বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘এইসব দিনরাত্রি’র আগে টেলিভিশনে জনপ্রিয় হয়েছিল আরেকটা ধারাবাহিক—‘সকালসন্ধ্যা’। ‘এইসব দিনরাত্রি’ও প্রায় একই ঘরানার। ‘এইসব দিনরাত্রি’ ১৪ দিন পরপর প্রায় এক ঘণ্টা দেখানো হতো, অলটারনেটিভ মঙ্গলবারে। একবারই মাত্র দেখেছি একেকটা পর্ব। তাতেই সংলাপ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। এখনো মনে আছে। রফিকের চরিত্র করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। ডলি জহুর তাঁর ভাবি। আসাদুজ্জামান নূর বেকার। একটু পরপর এসে বলতেন, ‘ভাবি, এক কাপ চা হবে?’ তারপর একদিন রফিক বিয়ে করে আনল এক মেয়েকে। লুৎফুন নাহার লতা করেছিলেন সেই নববধূর চরিত্র। রফিকের মা হলেন দিলারা জামান। এই শাশুড়ি নববধূকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘বউমা, তুমি কেমন মেয়ে বলো তো! রফিকের নাহয় বুদ্ধিশুদ্ধি নাই, তুমি তো লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মেয়ে, বলা নাই কওয়া নাই, এই রকম একটা বেকার ছেলের সাথে হুট করে চলে এলে!’

default-image

এই সংলাপ আমি মুখস্থ লিখছি। আজ থেকে প্রায় ৩৩ বছর আগে টিভিতে একবার শুনেছিলাম। কী রকম জাদুগ্রস্ত করে রেখেছিল নাটকটি আমাদের! ওই নাটকে একটা চরিত্র ছিল—আনিস। করেছিলেন যুবরাজ তথা খালেদ খান। বেকার ছেলে। বাড়িতে আশ্রিত থাকে। তার প্রেমে পড়ে যায় বাড়ির মেয়ে সাহানা। এ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শিল্পী সরকার অপু। আনিস ছেলেটা জাদু দেখাতে পারত। শূন্য থেকে গোলাপ বের করতে পারত। হুমায়ূন আহমেদ পরে, গোলাপের ব্যাপারটা তিনি নিয়েছিলেন সৈয়দ শামসুল হকের ‘রক্ত গোলাপ’ থেকে। সেই নাটকে নূর ভাইয়ের বড় ভাইয়ের চরিত্র করেছিলেন বুলবুল আহমেদ। তাদের মেয়ে টুনির ক্যানসার। সে মারা যাবে। একটা সংলাপ আজও মনে আছে। বুলবুল আহমেদ বলছেন, ‘দেখো, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’। ডলি জহুর বলছেন, “যদি সবকিছু ঠিক না হয়!” না। ঠিক হয়নি। আমাদের কাঁদিয়ে টুনি মারা গেল। আশা-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা নিয়েই আমাদের ‘এইসব দিনরাত্রি’। এরপর হুমায়ূন আহমেদ টেলিভিশনে যা–ই করেন, তা-ই অসাধারণ লাগত আমাদের কাছে। এ সপ্তাহের নাটক, ঈদের হাসির নাটক, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’। তত দিনে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে বইমেলা প্রবর্তিত হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রি হতে লাগল মুড়িমুড়কির মতো।

প্রথম দিকে বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ আসতেন। সন্ধ্যার পর। বইমেলার ভেতর বাংলা একাডেমির বয়রাতলায় তখন খাবারের স্টল বসত। লেখকেরা রাত দশটা অবধি সেই স্টলে আড্ডা দিতেন। ১৯৮৭/৮৮ সাল থেকে জাতীয় কবিতা উৎসবের পর থেকে আমিও কবিদের পেছন পেছন ঘোরার এবং তাঁদের সঙ্গে এক টেবিলে বসার সুযোগ গ্রহণ করতাম। আমার মনে আছে, বইমেলায় চায়ের স্টলে হুমায়ূন আহমেদ, শামসুর রাহমান, মহাদেব সাহা প্রমুখ আড্ডা দিচ্ছেন, আমিও একই টেবিলে বসে আছি। কবি ফেরদৌস নাহার এসে ডাকনামে আমাকে ডেকে বললেন, ‘মিটুন, তুমি যে একেবারে বড়দের দলে যোগ দিয়ে ফেলেছ।’ আমি খুবই লজ্জা বোধ করলাম।

প্রথম দিকে বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ আসতেন। সন্ধ্যার পর। বইমেলার ভেতর বাংলা একাডেমির বয়রাতলায় তখন খাবারের স্টল বসত। লেখকেরা রাত দশটা অবধি সেই স্টলে আড্ডা দিতেন। ১৯৮৭/৮৮ সাল থেকে জাতীয় কবিতা উৎসবের পর থেকে আমিও কবিদের পেছন পেছন ঘোরার এবং তাঁদের সঙ্গে এক টেবিলে বসার সুযোগ গ্রহণ করতাম।

আমি তখন ‘ভোরের কাগজ’–এ কাজ করি। ১৯৯৩ সালের দিকে। ‘বইমেলা প্রতিদিন’ নামে ‘ভোরের কাগজ’–এর শেষ পৃষ্ঠায় লিখি। হুমায়ূন আহমেদ বইমেলায় এলে তাঁর কাছে যাই। ভিড়ের কারণে কাছে যাওয়াও কঠিন। ১৯৯৫ সালের পর একবার বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ এসেছেন। আমি প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে স্যারের কাছে গেলাম। একটা বাচ্চাদের বই কিনে নিলাম। আমার মেয়ে পদ্যর জন্য অটোগ্রাফ চাইলাম। হুমায়ূন লিখে দিলেন, ‘পদ্য, তুমি কেমন আছ?’

আমি সেই অটোগ্রাফ দেখেই বুঝে ফেললাম, কেন হুমায়ূন, হুমায়ূন! অন্য যে কেউ হলে লিখতেন, পদ্যকে আদর। পদ্যকে শুভেচ্ছা। কিন্তু হুমায়ূন তো হুমায়ূন। তিনি লিখলেন, ‘পদ্য, তুমি কেমন আছ?’

১৯৯০ সালে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সাপ্তাহিক ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকায় একটা গদ্যকার্টুন লিখেছিলাম। ছাগল নিয়ে লিখতে বলা হলে আমাদের লেখকেরা কে কী লিখবেন, এই ছিল কলামের বিষয়। সৈয়দ শামসুল হক, তসলিমা নাসরিন, আহমদ শরীফ থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ ছাগল নিয়ে লিখতে পারেন:

‘আমাদের বাড়িতে একটা ছাগল আনা হলো। টানা টানা চোখ। বড়ই মায়াবতী। আমার ছেলেমেয়েরা ছাগল পেয়ে উল্লসিত। তারা ছাগলকে নিয়ে গেল কাঁঠালপাতা খাওয়াতে। ছাগলটা মানুষের গলায় বলে উঠল, বড়ই লজ্জার কথা! হিসু পাইছে। আপনেরা সইরা খাড়ান।

বাচ্চারা ছাগলটাকে কাঁঠালপাতা পেড়ে দিয়েছে। সে চোখ বন্ধ করে আরামে কাঁঠালপাতা চিবুচ্ছে। যেন কাঁঠালাতা চিবোনোর চেয়ে বড় আনন্দ পৃথিবীতে আর কিছু নাই। কী সুন্দর ছাগলটা! কী বড় বড় কান। এই ছাগলকে দুই দিন পর কুরবানি দেওয়া হবে।

default-image

ছাগল আসে, ছাগল যায়, মানুষের তাতে কিছু যায়–আসে না।’
এই রকম একটা কিছু লিখেছিলাম। হাতের কাছে কপি নেই, থাকলে হুবহু তুলে দিতে পারতাম। হুমায়ূন স্যার সেই লেখা পড়েছিলেন বলে জানা যায়নি। সৈয়দ শামসুল হক পড়েছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, যে লেখক অন্য লেখকের বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে ধরে ফেলতে পারে, সে লেখক অনেক কিছুই পারে!

হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সঙ্গে আমার দেখা হতো অনুষ্ঠানে। কখনো কখনো তিনি ‘প্রথম আলো’ অফিসে আসতেন, তখন। আমার মনে পড়ে না যে আমি কোনোদিনও হুমায়ূন আহমেদের ধানমন্ডির ১১ নম্বরের জোড়া রাস্তার বাড়িতে গেছি! আমি অবশ্যই নুহাশপল্লীতেও কখনো যাইনি। আমার সঙ্গে হুমায়ূন স্যারের খাতির হয়েছিল তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে।

কিন্তু তার আগে তাঁর সঙ্গে আমার একটা বিশাল ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছিল। সেই গল্প বলব আগামী পর্বে।

মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন