কেলাজ: মনিরুল ইসলাম
কেলাজ: মনিরুল ইসলাম

স্মিত হাস্য, সৌম্য দর্শনের মানুষটার সঙ্গে পরিচয় সিটি কলেজের শ্রেণিকক্ষে। তিনি শিক্ষক, আমি ছাত্র। কিন্তু ছাত্র–শিক্ষকের কোনো গুরুগম্ভীর সম্পর্ক তিনি তৈরি হতে দেননি। প্রথম দিন থেকেই তিনি মিশেছেন বন্ধুর মতো। দিনে দিনে হয়ে উঠেছেন প্রিয় অভিভাবক। ভালোবেসে কাছে টেনেছেন। তরুণ বয়সে ছাত্রকে ভুল পথে পা বাড়াতে দেখলে শাসন করেছেন।

মানুষটি ছিলেন হিমেল বরকত। ২০০৫–০৬ সালে সিটি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ‘ই’ শাখায় বাংলা পড়াতেন। বাংলা পড়ালেও তাঁর ক্লাস শুধু পাঠ্যবইয়ে আটকে থাকত না। জীবনের নানা বিষয়ে তিনি কথা বলতেন। ভবিষ্যতের জন্য দিতেন পরামর্শ। হিমেল স্যার ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

একবার টিফিনের পরে কয়েক বন্ধু মিলে ক্লাস পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যাই কলেজের ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্যদের কাছে। কলেজের আইডি কার্ড রেখে দেওয়া হয়।

আইডি কার্ড ফিরে পেতে সাহায্য করেন হিমেল স্যার। কিন্তু কার্ড ফেরত দিয়েই ক্ষান্ত হননি। ক্লাসে মনোযোগী হতে, নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে উৎসাহিতও করেছিলেন।

স্যার পড়িয়েছিলেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র ধরে আলোচনা করতেন। কুবের, কপিলা, হোসেন মিয়াকে শুধু উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে পড়াননি, জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। পদ্মাতীরের মাঝিদের দুঃখ-কষ্টগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অসামান্য দক্ষতায়।

বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে কিছুটা ভীতি ছিল। হিমেল স্যারের সঙ্গে ক্লাসের বাইরেও দেখা হলে এই বিষয়ে কথা বলতেন। এইচএসসি পরীক্ষার আগেই ব্যাকরণভীতি কাটিয়ে দিয়েছিলেন হিমেল স্যার। আমাদের একটা আড্ডা ছিল কলেজের বাইরে (এখন পপুলার ডায়াগনস্টিক)। মাঝেমধ্যে হিমেল স্যার সেখানেও চলে আসতেন।

বিজ্ঞাপন

এইচএসসি পরীক্ষা শেষে কলেজ ছেড়ে আসার পর বেশ কয়েক দিন হিমেল স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। একদিন মিরপুরে হঠাৎ দেখা। কথায় কথায় জানালেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বললেন, ভবিষ্যতেও যোগাযোগ রাখতে।

default-image

ভাগ্যের কী খেলা! কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ মিলল জাহাঙ্গীরনগরেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হলাম। ক্লাস শুরুর পরে একদিন গেলাম বাংলা বিভাগে। কলেজজীবনের প্রিয় শিক্ষক এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। ছেড়ে আসা কলেজের একজন সাবেক ছাত্রকে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে হিমেল স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন।

এরপর হিমেল স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে সময়–অসময়ে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলায়, কখনো ট্রান্সপোর্ট চত্বরে। স্যার সাহিত্যচর্চা করতেন, তাই বই পড়তে উৎসাহ দিতেন। নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে তিনি জাহাঙ্গীরনগরকে মিশিয়ে নিয়েছিলেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো–মন্দ নিয়ে কথা বলতেন। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির ধরন নিয়ে স্যারের বেশ আপত্তি ছিল। শান্তিপ্রিয় হিমেল বরকত স্যার শক্তির মহড়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ছাত্রদের যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে পাশে থাকতেন।

২০১২ সালে ছাত্ররাজনীতির এক কালো অধ্যায়ের সাক্ষী হতে হয়। অন্তঃকলহের জেরে বন্ধুদের হাতেই প্রাণ হারায় আমাদের ব্যাচের বন্ধু জুবায়ের। জুবায়েরের বন্ধু, ভাইবোনেরা মিলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে আন্দোলন শুরু করে। হিমেল স্যার পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন এই আন্দোলনে।

জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে একসময় সাংবাদিকতা শুরু করি। যোগ দিই ‘প্রথম আলো’তে। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে আসে। শেষ দিকে যোগাযোগ বলতে ফেসবুকে খোঁজ নেওয়া। স্যারের কোনো বই প্রকাশ পেলে, জন্মদিবসে বা কোনো সুসংবাদে শুভেচ্ছা বিনিময়। অনেক দিন হিমেল স্যারের সঙ্গে দেখা হয়নি।

গতকাল যখন স্যারের অসুস্থতার কথা শুনি, একটাই প্রার্থনা ছিল, স্যার সুস্থ হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসুন। আমার মতো স্যারের অগণিত শিক্ষার্থী, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রার্থনা বিফলে গেছে। ওপারের ডাকেই সাড়া দিয়েছেন হিমেল স্যার।

এত কীসের তাড়া ছিল জানি না। আপনার এই চলে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বাংলা সাহিত্যের। আপনি একজন আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ মানুষ হিসেবেই স্মৃতিতে অমলিন থাকবেন। ভালো থাকবেন প্রিয় শিক্ষক হিমেল বরকত।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0