বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লেখা তো আমি প্রতি সপ্তাহেই লিখি। প্রথম আলোর জন্য, কিশোর আলোর জন্য, অন্য যেকোনো অনুরোধে কিংবা নিজের তাগিদে! তাহলে হাসান আজিজুল হককে নিয়ে লিখতে কেন গড়িমসি করলাম?

তার কারণ, এই লেখাটাকে নিত্যনৈমিত্তিক কোনো লেখা করে তুলতে চাইনি। আমাদের কালের সবচেয়ে নিপুণ, সবচেয়ে বড় কথাশিল্পীকে নিয়ে লেখাটাকে তাঁর নাম নেওয়ার যোগ্য করে তুলতে চেয়েছিলাম। তাই হুট করে বসে পড়ে একটানের লেখা লিখতে চাইনি। একটা উদাহরণ দিই। আমাদের বন্ধু কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম, দস্তয়ভস্কির ২০০তম জয়ন্তী উপলক্ষে আমার কাছে একটা লেখা চেয়েছেন। ওই লেখাও লিখতে বসা হয়ে উঠছে না। দস্তয়ভস্কিকে নিয়ে তো একটা পেনসিলের দ্রুতরেখ স্কেচ দেওয়া যায় না। ভালো করে লিখতে হবে।

হাসান আজিজুল হকের ওপর লেখাটা তাঁর নামের উপযুক্ত করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি, সময়, অবসর হাতে নিয়ে লিখব, এই নিয়ত ছিল বলে লেখাটা হয়ে ওঠেনি। আজ তিনি নেই। একটু পরে রাজশাহীর মাটিতে তাঁর শেষ ঠাঁই হবে। তাঁর কবরে মাটি দেওয়া হবে। তার আগেই আমি আমার ঋণটা শোধ করতে আজ সকাল সকাল কম্পিউটারে বসেছি।
রংপুর জিলা স্কুলে প্রতি সপ্তাহে লাইব্রেরি ক্লাস হতো। লাইব্রেরিয়ান স্যার ছিলেন ছোটখাটো, তিনি গোটা ত্রিশেক বই কোলে করে নিয়ে ক্লাসে আসতেন, সঙ্গে হয়তো একজন দপ্তরি, তারও কোলে থাকত আরেকটা বইয়ের গাট্টি! স্যার একটা একটা করে বইয়ের নাম পড়তেন। আমরা হাত তুলতাম, কে কোন বই নেব। এর মধ্যে ছিল ‘হরফ এলো কোথা থেকে’, ‘বিদেশি সেরা গল্প’, ‘আমি গাধা বলছি’। আর একটা নাম স্যার পড়তেন। ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’। সেই বই ক্লাস সেভেন–এইটে থাকতেই পড়ে ফেলেছিলাম। গল্পগুলো গল্প হিসেবেই পড়েছিলাম, সাহিত্যিক গল্প বা লিটেরারি ফিকশন যে একটা আলাদা জনরা, তা তো তখন জানতাম না। আর গল্প হিসেবে পড়েই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

আর আছে ‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’। এ বছরও পড়েছি। বারবার করে পড়ি। যেমন করে মানুষ তার প্রিয় গানটা বার বার শোনে, যেমন করে প্রিয় কবিতা বার বার পড়ে, যেমন করে নদীবক্ষে বা সমুদ্রতটে সূর্যাস্ত প্রতিদিন দেখলেও তা পুরোনো হয় না, তেমনি ‘আত্মজা ও করবীগাছ’ আমার কাছে কোনোদিন পুরোনো হয় না। প্রতিবার মুগ্ধ হই, বিস্মিত হই। এসব বাক্যের একটাও আমি কোনোদিনও লিখতে পারব না। বাংলাদেশে তাঁর কয়েকজন অনুকারক আছেন, কিন্তু হাসান আজিজুল হককে কি নকল করা যায়! অনুসারীদের লেখাগুলো আমার কাছে হাস্যকর লাগে!

‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’–এর শুরুটা এমন:
‘এখন নির্দয় শীতকাল, ঠান্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায়, একবার পিঠ দেখায়। ওদিকে বড় গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের বাড়ির টিনের চাল হিম ঝক ঝক করে।’
আমরা জানি, আমরা যারা গদ্য লিখি, তাদের শেখানো হয়, গদ্যে সবচেয়ে বড় বিপদের নাম বিশেষণ। দুর্বল লেখকেরা অকারণ বিশেষণ ব্যবহার করেন, নিজেদের লেখাকে রেডিও ম্যাগাজিনের কাব্যি করে তোলেন; শক্তিমান লেখকদের জন্য বিশেষণ এক বিশাল এবং মোক্ষম উপকরণ, লেখাটাকে বুটিদার করে তোলে, শিল্পসুষমায় লেখা অমূল্য হয়ে ওঠে। সালমান রুশদী তাঁর লেখালেখির ক্লাসে বলেন, একটা অনুচ্ছেদ লিখতে হবে, একটাও বিশেষণ ব্যবহার না করে।

হাসান আজিজুল হক সাম্যবাদে বিশ্বাস করতেন। গুপ্তপার্টির কর্মীদের নিয়ে তাঁর গল্প আছে। কিন্তু পার্টির ফুলটাইমারদের মতো তাঁর গল্প লাল সূর্যের উদয় দিয়ে শেষ হতো না। ফাঁদের গল্পই তিনি লিখতেন। অস্তিত্ববাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। যদিও তিনি বক্তৃতায়, ভাষণে সব সময় আশার কথাই বলতেন। শিল্পিতার বেলায় তিনি তত্ত্বের শাসন মানতেন না। হৃদয়ের দাবিই মেটাতেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে ছিলেন। ঘাতকেরা তাঁকে টার্গেট করেছিল, তা নিয়েও তিনি একটা শ্বাসরুদ্ধকর গল্প লিখেছেন।

এইখানে দেখুন, হাসান আজিজুল হক কতগুলো বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। শীতকাল ‘নির্দয়’, ঠান্ডা হলো ‘হিম’, বাতাস ‘অল্প’, কলাপাতা ‘বড়’, আর বড় হলো ‘গঞ্জ’টা। বিশেষণ আছে, বিশেষণের বাড়াবাড়ি নেই, কিন্তু আছে অনবদ্যতা। ওই শীতকালকে নির্দয় না বললে যে পুরো গল্পটাই দাঁড়ায় না। এই শীতকাল যে কত নির্দয়, গল্পের শেষ লাইনে আমরা সেটা জানব। এই প্রথম তিন বাক্যের সবচেয়ে সুন্দর লাইনটা বোধ হয়, ‘অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায়, একবার পিঠ দেখায়।’ আমি হলে লিখতাম, ‘বাতাস বইছে অল্প অল্প, আর একটা কলাগাছের পাতার ছায়া জ্যোৎস্নায় মাটিতে আলতোভাবে গড়াগড়ি খাচ্ছে।’ কিংবা লিখতাম, ‘বাতাসে পাতা নড়ছে অল্প অল্প।’ কিন্তু ‘একবার বুক দেখায়, একবার পিঠ দেখায়’—এই বাক্য আমার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। সম্ভবত এটা লিখতে পারেন দুই বাংলায় কেবল একজন, তাঁর নাম হাসান আজিজুল হক।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র প্রথম লাইন: ‘খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন।’ এই কটাক্ষ দিয়ে বাজ পড়া বোঝানোর মতোই কলাগাছের বুক দেখানো আর পিঠ দেখানো।

যেমন ওই লাইনটা—রেডিওর ভলিউম একজন কমিয়ে দিল। রেডিওতে কণিকার রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছিল। এই কথাটা হাসান লিখলেন: ‘কণিকার গলা টিপে দিল ফেকু।’ কী সাংঘাতিক বাক্য!

default-image

আর এর শেষটা! দেশভাগের যন্ত্রণায় জর্জরিত, কেবল মানসিক যন্ত্রণায় নয়, আর্থিক অনটনে জেরবার বাবা নিজের মেয়েকে তুলে দিচ্ছেন পাড়ার ছেলেদের হাতে, তিনি বিলাপ করছেন,

‘এখানে যখন এলাম—আমি প্রথম একটা করবীগাছ লাগাই...তখন হু হু করে কে কেঁদে উঠল, চুড়ির শব্দ এল, এলোমেলো শাড়ির শব্দ আর ইনামের অনুভবে ফুটে উঠল নিটোল সোনারঙের দেহ—সুহাস হাসছে হি হি হি—আমি একটা করবীগাছ লাগাই বুঝলে? বলে থামল বুড়ো, কান্না শুনল, হাসি শুনল, ফুলের জন্যে নয়, বুড়ো বলল, বিচির জন্যে, বুঝেছ, করবী ফুলের বিচির জন্যে। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে। আবার হু হু ফোঁপানি এল আর এই কথা বলে গল্প শেষ না করতেই পানিতে ডুবে যেতে, ভেসে যেতে থাকল বুড়োর মুখ—প্রথমে একটা করবীগাছ লাগাই বুঝেছ আর ইনাম তেতো তেতো—অ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? অ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? অ্যাহন কাঁদতিছ তুমি?’

এই পরিস্থিতির এই ছবি আর কে আঁকতে পারবে? এই দৃশ্যকল্প! অসহায়, অক্ষম পিতার দৃষ্টিকোণের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে যুবকদের একজনেরও দৃষ্টিভঙ্গি...পারসপেকটিভ মিলেমিশে যাচ্ছে, লন্ঠনের আলোয় পড়া ছায়ার মতো দোল খাচ্ছে, আর দুলে উঠছে আমাদের পায়ের নিচের পৃথিবী, আমাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে! আহ, বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পটা লেখা হয়ে যাচ্ছে।

হাসান আজিজুল হক মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসতেন। এলে তিনি আমাদের ‘ভোরের কাগজ’–এর অফিসে আসতেন। আমাদের ‘প্রথম আলো’র অফিসে আসতেন। আমরা—আমি, মশিউল, জাকারিয়া, সাজ্জাদ শরিফ ভাই, যখন ইমতিয়ার শামীম ‘ভোরের কাগজ’–এ আমাদের সঙ্গে ছিলেন, তখন ইমতিয়ার শামীম; যখন বেঁচে ছিলেন তখন লতিফ সিদ্দিকী, কিংবা যখন ঢাকায় আমাদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডায় আসতেন হুমায়ূন রেজা—আমরা ভিড় করে হাসান স্যারকে ঘিরে ধরে বসে থাকতাম। হাসান স্যারের মতো রসিক, আড্ডাবাজ, বুদ্ধিজীবিতায় ঋদ্ধ কথক তো আর আমাদের দ্বিতীয়টি ছিলেন না। আমরা তাঁর কথা শুনতাম। অন্যের বেলায় কী হতো জানি না, আমি হা করে তাঁর কথা গিলতাম। মনে পড়ে, কলাবাগানে কি ভূতের গলিতে স্যারের বোনের বাসা ছিল, সেখানেও গিয়েছি। একবার তো এক বিরল সৌভাগ্য আমার জীবনকে পরশমণির মতো সোনা করে তুলেছিল, আমি হাসান আজিজুল হক স্যারের সঙ্গে একই মাইক্রোবাসে করে গিয়েছিলাম ঢাকা থেকে নেত্রকোণা। নেত্রকোণায় পৌষমেলা সংবর্ধনা দেবে হুমায়ূন আহমেদকে, হাসান আজিজুল হক প্রধান অতিথি। আমি, কবি ফরিদ কবির ভাই তাঁর সঙ্গী হিসেবে আমন্ত্রিত।
সারা রাস্তা আমি হাসান স্যারকে একটুও জিরোতে দিইনি। আমার কত কী যে জানার আছে! স্যারের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে!
স্যার, জাদুবাস্তবতা কেমন লাগে?
উত্তর—আধুনিকতা?
স্যার, গদ্যে যখন কেউ কাব্যি করে, আপনার কী মনে হয়!

স্যার অনেক কথা বলেছিলেন। একটা কথা আমি বলি, স্যার বক্তৃতায় যা বলতেন, তার সবটা তিনি লিখে বলেননি। নেত্রকোণার বক্তৃতায়ও তিনি আমাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক অনেক কিছু বলেছেন। অন্য বক্তৃতায়ও বলেছেন। কিন্তু সেসব লিখে বলেননি। আবার প্রকাশ্য বক্তৃতায় যা বলতেন, তাতে তাঁর মনের সবটা উন্মোচন করেননি, করতে হয় না আসলে, কিন্তু আমার সঙ্গে সেই আড্ডায় তিনি অনেক কথা বলেছিলেন, যেসবের মধ্যে তাঁর মনের আসল কথাটা হয়তো ছিল।

একবার হলো কী, হাসান স্যার এসেছেন ঢাকা বইমেলায়, যেটার আয়োজন করত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। সেই মেলায় তেমন ভিড় হতো না। আমার যত দূর মনে পড়ে, ওই বইমেলা আগারগাঁওয়ের কোনো মাঠে হচ্ছিল। তো আমি আর রশীদ হায়দার ভাই হাঁটছি। দূরে দেখি, হাসান আজিজুল হক। আমি তো দেবদূতকে দেখেছি, এই রকমের মুগ্ধতা আর ইন্দ্রজালগ্রস্ততা নিয়ে হাসান স্যারের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলাম। এরই মধ্যে আমার তরুণ পাঠকেরা আমাকে অটোগ্রাফের জন্য ঘিরে ধরার চেষ্টা করছে, আমি তাঁদের বললাম, ‘না, এখন না, দেখছ না, সামনে কে?’ আমার সেই আগুনের দিকে পতঙ্গের মতো ছুটে চলা দেখে রশীদ হায়দার হেসে ফেললেন। বললেন, হাসান ভাইকে দেখে আনিস যে পাগল হয়ে গেল।

আমি এ রকমই ছিলাম হাসান স্যারের ব্যাপারে।
আমরা অনেকেই ঈদসংখ্যাগুলোয় লিখি। আমিও লিখি। আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখকেরা লেখেন। কিন্তু ঈদসংখ্যা বেরোনোর পর দেখা যেত, সবচেয়ে ভালো গল্পটা লিখেছেন কে? না, ওই চিরপুরাতন–চির নবীন হাসান আজিজুল হক। যেমন: ‘মা-মেয়ের সংসার’। এই রকম গল্প আর কে লিখতে পারবে?

কিন্তু তিনি শুধু ভালো ছোটগল্প বা উপন্যাস লিখে যাননি। শিল্পিতা অনেকেরই থাকে, অনেকেই অসাধারণ শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু একই সঙ্গে ভালো ভাবুক, ভালো চিন্তক, যিনি যুক্তিপরম্পরা সাজিয়ে ভালো প্রবন্ধও লিখতে পারেন, আবার সৃষ্টিশীল শিল্পও রচনা করতে পারেন, এমনটা কিন্তু কমই দেখা যায়। আপনি শামসুর রাহমানের কাছে ভালো গদ্য আশা করলে হয়তো হতাশ হবেন। কিন্তু আমি মুগ্ধতা, বিস্ময়, অভিভব নিয়ে হাসান আজিজুল হকের প্রবন্ধগুলো পাঠ করি, বারবার পাঠ করি; আর ভাবি, দর্শনের এই অধ্যাপক কী করে একই সঙ্গে শিল্পের সোনার হরিণ আর প্রবন্ধের কল্পতরুটাকে একই আঙিনায় বেঁধে রাখলেন!

‘কথাসাহিত্যের কথকতা’ বইয়ে মার্কেজকে নিয়ে লিখতে গিয়ে হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন: ‘সব মিলিয়ে ফাঁদের গল্প। মানুষ এক ফাঁদ থেকে আর এক ফাঁদে পা দিচ্ছে, তারপর একসময় পুরোপুরি আটকে পড়ছে। ইতিহাসের ফাঁদ, অর্থনীতির ফাঁদ, স্বৈরতন্ত্রের ফাঁদ, সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদ, ভাগ্যের চাকার ফাঁদ, সম্পূর্ণ নির্দোষের অজানা ফাঁদ আর সেই বিশাল মহাদেশীয় ফাঁদ, যার থেকে নিস্তার নাই আজকের পৃথিবীর কারও। তারই গল্প লেখেন বটে মার্কেজ, যিনি মানুষের অবসান অস্বীকার করেন আর বিশ্বাস করেন এখনো সময় আছে, সময় আছে দ্বিতীয় সুযোগের, সময়ের মধ্যে ঢোকার।’ (‘মহাদেশের কথক: গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ’; ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’, হাসান আজিজুল হক)

হাসান আজিজুল হক সাম্যবাদে বিশ্বাস করতেন। গুপ্তপার্টির কর্মীদের নিয়ে তাঁর গল্প আছে। কিন্তু পার্টির ফুলটাইমারদের মতো তাঁর গল্প লাল সূর্যের উদয় দিয়ে শেষ হতো না। ফাঁদের গল্পই তিনি লিখতেন। অস্তিত্ববাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। যদিও তিনি বক্তৃতায়, ভাষণে সব সময় আশার কথাই বলতেন। শিল্পিতার বেলায় তিনি তত্ত্বের শাসন মানতেন না। হৃদয়ের দাবিই মেটাতেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে ছিলেন। ঘাতকেরা তাঁকে টার্গেট করেছিল, তা নিয়েও তিনি একটা শ্বাসরুদ্ধকর গল্প লিখেছেন।

default-image

একসময় আমি একটা প্রবন্ধে লিখেছিলাম:
‘হাসান আজিজুল হকের নিজের মধ্যেও এই দ্বন্দ্ব বিলকুল আছে। তিনি একই সঙ্গে বিশ্বাস করেন সেই বিশাল মহাদেশীয় ফাঁদ, যার থেকে নিস্তার সেই কারও। আবার তিনি ক্রমাগতভাবে লড়াই করে চলেছেন মানুষের মুক্তির। তাঁর গল্পেও এটা ঘটে। তাঁর ‘সাক্ষাৎকার’ গল্পটায় একটা লোককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেন নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে জানে না। ব্যাপারটা পুরোপুরিই কাফকায়েস্ক। কিন্তু আমার সঙ্গে আলাপকালে হাসান আজিজুল হক এ গল্পের কাফকাধর্মী ব্যাখ্যা মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং এটা রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তিমানুষের দ্বন্দ্বের গল্প—এ ব্যাখ্যাটাকে পছন্দ করেন। হাসান আজিজুল হক তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বৃত্তায়ন’ লিখে যে ফেলেছেন, এটা সত্য। খুবই অস্তিত্ববাদী ঘরানার গল্প, বৃত্তাবদ্ধ জীবনের গল্প, পলায়নবৃত্তির গল্প। এখন তিনি ওই উপন্যাসটিকে অস্বীকার করতে চান। এই হলো স্বতঃস্ফুর্ত প্রবণতার সঙ্গে অর্জিত মূল্যবোধের দ্বন্দ্বের ব্যাপার।’

জীবনটাই তো আসলে দ্বন্দ্বের সমষ্টি। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে থাকলে বলতাম: সামেশন অব ডায়ালেকটিকস। দ্বন্দ্ব আছে বলেই তো বিকাশ ঘটে।
হাসান আজিজুল হক দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, বুদ্ধিজীবিতা, পাণ্ডিত্যের সঙ্গে শিল্পসুষমার দ্বন্দ্ব নিয়ে কী সুন্দর একটা জীবন কাটালেন আর আমাদের জীবনটাকে সুন্দর করে গেলেন, ভাবলে শুধু বিস্ময়ই বোধ করি!

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি, ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি।’
আজ তাঁর তিরোধানকালে তাঁকে প্রণতি জানাই, যা জানিয়ে যাব আমার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত।
তাঁর জীবদ্দশায় যে লেখা লিখিনি, মৃত্যুর পরেও তা লিখতে পারলাম না। তাঁর যোগ্য একটা লেখা লিখে ওঠার জন্য আমাকে আরও যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। আরেকটু অবসর আমাকে জোগাড় করে নিতে হবে।

মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন