কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

ষাটের দশকের শুরু। আমার কেন্দ্র, আমার শিকড়, আমার আত্মা, ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোড—আমার নানাবাড়ি। হবে নাই–বা কেন? এই একান্নবর্তী পরিবারের সব সন্তানের নাড়ি যে পোঁতা আছে ও বাড়ির দক্ষিণ–পূর্ব কোণে। যে সময়টার কথা বলছি, তখন আড়াই বিঘার ওই বাড়ি আলো করে থাকে আমার মায়ের ১০ ভাইবোনের সন্তানসন্ততি নিয়ে বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবার। চানখাঁর পুল পেরিয়ে, হাসিনা মঞ্জিলের পাশের গলিটায় ঢুকে, হাতের ডান দিকে প্রথম বসতিটাই আমার নানাবাড়ি। আসলে বাড়ি কিন্তু সেখানে চারটা। বড় রাস্তা ঘেঁষ্টে পরপর তিনটা বাড়ি। আর চতুর্থ বা মূল বাড়িটা সামনে–পেছনে ফাঁকা জায়গা ছেড়ে একা দাঁড়ানো। দুটো বাড়িতে চৌধুরী পরিবারের নিবাস। আর বাকি দুটো ভাড়া; একটি পুরোনো রেশন অফিসের কাছে আরেকটি—আমরা বলতাম, ‘চিনাম্যানদের’ কাছে। উঁচু প্রাচীর তুলে সে বাড়ি দুটো আলাদা করা।
কামিনীগাছের ছায়ায় ঢাকা সবুজ গেটটা খুলে কেউ সে বাড়িতে ঢুকলেই দেখতে পাবে সামনের উঠানে বাড়ির ছোট বড় সব বয়সী ছেলে ও মেয়েরা, একত্রে ক্রিকেট অথবা ফুটবল খেলছে। সামনের বারান্দার বাঁ কোণে শ্বেতপাথরের টেবিলের চারপাশে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে কেউ কেউ। বাড়ির দুই পোষা কুকুর ল্যাকি আর জো দুই পা সামনে ছড়িয়ে সিঁড়িতে বসে মনের আনন্দে খেলা দেখছে আর লেজ নাড়ছে। ভেতরের উঠান পেরিয়ে টানা বারান্দার ওপর সার বেঁধে রান্নাঘর, খাবার ঘর আর বংশপরম্পরা ধরে এ বাড়িতে কর্মরত গৃহকর্মীদের থাকার ঘর। বাঁ দিকের প্রাচীর ঘেঁষে বিবাহিত কর্মীদের বউ–ছেলেপুলে নিয়ে ছোট ছোট ৩/৪টে বেড়ার ঘরের সংসার! সর্বত্র কিছু না কিছু হচ্ছে। কেউ মাছ কাটছে, কেউ কাপড় ধুচ্ছে, কেউ–বা ঘরদোর গোছাচ্ছে। বম্মার জন্মের টক আঙুরের বাগান, জামিলের মুরগির ঘর, ছড়ানো–ছিটানো বরই, করমচা, ডুমুর, আতা, জাম, সফেদা আর নিমগাছ—সব মিলিয়ে ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোড।
এ বাড়ির প্যাট্রিয়ার্ক আমার নানা খান আবদুর রব চৌধুরী। সে সময় তিনি একজন বিপত্নীক অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজির অধ্যাপক। তিনি থাকেন একতলার মূল শোবার ঘরে।

বিজ্ঞাপন

বিশাল সে ঘরের অর্ধেকটাজুড়ে কারুকাজ করা গাম্বুশ এক খাট, তার সঙ্গে লাগানো তার চেয়েও বড় এক সেগুনকাঠের চৌকি। আমাদের অর্থাৎ রব চৌধুরীর অপ্রাপ্তবয়স্ক নাতি–নাতনিদের রাজত্ব এই ঘরটিতেই। কোণের ঘরে থাকেন আয়শা খাতুন চৌধুরী আর রাজিয়া খাতুন চৌধুরী—আমার দুই খালা। আমরা ডাকি বম্মা আর খাম্মা। মাঝের ঘরে থাকেন ছোট মামা (ড. রকিব চৌধুরী), তখন তিনি ডাক্তারি পড়েন। দক্ষিণ–পশ্চিম কোণে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। একতলার সিঁড়ির পাশে তৃতীয় শোবার ঘরে থাকেন শতবর্ষী ডাকসাইটে বড় আম্মা—অর্থাৎ আমার নানার মা, যিনি সুযোগ পেলেই ফারসি ভাষায় আমাদের পড়া ধরেন। ওপর তলার চারটে শোবার ঘরের একটিতে থাকতেন মেজ মামা (বিচারপতি ওয়াদুদ চৌধুরী), মামি আর আমার প্রিয় খেলার সাথি নিনি (ড. নাসরিন চৌধুরী) আর জামিল। আর একটায় সদ্য চাকরি ছেড়ে ঘরে ফেরা বড় মামা (আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী), মামি, সোহেল আর শাহিন ভাই। মধ্যের ঘরে অর্থাৎ ড্রয়িংরুমে থাকেন শামিম, শরিফ, রফি ভাইদের মতো কলেজপড়ুয়ারা। ওপরতলার সিঁড়ির পাশের ঘরটি তালাবদ্ধ থাকত। ওটা ব্যবহৃত হতো ছোট্টি ঘর হিসেবে। সেই ছোট্টবেলায় ওই ঘর থেকে বেদনামিশ্রিত আর্তনাদ শুনে জেনে গিয়েছিলাম সন্তান প্রসব করা কত কষ্টের। ওই একটা সময় মনে হতো কেন যে মেয়ে হতে গেলাম। আর একটা ঘর খালেক মামার আর মামির।

মেজ আপার কি কোনো দুঃখ ছিল? জানি না তো! তবে হ্যাঁ, আপা–দুলাভাই দুজনারই গভীর এক ব্যথা ছিল। স্বাধীনতার পরে তাঁরা যখন ইন্ডিয়া গেলেন, রিমাকে নিয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে। সে ফিরে এসে দুঃখ করে জানিয়েছিল, আজমির শরিফে গিয়ে চাদর ধরে আপা–দুলাভাইদের চোখের জল আর বাঁধ মানছিল না। খাজা বাবার দরগাহে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু একটি সন্তান চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু হায়, তাঁদের ভাগ্য সম্রাট আকবরের মতো প্রসন্ন ছিল না। খাজা বাবার দোয়ায় আকবরের মতো তাঁদের কোলে কোনো সেলিম আসেনি।

রাস্তা ঘেঁষে তিনটা বাড়ির একটায় থাকেন আবদুর রব চৌধুরীর বড় মেয়ে পরির মা।

ছোটবেলায় বেশ ধাঁধায় পড়তাম, এই পরিটা আবার কে? আসলে আগের দিনে মেয়েদের নিজস্ব কোনো পরিচয় ছিল না। তার পরিচয় ছিল সে কার মা? অর্থাৎ আমার বড় খালার নামই ছিল পরির মা। খালু অবসরে যাওয়ার পরে হালিমা আপা, সেলিনা আপা, মলি আপা, আরিফ ভাই আর সাদি ভাইসহ পরির মা আর খালু থাকতেন সেখানে। আমরা তাঁকে মাই বলে ডাকতাম। আমার নানারা সিলেটি। সিলেটিরা মাকে মাই সম্বোধন করে। মাইয়ের বাড়ির বারান্দাটার মালিকানার জোরে মহররমের সময় আমরা সবাই বেশ ক্ষমতাধর হয়ে যেতাম। কারণ, আশেপাশের বাড়ি থেকে বাচ্চারা এই বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মহররমের হায় হাসান, হায় হোসেন দেখত। প্রায় এক মাস ধরে অপেক্ষা করতাম আশুরার! মন্ত্রমুগ্ধের মতো সারা রাত ধরে দেখতাম শত শত তরুণ ছেলে চাকু দিয়ে, ব্লেড দিয়ে নিজেদের আঘাত করে মাতম করছে। আগুন দিয়ে লাঠি খেলছে। হোসেন পরিবারের তাজিয়া আর রক্তমাখা দুল দুল ঘোড়া নাজিমুদ্দিন রোড ধরে হোসেনি দালানেরা দিকে যাচ্ছে আর কারবালার কথা মনে করে আমরা তাদের পানি খাওয়াচ্ছি! কী রোমাঞ্চকর সে সময়!

নানি মারা গেছেন আমার জন্মের চার বছর আগে। তাই তিনি আমার কাছে নানার খাটের উল্টো দিকে দেয়ালে লাগানো একটা ছবি মাত্র। নানির মৃত্যুর পর খাম্মাই সামলাতেন এই একান্নবর্তী পরিবার। বিয়ে করবেন না পণ করলেও হঠাৎ করে ১৯৬৩ সালে খাম্মার বিয়ে হয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন কোয়েটাতে। এখন কে সামলাবে এই বিশাল সংসার? কে দায়িত্ব নেবে এ বাড়ির অন্তত ২০ জন গৃহকর্মী পরিচালনার?

বাজারের ফর্দ কে তৈরি করবে রোজ? কে খোঁজ রাখবে নানার চ্যবনপ্রাশ আর মধু ফুরাল কি না? বাড়িতে কারও অসুখ করলে নানার নির্দেশে কে বাক্স থেকে বের করে দেবে হোমিওপ্যাথি ওষুধ? খাবার পর কে সেজে দেবে এক খিলি পান? শীতের শেষে পাইক–বরকন্দাজ নিয়ে কে রোদে শুকিয়ে একত্রে বেঁধে বড় আম্মার ঘরের ছাদের রিংগুলোর সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখবে অন্তত ৩০টা লেপ? কে বাড়বে ইফতার অন্তত ৫০টা পাতে? কে শাসন করবে আমার মতো দুষ্টু মেয়েকে, যার ইফতারের বড় প্লেটটাই চাই? কানের পেছনে লাগিয়ে রেখে নানা যখন ফিরোজা রঙের পাইলট পেনটা ঘরজুড়ে খুঁজে খুঁজে হয়রান হবেন, কে খেয়াল করে বলবে, ‘বনানা, (বড় নানা) কলম দি আফনের খানোত গুঁজা’, আর নানার সেই বিব্রত হাসি!

default-image

কে গুছিয়ে রাখবে নানার কাপড়–জামা, হিসাবপত্র, চেকবই আর দলিল–দস্তাবেজ? সে আর কেউ নয়, সে আমার প্রিয় মেজ আপা। ষাটের দশকের শুরুর দিকের বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবারের নেপথ্য নায়িকা। মাইয়ের মেজ মেয়ে; নানার হামিদা; বম্মা, খাম্মা আর আমার মায়ের আদরের হামু আর বাড়িসুদ্ধ সবার মেজ আপা। মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভাবি, মেজ আপার কি দেবী দুর্গার মতো দশটা হাত ছিল? তার ওপর কী করে জন্মাল সবার এমন দাবি? সেই অল্প বয়সে কোন সাহসে সে কাঁধে তুলে নিয়েছিল ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডের বিশাল জোয়াল? শরৎচন্দ্র বেঁচে থাকলে মেজ আপাকে নিয়ে তিনি নির্ঘাত রচনা করতেন আরেকটা মেজদি!

মা আর আমরা চার ভাইবোন থাকতাম আমাদের আজিমপুর কলোনির বাড়িতে। বাবা (ড. আশরাফ সিদ্দিকী) তখন পিএইচডি করছেন ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার সে সময় পাঁচ বছর বয়স। কানাঘুষা চলছে, এক বছরের জন্য মা যাবেন আমেরিকায় বাবার কাছে। আমরা চার ভাইবোন থাকব নানাবাড়ি। মায়ের চোখেমুখে স্বামীর কাছে যাবার জন্য অভিসারিকা রাধার ব্যাকুলতা, আবার পরমুহূর্তেই কালো মেঘের ঘনঘটা। সবার চিন্তা, মা ছাড়া কী করে থাকবে এই বাচ্চাগুলো? এ বিষয়ে বড়দের কথা হতো আমাদের লুকিয়ে। তবে ব্যাপারটা আঁচ করে ফেলেছিলাম। আমার কিন্তু কোনো ভয় হচ্ছিল না।

সত্যি বলতে, আমরা তো আর শুধু মায়ের আদরে লালিত হইনি, নানা, খালা, মামা, বড় ভাই বোন—সবার আদর পেয়েই তো অভ্যস্ত! তা ছাড়া আর একজন তো রয়েছেই!

বিজ্ঞাপন

নানাবাড়ি গেলে যার বুকের ভেতর ঢুকে আমি ঘুমাই—আমার মেজ আপা! ওই নানাবাড়িতেই সারা দিন কত–কী যে ঘটছে! হাঁসের হলুদ বাচ্চা ফোটা দেখব, মুরগির ডিম কুড়াব, গৃহকর্মীদের সন্তান, ছোট চিকুনি, বড় চিকুনি, রোজী, হাজেরাদের সঙ্গে পুতুল, হাঁড়ি–পাতিল আর ‘কুমির তোর জলে নেমেছি’ খেলব! ভাইবোনদের সঙ্গে ফুটবল খেলব। এ ছাড়া তখন সদ্য স্কুলে ভর্তি হয়েছি, তাই রোজ সকালে স্কুলে যাব। এত সব করতে করতে মায়ের ফেরার সময় হয়ে যাবে না? তবে মা গেলে মন খারাপ হতে যাবে কেন?

লতিফ মামা (ড. আবদুল লতিফ চৌধুরী) মায়ের চার নম্বর ভাই। ফিজিকস পড়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। মামি আমাদের জার্মান। সাদা চামড়ার একটা আলাদা কদর তো ছিলই। ধবধবে সাদা বিলেতিদের মতো মামাতো ভাই কাজল এলে এমনিতে আমরা খুশিতে আটখানা! দারুণ উৎসাহে বিলেতি অ্যাকসেন্টে ইংরেজি চর্চা চলত, ‘খাজল, খাজল, খাম, লেটস প্লে’! তবে শোবার সময় এলে তাকে ছুড়ে ফেলে দিতে মন চাইত। কেন? কারণ সে–ও যে আমার মতোই মেজ আপার বড় ভক্ত! মেজ আপার সঙ্গেই শোবে সে। আমার পরম শান্তির জায়গায় অন্য কারও জবরদখল তো আমার সহ্য হবেই না।

default-image

বম্মা অফিস করে হাতমুখ ধুয়ে আমাকে খেলার ছলে পড়াতেন। আমার ডাক নাম রিয়া। বম্মার আদরে তা হয়ে যেত রিউ। খেলা খেলা পড়া শেষে বম্মার রোজকার একই প্রশ্ন! বলতেন, রিউ সোনা, কে তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে? আমার সোজাসাপটা উত্তর, ‘সবচেয়ে বেশি নানা, তার পরে মেজ আপা, তার পরে মা আর তার পরে তুমি।’ বাবা তো বিদেশে, তাই তিনি সিনেই নেই! বম্মা হারবার পাত্রী নন। তিনি বলতেন, ‘না না কিছুতেই না, নানার পরে আমি।’ আমি আবারও বলতাম ‘না, তুমি মায়ের পরে।’ যখন একেবারেই ছাড় পেতাম না, তখন রফা করতাম, বলতাম, ‘ঠিক আছে তুমি মায়ের আগে, কিন্তু মেজ আপার পরে।’

বম্মা ছিলেন ট্রেন্ড সেটার। পড়ালেখা, চাকরি, গার্লস গাইড ইত্যাদি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।

বিয়েশাদি করবেন না। কারণ, এতে উচ্চশিক্ষা আর কর্মজীবনে ব্যাঘাত ঘটবে। তার দেখাদেখি ও বাড়ির বেশ কজন মেয়েই মনে করত ব্রহ্মচারী জীবন শ্রেয়, আর বিয়ে করতে চাওয়া মানে নিজেকে পার্থিব জীবনে বেঁধে ফেলা। ভাবটা এমন, ‘আমার রয়েছে কর্ম, রয়েছে বিশ্বলোক’। মেজ আপাও সে দলেই নাম লিখিয়েছিলেন। তাতে আমি বেশ সন্তুষ্টই ছিলাম। আমার স্বার্থের সঙ্গে মেজ আপার বিয়ের একটা বিরোধ ছিল। মেজ আপার বিয়ে হয়ে গেলে নানাবাড়িতে এলে আমি শোব কার সঙ্গে? তাই যখনই জানতে পারতাম, মেজ আপাকে দেখতে কেউ আসছে, চুপচুপ করে তাকে জানিয়ে দিতাম। তিনি সেই বিশাল বাড়ির কোন কোণে যে লুকিয়ে যেতেন, কেউ তাকে খুঁজে পেত না।

তবে শেষ রক্ষা আর হলো না। ঘটকালির দায়টা আমার মায়েরই ছিল বেশি। মা টের পেয়েছিলেন যে আমি আপাকে জানিয়ে দিই। তাই তিনি আমাকে আর নিলেন না। বাড়ি রেখে এলেন। ফলে আপাকেও আর সাবধান করা গেল না। তিনিও পালাতে পারলেন না। ফলে যা হবার তাই হলো, সানাই বাজিয়ে, গেট সাজিয়ে, বাতি জ্বালিয়ে, বড় বড় ঘরজুড়ে শতরঞ্জির ওপর সাদা ফরাস পেতে অতিথি আপ্যায়ন করে মেজ আপার বিয়ে হয়ে গেল। আমরা সব গেট ধরতে শিখলাম। রং খেলার আনন্দে ভাসলাম। কিন্তু তারপর? তারপর দুলাভাই আমার নানাবাড়ি ফাঁকা করে মেজ আপাকে নিয়ে চলে গেলেন চট্টগ্রামে।

অল্প দিনের মাথায়ই বুঝে ফেললাম, বিয়েটা হয়ে নেহাত মন্দ হয়নি। এ যেন বিদেশের buy one and get one free মতো হলো! এ তো দুলাভাই পাওয়া নয়, এ যেন সব রকম আবদার মেটানোর আলাউদ্দিনের চেরাগ পাওয়া। ‘দুলাভাই, চকবার আইসক্রিম খাব’।

আর যায় কোথা, বাক্সভরে চকবার! ‘দুলাভাই, স্বাধীনতা দিবসে বাতি সাজানো দেখতে যাব।’ মাঝেমধ্যে অবশ্য একটা শর্ত জুড়ে দিতেন। যেমন ‘intelligent বানান কর তো’ অথবা, ‘আমার বাড়ির মানুষেরা আমার বিয়ের দিনে বরিশালের ভাষায় কীভাবে কথা বলেছিল একটু ভেঙিয়ে দেখা, তবে পাবি যা চাচ্ছিস।’ আমিও সঙ্গে বলতে শুরু করে দিতাম, ‘ও শাজেহান মোগোর কি প্যেচরা হইয়েসে? মোগো লাইফ বয় সাবান দে হাত ধোবার দ্যাসে তোমার হশুরবাড়ি।’ বলা শেষ হলে হো হো করে হেসে উঠে তিনি বলতেন, ‘চল চল, কে কে যাবি চল।’ চট্টগ্রাম থেকে তাদের ঢাকায় আসা মানেই স্যাভয়ের জিবে জল আসা চকলেট। আমার বেলায় বরাদ্দ একটু বেশি। কারণ, দুলাভাই বলতেন, ‘তুই চুপ চুপ করে তোর মেজ আপাকে জানিয়ে না দিলে কবেই তো অন্য কারও সাথে তোর আপার বিয়ে হয়ে যেত! আমি তো তাকে পেতাম না। তাই তোর জন্য দুটো চকলেট বেশি!’ এই শাজাহান দুলাভাই কবে যে টাক্কু দুলা ভাই বনে গেলেন তা ঠিক মনে নেই। উপাধিটা কে দিল তা–ও মনে নেই। তবে আমৃত্যু সে সম্বোধনটাই চালু ছিল! আমরা প্রথম শাড়ির মালিকানা পেয়েছিলাম আপা–দুলাভাইয়ের বদৌলতে।

default-image

ব্যাংকক থেকে আপা–দুলাভাই সব শালীকে ৬৪৪ শাড়ি এনে দিলেন। শালীর বহর কিন্তু কম নয়, অন্তত জনা বিশেক!

আনন্দসাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া দুলাভাইয়ের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব কি আমাদের ছিল না? ছিল ছিল অবশ্যই ছিল। দুলাভাই ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডের সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক। ফলে পারিবারিক রাজনৈতিক আড্ডা প্রায়ই সম্মুখসমরে পরিণত হতো। ভাষা আন্দোলনের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যের বাড়িতে দুলাভাই যখন জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণার পেছনে কারণ দর্শাতে বসতেন, যখন বলতেন সেটা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির জন্য প্রয়োজন ছিল বা তখনকার স্বাধিকারের ছয় দফাকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিতে চাইতেন, সে সময় মা বা মামারা ভুলে যেতেন যে কাছাকাছি বয়সী হলেও দুলাভাই তাঁদের মেয়েজামাই। বিরক্ত হয়ে বলতেন, ‘শাজাহান, তুমি এসব অবান্তর কথা কোথায় পাও।’ বুড়ো আঙুল তর্জনীর সঙ্গে ঘষতে ঘষতে দুলাভাই তর্ক চালিয়ে যেতেন। বাগবিতণ্ডার এক ঘণ্টা পরেই মা বা বম্মাকে দেখেছি হাসিমুখে মাছের মুড়োটা দুলাভাইয়ের পাতে তুলে দিতে। এখন যখন পেছনে ফিরে তাকাই, বেশ বুঝতে পারি, কারোর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না হলে তা মেনে নেবার প্রয়োজন নেই, কিন্তু একই সঙ্গে অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও থাকতে হবে।

সেই অল্প বয়সেই এমন একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোড থেকেই রপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধের সময় আপা–দুলাভাই ঢাকায় চলে এলেন। উঠলেন সেই ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডের বাসায়। তত দিনে নানা, বড় মামা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বম্মা বদলি হয়ে গেছেন রাজশাহী। রুকু মামা কানাডায়, লতিফ মামা আমেরিকায়। আপাদের ফেরাতে একতলাটা যেন আবার প্রাণ পেল। যুদ্ধের শেষে আপারা বাসা নিলেন মোহাম্মদপুরে, পরে আমিনাবাদ ফ্ল্যাটে। তাঁদের বাড়িটা হয়ে উঠল কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে ঢোকা মামাতো–খালাতো বোনদের রাতভর আড্ডা দেবার লাইসেন্সপ্রাপ্ত জায়গা। আমাদের ভালো–মন্দ খাওয়ানো, আর মাঝরাতে হাঁক ছেড়ে ঘুমাতে যেতে বলা যেন মেজ আপার আদরের দায়। যুদ্ধের সময় মাইও মারা গিয়েছিলেন। খালুর ভার আপা কাউকে দিলেন না। নিয়ে এলেন তাঁর কাছে। ছবির মতো চোখে ভাসে কী মমতায় মেজ আপা খালুর হুঁক্কা সাজানোর ব্যবস্থা করছেন, গোসলের কাপড় বের করে দিচ্ছেন। গরম পানি হলে বালতিতে ঠান্ডা পানির সঙ্গে মিশিয়ে তবে খালুকে গোসলে পাঠাচ্ছেন। আমাদের বিদুষী মলি আপার ফিজিকসের কঠিন পড়া পার করার দায়ও যেন ছিল তাঁর। সযত্নেœভাত মাখিয়ে মুঠো করে করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়া বোনকে গিলিয়ে দিতেন খাবার।

ছবির মতো চোখে ভাসে কী মমতায় মেজ আপা খালুর হুঁক্কা সাজানোর ব্যবস্থা করছেন, গোসলের কাপড় বের করে দিচ্ছেন। গরম পানি হলে বালতিতে ঠান্ডা পানির সঙ্গে মিশিয়ে তবে খালুকে গোসলে পাঠাচ্ছেন। আমাদের বিদুষী মলি আপার ফিজিকসের কঠিন পড়া পার করার দায়ও যেন ছিল তাঁর। সযত্নেœভাত মাখিয়ে মুঠো করে করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়া বোনকে গিলিয়ে দিতেন খাবার।

আমরা সবে কলেজে ঢুকেছি। তখন ভিসিআর বলে এক যন্ত্র এল। তাতে সবাই সিনেমা দেখে। আমাদেরও দেখার শখ! ৩৭ নাজিমুদ্দির রোডের কাছে সেই সময় ওই সব ছবি অপসংস্কৃতির ধারক। ওগুলো ভদ্রলোকেরা দেখে না। অগত্যা আবার দুলাভাইয়ের শরণাপন্ন হওয়া। শালীদের খুশি করার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলেন না দুলাভাই।

নিয়ে এলেন রঙিন টিভি আর ভিসিআর! আমরা তো অভিজ্ঞতা করলামই। আমাদের বন্ধুবান্ধব কেউ বাদ থাকল না। ছুটির দিনে বেলা তিনটার দিকে সার সার চেয়ার লাগিয়ে অন্তত ২০–২৫ জন মিলে উপভোগ করতাম সেসব সিনেমা। বন্ধুবান্ধবের কাছে আমাদের দাম বেড়ে গিয়েছিল অনেক গুণ!

শুধু তো আমার প্রজন্মের আমি আর কাজল নই, মেজ আপার কাছে সব বাচ্চারাই একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেত। সে কারণে জীবনের কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া তার ভাই ও বোনদের জন্য সহজ হয়ে যেত। সত্তর দশকের শুরুতে সৌদি আরবে বিদেশিদের জন্য ভালো স্কুল ছিল না। তাই বিমানে কর্মরত রফি ভাই আর হালিমা আপাকে তাদের সন্তান রাতুলকে মেজ আপার কাছে রেখে যেতে হলো। তার কিছু পরে কানাডায় জেনারেল অ্যামিনেস্টি দিচ্ছে শুনে আমার বড় ভাই (শরিফ) যখন সৌদি আরব ছেড়ে সেখানে ছুটলেন, অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত বড় ছেলে ইফসানকে নিতে পারেননি। তার ভারও সাদরে বইলেন মেজ আপা। আরিফ ভাই–ভাবি দুজনাই সরকারি চাকুরে। স্কুল শেষ করে তাঁর সন্তানদেরও নিরাপদ চাইল্ড কেয়ার হয়ে দাঁড়াল মেজ আপার বাড়ি। অনেক পরিবারেই শুনেছি বাবা বা মা কাছে না থাকলে সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কই তার ভালোবাসার চাদরে মোড়া বাচ্চাগুলোর তেমন কিছু তো হয়নি। তিনি কখনো কোনো বাচ্চার মায়ের জায়গা নিতেন না। তাঁর সঙ্গে শিশুর গড়ে উঠত এক স্বর্গীয় সম্পর্ক, আর তা বাকি সব সম্পর্ক অটুট রেখেই।

বিজ্ঞাপন

মেজ আপার কি কোনো দুঃখ ছিল? জানি না তো! তবে হ্যাঁ, আপা–দুলাভাই দুজনারই গভীর এক ব্যথা ছিল। স্বাধীনতার পরে তাঁরা যখন ইন্ডিয়া গেলেন, রিমাকে নিয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে। সে ফিরে এসে দুঃখ করে জানিয়েছিল, আজমির শরিফে গিয়ে চাদর ধরে আপা–দুলাভাইদের চোখের জল আর বাঁধ মানছিল না। খাজা বাবার দরগাহে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু একটি সন্তান চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু হায়, তাঁদের ভাগ্য সম্রাট আকবরের মতো প্রসন্ন ছিল না। খাজা বাবার দোয়ায় আকবরের মতো তাঁদের কোলে কোনো সেলিম আসেনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার জন্য আপাকে কখনো আহাজারি করতে দেখিনি। বিষাদে ভুগতে দেখিনি। রবীন্দ্রনাথের ‘আপন হতে বাহিরিয়া’ দেখতে শিখেছিলেন আপা। তাই অসীমের মাঝে তাঁর আপন দুঃখ ক্ষুদ্র হয়ে যেত হয়তো–বা!

আমার বিয়ের রুসমত করিয়েছিলেন মেজ আপা। প্রতি ঈদে ওয়ারীতে আমার শ্বশুরবাড়িতে এসে আমাকে দেখে যেতেন তাঁরা। অথচ সেই আমি ধীরে ধীরে জড়িয়ে গেলাম নানা কাজে। যাব যাব করে তাঁকে দেখতে যাওয়াটা ক্রমে কমতে থাকল।

default-image

দুলাভাইও একসময় আপাকে ছেড়ে চলে গেলেন। আমার জীবনসঙ্গী আব্রার কিন্তু ঠিকই দু–তিন মাস পরপর দেখে আসত আপাকে। মলি আর সেলিনা আপা দেশে এলে নির্লজ্জের মতো আমরা সবাই গিয়ে আবার ভিড় জমাতাম মেজ আপার বাসায়। কপট রাগ দেখিয়ে বলতেন ‘যা যা ঢুকতে দেব না।’ আর বলতেন, ‘তুই খুব খারাপ কিন্তু তোর বরটা ভালো। সে আমাকে ঠিকই দেখে যায়।’ বকা শেষ হলে আবার সেই মাখা মাখা আদর!

কোভিড তার গভীর কামড় বসিয়ে দিয়ে গেল আমার ভালোবাসার, ফর গ্রান্টেড নিরাপদ জায়গাটিতে। গত ২৪ সেপ্টেম্বরে আপাকে হারালাম। একটু অসুখ হলে সুদূর কানাডা থেকে ছুটে আসত সেলিনা আপা। তাকে সুস্থ করে তবে বিদেশে ফিরত সে।

কিন্তু হায় এবার কেউ আসতে পারল না। হ্যাঁ, তার শেষ সময় তার সঙ্গে ছিল একজন। তার নাম তুষার। সংক্রমণের ভয়ে কাবু হয়নি সে। তুষার আবুলের সন্তান। আট–দশ বছর বয়সে আবুল এসেছিল আপার কাছে। আপা সেই আবুলকে তো প্রতিষ্ঠিত করেছেনই, তার ছেলেকেও পড়িয়েছেন। রক্ত সম্পর্কহীন এই নাতির কাঁধে চড়েই নামলেন শেষ আস্তানায়। ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোডের আমরা কেউই আমাদের দায় শোধ করতে তাঁকে শেষ দেখা দেখতে যাইনি।

আমার এই অপারগতার জন্য ‘আমাকে খুব করে বকা দিয়ো, মেজ আপা। কিন্তু বকা শেষে আগের মতোই আবার আদর করো, কেমন! তোমার কাছে আমি যে চিরঋণী।

আমার অস্তিত্বে মিশে আছে ৩৭ নাজিমুদ্দিন রোড। আর আমার সেই নাজিমুদ্দিন রোডের স্বপ্ন জালের একটা মজবুত খুঁটি তুমি।’

মন্তব্য পড়ুন 0