নিয়ে গর্ব করতে পারে। বৈরুত আধুনিককালের এক ড্রাকুলার নাম। দেদার রক্তপান না করলে যার তৃষ্ণা মেটে না। বৈরুত একটি আধুনিক জাদুঘর। সব ধরনের লেখক-শিল্পীকে এখানে টেনে আনে যে।’

বিজ্ঞাপন

ঠিক তা–ই। এ জন্যই বৈরুতকে ২০০৯ সালে ইউনেসকো ‘ওয়ার্ল্ড বুক ক্যাপিটাল’ ঘোষণা করেছে। একই প্রতিষ্ঠান বৈরুতকে ‘ক্রিয়েটিভ সিটি ফর লিটারেচার’ বলেও গত বছর স্বীকৃতি দিয়েছে।

রূপসী মৎস্যকন্যা বা বসন্তে সজ্জিত বধূর মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে উজ্জ্বল এই নগরীর অন্ধকার অতীত বেদনার হলেও বাস্তব ও সত্য। গত ৪ আগস্টের ভৌতিক বিস্ফোরণ নগরের পুরোনো বাসিন্দাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ফরাসিদের সেই ঔপনিবেশিক শাসনের দুঃসময়, দখলদার ইসরায়েলের কাপুরুষোচিত হামলা অথবা দেড় দশকজুড়ে চলতে থাকা গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ সময়ের কথা। এ বিস্ফোরণে খোয়া গেছে প্রায় দুই শত তাজা প্রাণ। মুহূর্তের মধ্যে আপন আশ্রয় ও সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে হাজার হাজার আমুদে মানুষ হয়ে গেছে একেবারে নিঃস্ব, ফতুর।

একদিন এই শহরে বোমা বিস্ফোরণে কবি হারিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। সিরিয়ার জাতীয় কবি ও কূটনীতিক নিজার তৌফিক কাব্বানিতার পরমা প্রিয়া বিলকিসকে হারিয়েছিলেন এখানেই। বিলকিস আল-রাবি (১৯৩৯-১৯৮১) ছিলেন ইরাকি বংশোদ্ভূত গুণী রমণী ও একজন কূটনীতিক। নিজার কাব্বানির দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৯৮১ সালে বৈরুতের ইরাকি দূতাবাসে হামলা হলে বিলকিস নিহত হন। কবি লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কাসিদাতু বালকিস’। দীর্ঘ এই কবিতার শুরুটা এমন—‘ধন্যবাদ, তোমাদের ধন্যবাদ/ আমার প্রিয়াকে খুন করার জন্য/ চলো শহীদের সমাধিপাশে দাঁড়িয়ে পান করা যাক/ আমার কবিতাকে হত্যা করা হয়েছে/ এ জগতে কোনো জাতির শক্তি নেই/ আমাদের ছাড়া, কবিতাকে খুন করার মতো/ বিলকিস...ব্যাবিলনের ইতিহাসে সবচেয়ে সুশ্রী সম্রাজ্ঞী/ বিলকিস...ইরাকের মাটির সবচেয়ে উঁচু খেজুরবৃক্ষ/ সে হাঁটলে মনে হতো অরক্সি ও ময়ূর হাঁটছে/ বিলকিস...আমার বেদনার নাম।’

বিজ্ঞাপন

চার দশক আগে এই শহরে যে কবি তাঁর প্রিয়াকে হারিয়েছিলেন, সেই শহরের পাশে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে এবার নিজার কাব্বানির কবিতা। কবির ‘ইয়া বৈরুত, সিত্তিত দুনইয়া’ (হে বৈরুত, মহাবিশ্বের রানি) বিপ্লবের স্লোগান হয়ে উঠেছে আবার। বিখ্যাত আরব গায়িকা মাজিদা আল-রুমির জাদুকরি কণ্ঠে প্রত্যেকের রক্তে জেগে ওঠার মন্ত্র ফুঁকছে। বলছে, ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠো, বৈরুত’ (কু মি মিন তাহতির রিদম)। এ কবিতাতেই নিজার কাব্বানি বলেছেন, ‘দুঃখের জরায়ু থেকে জন্ম হয় বিপ্লবের।’ হয়েছেও তা–ই। ইতিমধ্যে দুর্নীতিতে আকীর্ণ ক্ষমতাশীলদের নেমে যেতে হয়েছে। পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছে।

বৈরুত বিস্ফোরণের পর আরববিশ্বের শিল্পীরা নানাভাবে বৈরুতের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ডি জে হাবিবি ফানক সাতটি আরবি ও ইংরেজি সংগীত দিয়ে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। ‘লেডি রেইন’ ও ‘নিয়াম’ সংগীত দুটি ইতিমধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অ্যালবামের সমুদয় আয় নিয়ে শিল্পীরা বৈরুতের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। আলোকচিত্রী ও চিত্রশিল্পীরা নানা রকম চিত্রকর্মের মাধ্যমে বৈরুত বিস্ফোরণের মর্মান্তিকতা তুলে ধরেছেন। এ লেখায় তেমন কয়েকটি চিত্রকর্মের সঙ্গে বাংলাভাষী পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক।

আশাহীন বিষাদময় নারী

default-image

সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত ফরাসি শিল্পী লুই জ্যঁ ফ্রাঁসোয়া লাগরেনির বিখ্যাত চিত্র ‘লা মেলানকোলি’কে নতুনভাবে সামনে এনেছেন তরুণ শিল্পী নুর হালাবি। হালাবির বয়স মাত্র ২০ বছর। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। তিনি ‘লা মেলানকোলি’র মেয়েটির পেছনে বিস্ফোরণস্থল থেকে ছড়িয়ে পড়া কুণ্ডলী পাকানো ঘন লাল অগ্নিশিখাকে দেখিয়েছেন। অগ্নিশিখার মাঝখানে আরবি হরফে লেখা ‘আখ ইয়া বায়রুত’। অর্থাৎ ‘ওহ বৈরুত!’

এ শিল্পকর্মের ব্যাখ্যায় হালাবি বলেছেন, ‘আমি লা মেলানকোলিকে বেছে নিয়েছি। মেয়েটির অভিব্যক্তি ও ভঙ্গিতে সীমাহীন বেদনা ফুটে রয়েছে। তার শারীরিক ভাষা থেকে এমন এক নারীকে পাওয়া যাচ্ছে যে চরম হতাশাগ্রস্ত, যে নারীর সব আশা উবে গেছে। এই যে আশার অভাব, লেবাননের সার্বিক পরিস্থিতি এখন এমনই। এই বিস্ফোরণ শুধু আমাদের আশাই মুছে দেয়নি, একেবারে বিধ্বস্ত করে ফেলেছে। এবার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।’

বিজ্ঞাপন

পুনর্নির্মাণের প্রত্যয়

default-image

আমেরিকান-লেবানিজ শিল্পী নুর ফ্লায়হান তরুণীদের ‘সাইকোডেলিক ইমেজ’ নিয়ে কাজ করেন। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণী লেবাননে কাটানো তাঁর শৈশবের সোনালি গ্রীষ্মের দিনগুলো থেকে প্রেরণা নিয়ে এটি তৈরি করেছেন। চিত্রে তিনটি পৃথক পৃথক বাক্যে লিখেছেন, ‘বৈরুত, তুমি আমার বড় দুঃখ!’ দ্বিতীয় বাক্যে লিখেছেন, ‘আমরা তোমাকে আবারও নির্মাণ করতে সাহায্য করব।’ দরদ দিয়ে বলেছেন, ‘জানি, তুমি ভালো নেই। কিন্তু আমরা সবাই আছি। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।’

বৈরুতের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ফ্লায়হান তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে দাতব্য কর্মসূচিতে হাজির হচ্ছেন। সংগ্রহ করছেন অনুদান।

জীবনের ছবি

default-image

গেমাইজাহ অঞ্চলের একটি আলোকচিত্রে কার্টুনের সাহায্যে বৈরুতের সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন শিল্পী। ৩৫ বছর বয়সী টনি মালুফ পেশায় ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্ট। নিজের এই শিল্পকর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি প্রাত্যহিক জীবনের স্কেচ এঁকেছি। সঙ্গে আলোকচিত্রের মিশ্রণ করেছি বাস্তবতাকে এক সুতোয় বেঁধে নেওয়ার জন্য। সব লেবানিজের মতো আমিও এখনো ক্ষোভ, বেদনা ও অবিশ্বাস নিয়ে ৪ আগস্টের ঘটনা সামলে উঠতে পারিনি।’

বিজ্ঞাপন

প্রতীক ও সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি

default-image

সিডারগাছ লেবাননের জাতীয় প্রতীক। অন্যদিকে সংগীতজগতে আরববিশ্বে লেবানিজ গায়িকা ফায়রুজের রয়েছে সুপরিচিতি। ‘লি বাইরুত’ ও ‘মাউত্বিনি’ শিরোনামের দেশাত্মবোধক দুটি গানের জন্য লেবাননে ফায়রুজের জনপ্রিয়তা অতুলনীয়। ওমর আবদাল্লাত (৪১) লাল প্রচ্ছদের মধ্যে ফায়রুজের মুখের ওপর সবুজ সিডারগাছ এঁকে দিয়েছেন। সিডারগাছ যেন ফায়রুজের মায়াবী গালে গড়িয়ে পড়া অশ্রু।

চিত্রটি সম্পর্কে এই কার্টুনিস্ট বলেন, ‘লেবানন শব্দটি শোনামাত্র আমার মনে পড়ে ফায়রুজের মুখ। বৈরুত হলো সংস্কৃতির শহর। ফায়রুজ হলেন লেবাননের সব সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। দেশের মতো তিনিও সব পরিস্থিতিতেই সুন্দর। সৌন্দর্যের রাজধানী বৈরুতের এই বিধ্বস্ত চেহারা আমার সহ্য হচ্ছে না। এই বেদনাদায়ক ঘটনা যদি দায়ী ব্যক্তিদের বোধশক্তি জাগিয়ে তুলত। আমি জানি, বৈরুতের মানুষই শুধু পারে এই শহরকে আবারও আগের মতো নির্মাণ করতে।

রক্তঝরা বৈরুত

default-image

বৈরুত বিস্ফোরণের খবর যখন টেলিভিশনে দেখেন, রাছা আল আব্বাস তখন দুবাইয়ে, তাঁর স্টুডিওতে। লেবানিজ এই শিল্পী সাদা ক্যানভাসে লাল রং দিয়ে লিখেছেন বৈরুত শব্দটি। আরবি হরফে লেখা এই শব্দের প্রতিটি অক্ষর থেকে যেন রক্ত ঝরছে। প্রতীকীভাবে রক্তাক্ত বৈরুতকে ইঙ্গিত করে তাঁর এ ক্যালিগ্রাফি।

রাছা আল আব্বাস বলেন, ‘বৈরুত আমার জন্মস্থান। বৈরুত আমাকে বড় করেছে।’ ৪০ বছর বয়সী এ নারী বিস্ফোরণের খবর দেখার পরপরই রং-তুলি নিয়ে ইজেলের সামনে বসে যান।’ আমি যত শিল্পকর্ম তৈরি করেছি, এটি তার মধ্যে একান্ত ব্যক্তিগত। আমার সব আবেগ ঢেলে এ কাজটি করেছি। দেখতে খুব সাদামাটা। কিন্তু আবেগটা নিখাদ। বৈরুতের রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’ শিল্পী বলেন।

বিজ্ঞাপন

ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠো বৈরুত

default-image

বতমানে সৌদি আরবের বাসিন্দা ওমর মুগারবেল (২৭) এ চিত্রটি এঁকেছেন। ছবিতে বৈরুত বন্দরে বিস্ফোরণস্থল থেকে নীল আকাশের দিকে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। চিত্রের ওপরে সাদা কালিতে বড় বড় হরফে লেখা নিজার কাব্বানির একটি বিখ্যাত কবিতার পঙ্‌ক্তি। ‘ইয়া বৈরুত, সিত্তিত দুনইয়া’ (হে বৈরুত, মহাবিশ্বের রানি) শিরোনামের এ কবিতাটি গেয়েছেন বিখ্যাত গায়িকা মাজিদা আল-রুমি। ফলে এ কবিতার সঙ্গে বৈরুতবাসীর রয়েছে ঘনিষ্ঠ পরিচয়। পঙ্‌ক্তিটি হলো ‘কু মি মিন তাহতির রিদম’ (ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠো, বৈরুত)।

মুগারবেল বলেন, ‘এই পঙ্‌ক্তিতে রয়েছে লেবাননবাসীর জন্য সময়োপযোগী বার্তা। বৈরুত শহরেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এর অলিগলিতে রয়েছে আমার অসংখ্য স্মৃতি। এ শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। বৈরুত আগেও সাতবার ধ্বংস হয়েছিল, এ গল্প শুনে শুনে আমরা বড় হয়েছি। এবারকার ধ্বংস শারীরিক ও মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি বিধ্বংসী। তবু আমরা হাল ছাড়ব না। আমাদের বিপ্লব কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আমাদের ভালোবাসার বৈরুতকে নিয়ে কারও হতাশ হওয়া উচিত হবে না।’

ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে

default-image

বিস্ফোরণের দুই দিন পর। নুর সালিবা বৈরুতের মার মিকেইল এলাকায় অবস্থিত তাঁর ভবনের উড়ে যাওয়া জানালার সামনে দাঁড়িয়ে। খোলা জানালা দিয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বৈরুত বন্দর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে উঁচু কোনো ভবনের বাধা নেই। সালিবা বলেন, ‘সত্য কথা বলতে গেলে আমার জন্য এ বিস্ফোরণ তুলনামূলকভাবে স্বস্তিকর। আমি শুধু বসবাসের ঠাঁইটুকু হারিয়েছি। আমি সেই সব সৌভাগ্যবানের একজন, যাদের পাশে পরিবার ও বন্ধুজন অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।’ সাতাশ বছর বয়সী এই মডেল আরও বলেন, ‘এই বিস্ফোরণের প্রতিটি ধূলিকণা ও ধোঁয়ার মধ্যে লেখা রয়েছে মারাত্মক আঘাত। হ্যাঁ, আমরা সবাই মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা আমরা ভীষণ ক্লান্ত।’ ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের জন্য নুর সালিবার এ ছবিটি তুলেছেন মরিয়াম বোলোস।

আধুনিক আরবি কবি আলি আহমদ সাইদ ইসবারআদোনিস নামের যে গ্রিক দেবতার নামে খ্যাতি পেয়েছেন সে আদোনিসও ছিলেন পৃথিবীর পুরোনো শহর বৈরুতের বাসিন্দা। গ্রিক পুরাণমতে, সৌন্দর্য ও বাসনার এই দেবতাকে যখন হত্যা করা হয় তখন আদোনিসের প্রেমিকা আফ্রোদিতি তার রক্তের ওপর অমৃতের ধারা বইয়ে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফুটেছিল নতুন ফুল।

ঢাকায় বসে পুরোনো এই মায়াবী শহরের জন্য প্রার্থনা—বৈরুত জেগে থাকুক। ফুল ফুটুক আবার এই স্বর্গীয় উদ্যানে।

অন্য আলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0