কার্ল মার্ক্স তো চুরুট খেতেন, শুনেছি কাজও করেছিলেন তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জায়গায়। আমিও সিগারেট টানি, চাকরি করি একটা করপোরেট অফিসে। অফিসের রুফটপ থেকে সামনের বস্তি দেখা যায়। মাঝেমধ্যে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ওদের কথা ভাবি। ওপর থেকে মানুষগুলোকে খাটো খাটো দেখায়। নৃবিজ্ঞান বলে, খাদ্যসংকটে মানুষের অন্যান্য প্রজাতি বিলুপ্ত হলেও শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের খাটো জাভা মানবেরা টিকে গিয়েছিল তাদের দৈহিক গঠনের কারণে, ছোটখাটো শরীর কম খেয়েও সেই সংকট উতরে গিয়েছিল। রুফটপ থেকে ওদেরকে জাভা মানব লাগে আমার কাছে। ওদের টিকে থাকতে বেশি কিছুর দরকার নেই, যদিও ওরা সাম্যবাদী নয়।

এই সর্বদা অতৃপ্ত চাহিদার নগরে, ওরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের জাভা মানব। আর আমরা নগরের পেটমোটা, মাথামোটা, নিয়ান্ডারথালরা চাহিদার ঘাটতি পড়লেই পাগল হয়ে যাই। আমাদের ভেতরের প্রাগৈতিহাসিক জিন উন্মাদ হয়ে ওঠে, ‘আগামী তিন মাস বরফে ঢাকা থাকবে পুরো এলাকা তখন একটা বুনো ষাঁড়ও পাওয়া যাবে না।’ আর তখন আমরা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ি বাজারে—সুপারশপে। কত কিছুই লাগে আমাদের! বাজার, সুপারশপ আমাদের চাহিদার জোগান দিতে হিমশিম খায়। কিন্তু শুধু বেঁচে থাকার জন্য যে চাহিদাটুকু, তার চিন্তা করলে মুহূর্তেই এসব অর্থহীন হয়ে ওঠে। জাভা মানবদেরও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। তাদের জিন টিকে থাকার নিত্যনতুন পথ খোঁজে। আমি এই ভেবে খানিকটা তৃপ্তি বোধ করি, হয়তো মহা কোনো সংকটে ‘নাই নাই চাই চাই’ গণ্ডিতে আটকে থাকা বোধহীন নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। টিকে থাকবে বিচ্ছিন্ন খাটো জাভা মানবেরা।

সময় পেলে বস্তির একটা চায়ের দোকানে যাই। আজও অফিস শেষে সেখান থেকে চা খেয়ে এলাম। গায়ে রালফ লরেনের ব্লেজার, হাতে রোলেক্স, গলায় টাই, পায়ে হাশ পাপিস চাপিয়ে আমি যেন নিয়ান্ডারথাল, যেন ঢুকে পড়ি জাভা মানবের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। খাটো খাটো জাভা মানবেরা বড় বড় চোখ তুলে ভিন্ন প্রজাতির মানুষ দেখে। ওদের জিনেরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাসে মেতে ওঠে, ‘গলায় দড়ি পিন্দাইছে’। তারা আমার গায়ে জড়ানো ব্লেজারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ‘হয়তো অজানা কোনো নীল পশুচর্ম। কী মসৃণ!’ এক প্রবীণ জাভা জিন ভাবনায় পড়ে যায়, তবে এই রহস্য উন্মোচনের জন্য তাদের আগে এই বিরূপ সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু সেই ঝুঁকি নেবে কে? কারও কাছ থেকে আশার উত্তর আসে না।

তাই জাভা মানবেরা আমার মতো নিয়ান্ডারথালকে তাদের থেকে উন্নত শ্রেণির ভাবে। আমাকে তারা জায়গা করে দেয়। তাদের খোশ-আড্ডায় ছেদ পড়ে। সংকীর্ণ টংদোকানে হঠাৎ একটা ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি হয়। জাভা মানবেরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ‘আসেন স্যার, ছাউনিটা একদম নিচু, সাবধানে স্যার, আমাদের অবশ্য অভ্যাস হয়্যা গেছে।’ জাভা জিন হাসে, ‘হেইডার আমরা নাগালই বিছরাই পাই না!’ গামছা দিয়ে বেঞ্চটা দোকানি ভালো করে মুছে দেয়। বেঞ্চজুড়ে পায়ের ওপর পা তুলে নীল পশুচর্ম পরিহিত নিয়ান্ডালথাল বসে পড়ে। গলার দড়িটা একটু ঢিলা করে নেয়।

‘স্যার, চায়ে কি চিনি বাড়িয়ে দেব?’

‘না না, চিনি ছাড়া হালকা লিকার।’

জাভা জিনের কাছে অবিশ্বাস্য লাগে বিষয়টা। মিষ্টি তো সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত তাদের কাছে। হাজার হাজার বছর ধরে তাদের কাছে মিষ্টির একমাত্র উৎসই ছিল গাছের ফলমূল। উৎসুক জিনেরা তাদের বর্তমান উত্তরসূরিদের নানাভাবে প্ররোচিত করার চেষ্টা চালায়, ‘হালারপো, জিগা না পায়ে কী পিন্দাইছে? ছাগচর্ম নিহি?’ এক শীর্ণকায় জাভা মানব কথায় একটা মার্জিত ভাব এনে প্রশ্ন করে, ‘স্যারের জুতাটা খুব সোন্দর, একেবারে খাঁটি চামড়ার।’

‘হুম।’

‘ছাগলের চামড়ার মনে হয়, শুনছি ছাগলের চামড়ার জুতার অনেক দাম।’

‘দাম কত স্যার?’

‘এই বিশ হাজারের মতো।’ স্বল্প উপার্জিত জাভা মানবেরা বড় বড় চোখ নিয়ে জুতার দিকে তাকিয়ে থাকে।

যেহেতু আমি সাম্যবাদ বুঝি, আর এ-ও বুঝি বস্তির মানুষগুলো আমার পায়ের হাশ পাপিসের নিচে হাঁসফাঁস করে বেঁচে থাকে। আমি সিগারেট জ্বালাই। আমার বুর্জোয়া ঠোঁটে অসহায় প্রলেতারিয়েত সিগারেট পুড়তে পুড়তে নিঃশেষ হয়ে চলে।

শোষক আমি, আমি নাই নাই চাই চাই নিয়ান্ডারথাল। আমি রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি। মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। অ্যাসপিরিন, প্যারাসিটামল—না কোথাও কিছু নেই, শুধু শীর্ণ রক্তফেনামাখা মুখ চারদিকে। এই বুর্জোয়া ঠোঁটকে এখন আমি সবচেয়ে ঘৃণা করি। ‘রক্তবমি করে মরো শালা, প্লেগ আক্রান্ত মড়কের ইঁদুর।’ আমি যে জালের মধ্যে ছটফট করি, সেখানে সাম্যবাদ নীতিকথামাত্র। আর নীতিকথা হলো জগতের সবচেয়ে অবাস্তব সত্য। যা বলতে ভালো, দেয়ালে-বইয়ে লিখতে ভালো, এমনকি কানে পৌঁছানো সর্বোত্তম শব্দও এগুলো। কিন্তু মানবজীবনে এর তেমন কোনো প্রয়োগ নেই। যেমন ‘সর্বদা সত্য কথা বলো’। হাস্যকর লাগে আমার কাছে। মানুষ সম্ভবত একমাত্র প্রাণী, যারা কাল্পনিক উৎকর্ষ মানদণ্ড তৈরি করে সুখ পায়। হ্যাঁ, সুখ মানুষের জন্য অতি দরকারি। আমিও সুখ পাই নিজেকে সাম্যবাদী ভেবে।

তবে এই বুর্জোয়া ঠোঁট, রোলেক্স, হাশ পাপিস আমাকে শুধু শোষকশ্রেণিভুক্ত করে না, একই সঙ্গে পরিণত করে ক্রীতদাসে। হ্যাঁ, আমি এক একনিষ্ঠ অনুগত ক্রীতদাস। নিজের ক্রীতদাস আমি। দাসত্ব থেকে আমার মুক্তি নেই।

কখনো কখনো মনে হয় দার্শনিক থরোর মতো এই কলুষিত মড়ক ছেড়ে জঙ্গলে গিয়ে থাকি। বিচ্ছিন্ন জাভা মানব কিংবা মুক্ত ইঁদুর হয়ে অন্তত বাঁচি। কিন্তু এ-ও জানি, তাতেও শেষ পর্যন্ত আমার মুক্তি নেই। কারণ, আমি একই সঙ্গে সাম্যবাদী, শোষক ও ক্রীতদাস। আমি ক্রীতদাস আমার শরীরের, তার চাহিদাকে অমান্য করার সাহস নেই আমার। তার অন্যায় আমি মেনে নিই, তার চাহিদা অনুগত দাস হিসেবে আমাকে পুলকিত করে, তার জুলুমের চাবুকাঘাতের সামনে আমি পিঠ পেতে দিই। মানুষ কি তাহলে জন্মের সঙ্গে দাসত্ববৃত্তিও পৃথিবীতে আনে? যদি তা-ই হয়, তাহলে সমাজে যে ‘সহমত ভাই’ চলে, তাতে একধরনের সহজাত তৃপ্তি আছে। তৃপ্তি অতি দরকারি জিনিস, হোক সে দাসত্বে।

আমার দাসত্বের জিন, আমাকে নিয়ে যায় এক দাসমালিকের ঘরে। আমি কায়মনোবাক্যে তার সেবা করে চলি। আমি তাকে বাথটাবে সুগন্ধি ফেনায় ভরিয়ে দিই। ব্র্যান্ডের নানাবিধ প্রসাধনের প্রয়োজন মেটাই। নিত্যনতুন গান, সিনেমা, দামি আসবাব, বিদেশি মদ, এয়ারকন্ডিশন—কিছুই বাদ রাখি না। একঘেয়েমি, খেদ, বিতৃষ্ণা নিয়ে জীবনের প্রকৃত সত্য উপলব্ধির জন্য প্রকৃতির মাঝখানে নিজেকে শপেছিলেন থরো। কিন্তু সত্যের খোঁজ কি তিনি পেয়েছিলেন? জীবনের এই স্বাদ সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের রোদে তিনি কি অসহায় বোধ করেছিলেন?

আমি ঘুমাতে চাই। ঘুম আসে না। নির্ঘুম রাতে শহরের পথে পথে এক সাম্যবাদী শোষক ক্রীতদাস ঘোরে। আর বলে, ‘শোনো, এ হলো মৃতের গল্প।’ তবু শুধু চারদিকে ঘুরে ঘুরে এই দুর্ভেদ্য জাল থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকি।

আমি থরো নই। জীবনানন্দ দাশও আমি নই। আমি তো সেই সাম্যবাদী শোষক ক্রীতদাস, যে নিজে ইঁদুর হয়েও বলতে ভালোবাসে, ‘চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার...’।

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন